kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

রানা প্লাজার উদ্ধারকর্মী হিমুর গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা!

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ২১:০৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রানা প্লাজার উদ্ধারকর্মী হিমুর গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা!

যে ব্যক্তি নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অন্যদের প্রাণ বাঁচিয়েছেন সেই রানা প্লাজার উদ্ধারকর্মী নওশাদ হাসান হিমু (২৭) নিজের শরীরে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে আত্মহত্যার পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ কেউ জানাতে পারেনি। 

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের বিরুলিয়ায় শ্যামপুর এলাকা থেকে বুধবার রাত ৯টার দিকে নিজ ভাড়া বাসা থেকে পুলিশ তাঁর ঝলসে যাওয়া মৃতদেহ উদ্ধার করে। একই এলাকার আবদুল হক মোল্লার বাড়িতে হিমু একাই ভাড়ায় বসবাস করতেন। সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর হিমু উদ্ধার তৎপরতার জন্য সবার কাছে পরিচিত মুখ ছিলেন। বরিশালের উজিরপুর থানার বাবর গ্রামের সরদার আবুল হোসেনের ছেলে ছিলেন হিমু। বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের কাছে ‘হিমালয় হিমু’ নামেই বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিলেন।

সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজগর আলী কালের কণ্ঠকে জনান, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো জানান, হিমু কারও সঙ্গে তেমন মিশতেন না। তিনি তার বাবা-মায়ের সঙ্গেও থাকতেন না। পুলিশ তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা। তার মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। 

সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এএফ এম সায়েদ কালের কণ্ঠকে বলেন, নিজের গায়ে নিজে কিরোসিন তেল ঢেলে আগুনে পুড়ে আত্মহত্যা করেছে হিমু। তিনি গত তিন বছর ধরে শ্যামপুর এলাকায় একাই বসবাস করতেন। 

‘হিমালয় হিমু’ নামে হিমুর ফেসবুক আইডিতে গিয়ে দেখা যায়, বুধবার রাতে আত্মহননের আগে তিনি ফেসবুকে কয়েকটি লেখা পোস্ট করেন। এর মধ্যে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি লিখেন- ‘ছোটকাল হৈতেই আগুনআমার অনেক পছন্দ’।

তার মৃত্যুর খবরে অ্যাক্টিভিস্ট কল্লোল মোস্তফা ফেসবুকে লিখেন- ‘কিভাবে সম্ভব! কেন এরকম করল হিমু? রানা প্লাজার উদ্ধার তৎপরতায় যে মানুষগুলোকে সত্যিকারের হিরো মনে হয়েছিলো, হিমু ছিল তার মধ্যে অগ্রগামী। এত সিরিয়াস ও ডেডিকেটেড ছিল! ধ্বংসস্তুপের যে গভীরতায় যারা ঢুকতে সাহস করতো না, হিমু অবলীলায় সেখানে চলে যেত আহত-নিহত মানুষদের উদ্ধার করতে। হি ওয়াজ রিয়েলি মাই হিরো। ...ভীষণ কষ্ট লাগছে হিমুর মতো প্রাণবন্ত একটা ছেলে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করছে শুনে। খুব খারাপ লাগছে।’

রানা প্লাজায় উদ্ধারকারী হিমালয় হিমু অরফে নওশাদ হাসান হিমুর অকাল মৃত্যুতে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির পক্ষ থেকে সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার, সাধারণ সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু গভীর শোক প্রকাশ করেন।

এই নেতৃবৃন্দ কালের কণ্ঠকে জানান, মানসিক সারল্য ও সংবেদনশীলতার কারণেই তিনি ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন রানা প্লাজার উদ্ধার ও তার পরবর্তী কাজে। তারমতো মানুষ বর্তমান সময়ে পাওয়া খুব কঠিন। ২৪ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে রানা প্লাজা ধসে পর থেকেই বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির পক্ষ থেকে ভবনের পেছন দিকে উদ্ধার ক্যাম্প খোলা হয়। বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি, প্রতিবেশ আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মী, সমর্থক এক্টিভিস্টরা এবং সাভারের কিছু স্থানীয় বাসিন্দা দিন রাত ২৪ ঘণ্টা সেই ক্যাম্পে থেকে উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করে। ১৭ দিনের মাথায় উদ্ধার কাজ শেষ হলে এক দিকে চলে নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের নামের তালিকা তৈরি এবং অন্যদিকে চলে হাসপাতালে আহত শ্রমিকদের দেখা শোনা করার কাজ। উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ার পরেও লম্বা সময় ধরে চলতে থাকা এই কাজে অন্য অনেকের চেয়ে খুবই নিষ্ঠার সাথে যুক্ত থেকেছেন নওশাদ হাসান হিমু বা হিমালয় হিমু (ফেইসবুকে অধিক পরিচিত এই নামে)। হাসপাতালে যাদের সেবা সুশ্রুষা করেছেন, তাদের মধ্যে মারা যান রূপালী নামে একজন শ্রমিক। তার পরিবারের সাথে এই হিমু কবর দিতে চলে যান রংপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে। এসমস্ত কাজ শেষ হওয়ার পরেও হিমু বারবার ছুটে গেছেন রানা প্লাজা ধ্বংসস্তুপে। কংক্রিটের জঞ্জাল কিছুটা সরানোর পরে গর্তে পানি জমে পুকুরের মতো সৃষ্টি হয়। সেই পুকুরে নেমে নিহত বা নিখোঁজ শ্রমিকদের হাড়-হাড্ডির সাথে উদ্ধার করেন মোবাইলের সিমকার্ড থেকে শুরু করে শ্রমিকদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস। হিমুদের উদ্ধারকৃত হাড়গুলোকে গরুর হাড় হিসেবে চালিয়ে দিয়ে তাদেরকে বারবার নিবৃত করার চেষ্টা করেছে পুলিশ। কিন্তু থামানো যায়নি হিমুদেরকে। 

এরপর থেকে সে মানসিক ট্রমায় আক্রান্ত হতে শুরু করে। হাতুড়ি কড়াত, ছেনি দিয়ে কেটে ছিড়ে উদ্ধার করেছে জীবিত ও মৃত মানুষ রানা প্লাজার মৃত্যুকূপ থেকে। ২/৩ পর থেকে যখন লাশগুলো পচে গন্ধ বের হতে শুরু করে, সে গন্ধ দূর করার জন্য ব্যবহার করা হতো তীব্র গন্ধের এয়ার ফ্রেশনার, রুমস্প্রে ইত্যাদি। ফলে এয়ারফ্রেশনার, পারফিউম বা যেকোন ধরণের সুগন্ধি অসহ্য ঠেকতো হিমুর কাছে। মুরগী বা গরুর কাঁচা মাংস দেখলে সে ঠিক থাকতে পারতো না। মানসিক ডিপ্রেশন বাড়তে থাকে তার মধ্যে।

২০১৬ সালের পর থেকে বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন সকলের নিকট থেকেও সে দূরে চলে যেতে থাকে। মানুষের চাইতে পশুপাখির সাথে তার সান্নিধ্য বাড়তে থাকে। ঢাকা শহর ছেড়ে সে কখনো থেকেছে নারায়ণগঞ্জ, সর্বশেষ ছিলো সাভারের বিরুলিয়াতে। রানা প্লাজা ধসের ৬ষ্ঠ বছরে এসে এই ২৪ এপ্রিলেই তিনি নিজের শরীরে উগুন ধরিয়ে আত্মহত্যা করেন। 

মৃত সরদার আবুল হোসেন এবং আফরোজা বেগম এর ২ সন্তানের একজন হিমালয় হিমু। জন্ম ২৭ জানুয়ারি ১৯৯১ সাল। তার পৈত্রিক নিবাস বরিশাল জেলার উজিরপুরে বাবরখানা গ্রামে। 

মন্তব্য