kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ওয়াসার পানিতে ময়লা দুর্গন্ধ বাড়ছে ডায়রিয়া

শাখাওয়াত হোসাইন    

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০৮:৩৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ওয়াসার পানিতে ময়লা দুর্গন্ধ বাড়ছে ডায়রিয়া

ওয়াসার সরবরাহ করা পানি যন্ত্রের সাহায্যে বিশুদ্ধ করে পান করে রাজধানীর মালিবাগ এলাকার আফসার উদ্দিন আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। পিউরিফায়ার বা বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রের কিট সাত দিন পর পর পরিষ্কার করার কথা বলা হলেও পানিতে অতিরিক্ত ময়লা থাকায় তিনি তা প্রতি তিন দিনে একবার পরিষ্কার করেন। এর পরও চলতি মাসে তাঁর পরিবারের পাঁচজন আক্রান্ত হয়েছে পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়ায়। পূর্ব মালিবাগের ৯৯ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা সোহেল মিয়ার ৯ বছর বয়সী এক ছেলে ও দেড় বছর বয়সী মেয়েকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে।

মিরপুরের মনিপুর এলাকার বশির উদ্দিনের পরিবারের দুই সদস্যও আক্রান্ত হয়েছে ডায়রিয়ায়। মালিবাগ ও মিরপুর ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি বেড়ে গেছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। ওয়াসার সরবরাহ করা পানি পান করে তারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। ওই সব এলাকায় ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা থাকার কথাও জানিয়েছে তারা।

সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকায় ওয়াসার পানিতে দেখা দিয়েছে দুর্গন্ধ। কোনো কোনো এলাকায় পানির সঙ্গে বেরিয়ে আসছে ময়লা। ওয়াসার ওই ময়লা পানি ফুটিয়ে কিংবা পিউরিফায়ারের সাহায্যে ‘শোধন’ করে পান করার পরও লোকজন আক্রান্ত হচ্ছে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগে। গতকাল শনিবার ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ঢাকায় তাঁদের সরবরাহ করা পানি শতভাগ বিশুদ্ধ বলে দাবি করলেও মিরপুর ও মালিবাগ এলাকার পানিতে সমস্যা থাকার কথা কালের কণ্ঠ’র কাছে স্বীকার করেছেন সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা।

জানা গেছে, মিরপুরের কালশী, সাংবাদিক কলোনি ও মনিপুর; হাতিরঝিলের মহানগর প্রকল্প সংলগ্ন ঝিলকানন আবাসিক এলাকা; মালিবাগ, মগবাজার এবং পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকায় ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে ওই সব এলাকায় প্রায়ই ময়লা পানি বেরিয়ে আসছে। মালিবাগ এলাকায় পানির দুর্গন্ধ খুব বেশি হওয়ায় গোসল করতেও অসুবিধা হয় বলে অভিযোগ করেছে বেশ কয়েকজন বাসিন্দা। দীর্ঘ সময় ফোটানো এবং ছাঁকার পরও ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় মালিবাগ এলাকার অনেক বাসিন্দা বাইরে থেকে পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। আফসার উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বাড়ির পানির ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু পুরো মালিবাগ এলাকায় ওয়াসার পানিতে তীব্র দুর্গন্ধ ও ময়লা রয়েছে। এই পানি পান করে আমার পরিবারের পাঁচজন সদস্য ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।’

২৪৭/১ নিউ সার্কুলার রোডের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আব্দুর রাজ্জাক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে বাসার পানিতে মারাত্মক দুর্গন্ধ ও ময়লা। এই পানি খাওয়া তো দূরের কথা, গোসলও করা যায় না। আমি শান্তিনগর এলাকার এক বাসার গভীর নলকূপ থেকে পানি নিয়ে পান করি।’

গত ৯ ও ১০ এপ্রিল কালশীসহ রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার পর পানিতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানায় অনেকে। ঢাকা সাংবাদিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির সভাপতি নুরুল হুদা বলেন, ‘গত ৯ ও ১০ এপ্রিল কালশী এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টির পর ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে। এই এলাকার অনেক শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।’

তবে ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান দাবি করেন, রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় পুরনো পাইপ এরই মধ্যে পরিবর্তন করায় তাঁদের সরবরাহ করা পানি শতভাগ নিরাপদ। তিনি বলেন, ‘পানি ফোটানোর কোনো প্রয়োজন নেই। ওয়াসার পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।’

কিন্তু সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী জানান, পানি বিশুদ্ধ থাকলেও কোনো এলাকায় পানির লাইনে ত্রুটি রয়েছে। তাই কয়েকটি এলাকায় ওয়াসার পানির মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে নগরবাসীর। মিরপুর এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী পানির সরবরাহ কম। এ ছাড়া নতুন পাম্প করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাচ্ছে না ওয়াসা।

ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. কামরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় পানির উৎপাদন কম। এ ছাড়া মালিবাগ এলাকায় প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় পানিতে সমস্যা রয়েছে। এই প্রকল্পের কাজ আগামী ছয় মাসের মধ্যে শেষ হলে কোনো সমস্যা থাকবে না।’  গত বছরের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণায় ঢাকাসহ সারা দেশে পাইপলাইনে সরবরাহ করা ৮০ শতাংশ পানিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধরা পড়ে। ওই ব্যাকটেরিয়ার কারণে ডায়রিয়াসহ পাকস্থলী ও অন্ত্রের বিভিন্ন রোগ হয়।

মন্তব্য