kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

নির্বাচিত ৬ সংসদ সদস্যের শপথ প্রসঙ্গে:

বিএনপির নেতৃত্ব ও নির্বাচিতরা বিপরীত অবস্থানে

খালেদা জিয়ার মুক্তির জট খুলছে না

এনাম আবেদীন   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০৮:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিএনপির নেতৃত্ব ও নির্বাচিতরা বিপরীত অবস্থানে

সংসদে যোগ দেওয়া-না দেওয়া নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে বিএনপির নির্বাচিত ছয় সংসদ সদস্য এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও নির্বাচিত সদস্যরা শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দিতে আগ্রহী। অন্যদিকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সংসদে যোগদানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বিএনপির সংসদে যোগদানের সম্ভাবনাও কমে গেছে।

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো মনে করে, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। কারণ সরকার যে খালেদা জিয়াকে প্যারোল দিতে আগ্রহী সেটা অনেক মন্ত্রীর কথায়ই স্পষ্ট। অন্যদিকে বিএনপি চাইছে, প্যারোল (শর্তসাপেক্ষে মুক্তি) নয়, খালেদা জিয়ার মুক্তি হোক জামিনে। গত কয়েক দিন ধরেই কয়েকজন মন্ত্রী এবং বিএনপি নেতারা এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন। সে কারণে প্যারোলের জন্য এখনো আবেদন করেনি বিএনপি।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ গতকাল শুক্রবারও বলেছেন, ‘কাউকে তো জোর করে প্যারোল দেওয়া যায় না।’ এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, খালেদা জিয়া প্যারোলের জন্য আবেদন করলে সরকার তা ভেবে দেখবে।

তবে খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতারা বলছেন, প্যারোল তাঁরা চাইবেন না। জামিন লাভের জন্য তাঁরা দেন-দরবার করছেন বলে জানা যায়। যদিও আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থাত্ জামিনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিও অনেকাংশে সরকারের ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করেন বিএনপির নেতাকর্মী ও পর্যবেক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। এর সঙ্গে বিএনপির সংসদে যাওয়া-না যাওয়া নির্ভর করছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির অনেক নেতাও একমত যে, এসংক্রান্ত আলোচনা পর্দার আড়ালে চলছে। কিন্তু সরকার বা বিএনপির পক্ষে কারা তাতে জড়িত সে বিষয়ে সব মহলই অন্ধকারে। বিএনপির মধ্যে পরস্পরবিরোধী নেতারা এ নিয়ে একজন অন্যজনকে সন্দেহ করছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. হারুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিলে আমরা একটা রিস্ক নিয়ে সংসদে যেতে পারতাম। কিন্তু তাঁকে মুক্তি না দিলে কিভাবে যাই!’ তিনি আরো বলেন, ‘নেত্রী প্যারোল নেবেন না। আবার সরকার আদালতে হস্তক্ষেপ বন্ধ করছে না। এখন জামিন হলে একটা সমাধান বেরিয়ে আসত।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচিতরা সংসদে যাওয়ার পক্ষে। কিন্তু নেত্রীর সম্মতি লাগবে।’ হারুনুর রশীদ স্বীকার করেন, বিএনপির একটি অংশ সংসদে যাওয়ার পক্ষে হলেও আরেকটি অংশ বিপক্ষে। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. জাহিদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলাকার জনগণের পক্ষ থেকে সংসদে যাওয়ার চাপ রয়েছে বলেই আমরা সংসদে যাওয়ার পক্ষে। কিন্তু এখন কী করা যাবে! দলের সবাই চাচ্ছে না। সিনিয়রদের বড় অংশও বিপক্ষে বলেই মনে হয়।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচিতদের সংসদে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কেউ শপথ নেবেন না।’ একই অনুষ্ঠানে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিএনপি নির্বাচিতদের সংসদে যাওয়ার আগ্রহে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নির্বাচিতরা বলছেন জনগণের ইচ্ছা। সুতরাং দল বললে তাঁরা প্রস্তুত এবং তাঁদের কাপড়-চোপড়ও প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু আমরা আশা করেছিলাম তাঁরা বলবেন দল বললে আমরা যাব, অন্যথায় যাব না। অথবা খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিলে আমরা যাব নয়তো যাব না—এমন কথা বললেও আমরা খুশি হতাম।’

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, প্যারোলের জানাজা হয়ে গেছে। প্যারোলে আর মুক্তি হবে না। কারণ খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি নেবেন না। এভাবে তিনি মুক্তি নিলে আরেকটি ইতিহাস তৈরি হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপিতে কারা জড়িত জানি না। তবে যারা সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছে তারা এখন উভয় সংকটে পড়বে। সরকারকে তারা কী বলবে? আবার সংসদে গেলেই কোন মুখে যাবে?’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংসদে যাওয়ার প্রশ্নে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার জানা মতে, সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে।’

সংবিধান অনুযায়ী আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শপথ না নিলে বিএনপির সংসদ সদস্যদের সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিত্সাধীন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গত ১৪ এপ্রিল বিএনপির তিন নেতার সাক্ষাতের পরদিন দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই বৈঠককে কেন্দ্র করে বিএনপির মধ্যে আলোচনা ওঠে যে, বিএসএমএমইউ হাসপাতালে বিএনপি নেতাদের বৈঠক ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে বৈঠকের যোগসূত্র আছে। ওই বৈঠকে নির্বাচিত সদস্যদের প্রায় সবাই সংসদে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। যদিও কেউ কেউ বিষয়টি দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেন। কিন্তু দলগতভাবে বিএনপিতে এ নিয়ে কোনো আলোচনা বা বৈঠক না হওয়ায় সিনিয়র নেতারা এ নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে সংসদে না যাওয়ার বিপক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করছেন।

মন্তব্য