kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

এক শ্রমিকের লাশ লুকিয়ে রেখেও শেষ রক্ষা হয়নি

স্ক্র্যাপ জাহাজে বিস্ফোরণ, অগ্নিদ্বগ্ধ হয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি   

১৫ মে, ২০১৯ ২২:৪৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্ক্র্যাপ জাহাজে বিস্ফোরণ, অগ্নিদ্বগ্ধ হয়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু

ছবি: কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বারআউলিয়ায় একটি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজে বিষাক্ত গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে দুই শ্রমিক নিহত ও আরো অন্তত ৫ শ্রমিক অগ্নিদ্বগ্ধ হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশংকাজনক। বুধবার সকালে উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বারআউলিয়া সাগর উপকূলে মাহিনুর শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে।
 
এদিকে ইয়ার্ডে অগ্নিকাণ্ডের পর সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশে কঠোরভাবে বাধা দেয় ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। তারা হতাহতের সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি করে বিকাল পর্যন্ত একটি লাশ গোপন কক্ষে লুকিয়ে রাখে। পরে তা উদ্ধার হয়।
 
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকালে বারআউলিয়ার মো. নুরুন্নবী মানিকের মালিকানাধীন মাহিনুর শিপ রি-সাইক্লিং শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে কোরিয়ান অয়েল ট্যাংকার এমটি কেলানা ফোর নামক স্ক্র্যাপ জাহাজে কাটিংয়ের কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। তারা গ্যাস দিয়ে কাটিং করার সময় হঠাৎ সেখানে বিষাক্ত গ্যাসের লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে কর্মরত এক শ্রমিক হামিদুল (৩০) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তিনি নওগাঁ জেলার নিনদই গ্রামের আনিসুল মন্ডলের ছেলে।
 
এ ছাড়া বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর দ্বগ্ধ হয়। তাদেরকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে মো. রুবেল (২৭) নামক আরো এক শ্রমিক মারা যান। তিনি ফেনীর দেওয়ানপুর এলাকার শেখ আহমদের ছেলে। এ ছাড়া আহত হয়েছেন নওগাঁর মান্দা পাইকপাড়ার গিয়াস সর্দারের ছেলে মো. মাসুদ (১৯), একই এলাকার মো. খোকার ছেলে মো. সোহেল (২২), রাজশাহী পুটিয়ার হযরতের ছেলে আল আমিন (২৭), নওগাঁ সদরের মো. কামরুল (২৮) এবং সীতাকুণ্ডের বারআউলিয়ার মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে মামুনুল ইসলাম মামুন (৩২)। 
 
অন্যদিকে সকালে দুর্ঘটনার পর ব্যাপক লুকোচুরির মাধ্যমে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ শ্রমিক হামিদুলের মৃত্যুর কথা সাংবাদিক, পুলিশসহ প্রশাসনের সকলের কাছে গোপন করে রাখে। কিন্তু দুপুরের পর ওই শ্রমিকের স্বজনরা ইয়ার্ডে গিয়ে তাদের লোক সেখানে আছে বলে চাপাচাপি শুরু করলে শেষে পুনরায় গিয়ে জাহাজের একটি কক্ষ থেকে তার লাশ বের করা হয়।
 
এদিকে যে কেভিনে অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল সেখানে ফায়ার সার্ভিসের তল্লাশির পরও একটি লাশ অন্য কক্ষে পাওয়ায় এটি ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষই অন্য কক্ষে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নইলে যে কক্ষে আগুন লেগেছে সেখানেই লাশটি থাকার কথা। 
 
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. দেলওয়ার হোসেন দুইজন নিহতের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ওই ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে দুইজন। সকালে কর্তৃপক্ষ একজন মারা গেছে ও ৫ জন দ্বগ্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছিল। দুপুরের পর আমরা খবর পাই যে আরো একজন শ্রমিকের লাশ পাওয়া গেছে। সেটি জাহাজের অন্য একটি কক্ষে পড়েছিল। লাশটি উদ্ধার করে পোস্টমর্টেমের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।
 
অন্যদিকে আজ দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় যে ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটির বাইরের সাইনবোর্ডে লেখা মাহিনুর শিপ রি-সাইক্লিং ইয়ার্ড। কিন্তু ওই ইয়ার্ডে যে জাহাজটি কাটিং করা হচ্ছিল সেটি আমদানি করা হয়েছিল প্রিমিয়াম ট্রেন কর্পোরেশন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের নামে। বিষয়টি জানতে ইয়ার্ডে প্রবেশ করতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় অনুমতি না দিয়ে সাংবাদিকদের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখেন। এ সময় কোনো সাংবাদিক থানার ওসির সহযোগিতায়, কেউবা শিপব্রেকিং অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে তাদের মাধ্যমে ইয়ার্ডে প্রবেশের অনুমতি পান। দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডে প্রবেশে এত লুকোচুরিতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্দেহের উদ্রেক হয়।
 
পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় স্ক্র্যাপ জাহাজটিতে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি, প্রিমিয়াম ট্রেড কর্পোরেশনের নামে আনা জাহাজ মাহিনুর শিপ রি-সাইক্লিং ইয়ার্ডে কাটিং করা, হতাহত শ্রমিকের তথ্য গোপন ও সে সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকদের সঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি না করতেই ইয়ার্ডের কর্মকর্তারা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেন। দৈনিক প্রথম আলোর সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি কৃষ্ণ চন্দ্র দাস ও দৈনিক আজাদীর প্রতিনিধি লিটন কুমার চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, তারা এ দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহে ঘটনাস্থলে গেলেও ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ তাদেরকে সেখানে প্রবেশের করতে দেয়নি। পরে এ প্রতিবেদকও দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজটির ছবি তোলায় অসৌজন্যতামূলক আচরণ করেন ইয়ার্ডের সেফটি ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা সাব্বির চৌধুরী। 
 
এদিকে মাহিনুর শিপ রি-সাইক্লিং এ দুর্ঘটনা ঘটলেও এটি প্রিমিয়াম ট্রেড কর্পোরেশন বলে চালানো হচ্ছে কেন জানতে চাইলে সেফটি ম্যানেজার সাব্বির বলেন, মাহিনুর ইয়ার্ডটির অনুমোদন নেই। তাই প্রিমিয়ামের জাহাজ কাটা হয়। তিনি বলেন, প্রিমিয়াম ট্রেড কর্পোরেশন একই মালিকের প্রতিষ্ঠান।
 
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক মাইদুল ইসলাম বলেন, যেখানে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে সেটি এমন একটি কেভিন যেখানে উঠতে গেলে মই জাতীয় কিছু অথবা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ওই কক্ষে গ্যাস জমে থাকা একটি পাইপে বিস্ফোরণ ঘটে যাওয়ায় সেখানে সব শ্রমিক অগ্নিদ্বগ্ধ হয়।
 
তিনি বলেন, তবে সেখানে একাধিক শ্রমিক মারা যাবার অবস্থা ছিল। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিল্টন রায় বলেন, এত বড় একটি দুর্ঘটনার পরও তারা আমাকে কোনো খবর দেয়নি। ঘটনাটি লুকানোর চেষ্টা হয়েছে সম্ভবত। আমি রাত ৯টা পর্যন্ত জেনেছি একজন মারা গেছে। পরে জানলাম দুইজন। এসব নিয়েও কেন গোপনীয়তা আমি বুঝতে পারছি না। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা