kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

রানা প্লাজা ধসের ৬ বছর: দোষীদের শাস্তির দাবিতে কাফন মিছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ১৮:২০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রানা প্লাজা ধসের ৬ বছর: দোষীদের শাস্তির দাবিতে কাফন মিছিল

গত ছয় বছরের মতো এবারো রানা প্লাজায় স্বজন হারানো শ্রমিক পরিবারের সদস্য, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠন বুধবার এসেছিলেন সেই মৃত্যুকূপের সামনে। সন্তান বা স্বামী-স্ত্রী বা ভাই-বোন এসেছিলেন ছয় বছর আগের স্মৃতিকে খুঁজতে। গত ছয় বছর ধরেই শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা বারবার এখানে এসেছেন। কখনো বিচার চেয়ে, কখনো ক্ষতিপূরণের দাবিতে।

নিহত ও নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের প্রতিমাসের ২৪ তারিখ বা তার আশেপাশের ছুটির দিনে রানা প্লাজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে আসছে বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতিসহ আরো কয়েকটি সংগঠন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার বা মালিকপক্ষের তরফ থেকে ২৪ এপ্রিলকে যথাযথ মর্যাদায় স্বীকার করা হয়নি বলে অভিযোগ শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মী ও স্বজন হারা পরিবারের সদস্যদের। উপরন্তু রানা প্লাজার স্মৃতিকে কিভাবে ভুলিয়ে দেওয়া যায় সেই চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তাদের।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি, গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্টসহ অনেক পেশাজীবী সংগঠন প্রতিবছরের মতো এবারো সোহেল রানাসহ সকল দোষীদের শাস্তির দাবিতে কাফন মিছিল করে। সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হার্টিকালচার সেন্টারের সামনে থেকে শুরু হয়ে কাফন মিছিল সাভারের রাজপথ প্রদক্ষিণ করে রানা প্লাজার স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

এ ছাড়াও 'রানা প্লাজায় অতীত ও বর্তমানের বোঝাপড়ায় আলোকচিত্র প্রদশর্নী' অনুষ্ঠিত হয়। তাসলিমা আখতারের তোলা সেই আলোকচিত্রগুলোই স্থাপন করা হয় রানা প্লাজা ও আশপাশের এলাকায়। সকাল ৮টায় শুরু হয়ে এ প্রদশর্নী এবং চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।

রানা প্লাজায় শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংক্ষিপ্ত পথসভায় বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান ও আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতার তাসলিমা আখতার বলেন, সারা দুনিয়ার কারখানার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শ্রমিক হত্যার ঘটনা ঘটে রানা প্লাজায়। প্রায় ১ হাজার ১৭৫ জনের অধিক শ্রমিক নিহত হন। প্রায় আড়াই হাজার আহত শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। যাদের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। স্থায়ী ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে অকর্মণ্য হয়ে পড়েছেন অনেকে। কিন্তু এতো প্রাণ হত্যার পরেও ২৪ এপ্রিলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদায় আজও পালন করা হয় না বলে অভিযোগ তার।

তিনি বলেন, বিজিএমইএ বা মালিকদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম শ্রদ্ধাও প্রদর্শন করতে আসে না। ৪৪ লক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিক এই দিনটিকে শোক ও শ্রমিক নিরাপত্তা দিবস হিসেবে পালন ও সকল কারখানায় ছুটি দাবি করলেও তা আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে- রানা প্লাজার জায়গাকে অধিগ্রহণ করে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার। কিন্তু কোনো স্মৃতিস্তম্ভ তো নির্মাণ করা হয়নি, উপরন্তু রানা প্লাজার ভূমি বেদখল হতে বসেছে। চারপাশের সীমানা ঠেলে ভেতরে চলে আসছে।

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত মালিকের অবহেলায় যতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে তার একটিরও বিচার হয়নি। সকল ক্ষেত্রে অবহেলা অব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত শ্রমিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রানা প্লাজা এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে নির্মম, সবচেয়ে প্রাণধ্বংসী। ১ হাজার ১৭৫ জন শ্রমিক হত্যার ঘটনার পরও সোহেল রানা, কারখানাগুলোর মালিক, ভবন পরিদর্শক, অনুমতি দাতা কারোরই বিচার হয়নি। মোট ১৪টি মামলা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। যেখানে সাক্ষী হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছে সাড়ে ৫০০’র অধিক ব্যক্তিকে। যাদের একজনকেও আদালতে শুনানির জন্য ডাকা হয়নি। ৪১ জন আসামির মধ্যে একমাত্র সোহেল রানা জেলে আটক আছে। ৬ জন পলাতক, ২ জন ইতিমধ্যে মারা গেছে, আর বাকিরা জামিনে বের হয়ে গেছে। বিচারের নামে যে দীর্ঘসূত্রিতা করা হচ্ছে তা আসলে বিচারকে ঠেকিয়ে রাখারই নামান্তর

ধসে পড়া রানা-প্লাজার সামনে অস্থায়ী বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ শেষে এক সমাবেশে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট, সাভার-আশুলিয়া-ধামরাই শিল্পাঞ্চল কমিাটর সভাপতি অ্যাডভোকেট সৌমিত্র কুমার দাশ বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত ভবন মালিকসহ গার্মেন্টস মালিকদের কোনো বিচার করা হয়নি। বিচারের নামে কালক্ষেপণের কৌশল নিয়ে সংশ্লিষ্টদের রক্ষার আয়োজন চলছে। ফলে বিচারহীনতার এক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে গার্মেন্ট সেক্টরে। একের পর এক কথিত দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বেশি ৮৬ ভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতের মূল কারিগর শ্রমিকরা। শ্রম আইন সংশোধন করে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকের আজীবন আয়ের সমান ৪৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবিও উপেক্ষিত। মাত্র ২ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে মালিকদের শ্রমিক হত্যার দায় থেকে মুক্তি দিয়েছে সরকার। যার ফলে মালিকরা দিনে দিনে আরো বেপরোয়া হওয়ার সাহস পাচ্ছে। তাই অবিলম্বে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ আইএলও কনভেনশন অনুযাযী ৪৮ লক্ষ টাকা করাসহ দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করে আইন প্রণয়ন করার দাবি জানান এই শ্রমিক নেতা।

শ্রদ্ধা জানান ভবন ধসে নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরাও। এ সময় শোকাহত অনেক স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকেই শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে রানা প্লাজার সামনে আসেন। এরপর অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

মন্তব্য