kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

অদূরদর্শিতায় আরো কয়েক বছর ঝুঁকিতে পুরান ঢাকা

আরিফুর রহমান    

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ০৮:১৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অদূরদর্শিতায় আরো কয়েক বছর ঝুঁকিতে পুরান ঢাকা

সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং খামখেয়ালির কারণে আট বছর পর এসে কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক শিল্প-কারখানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সংস্থাটি বলছে, কেরানীগঞ্জে নয়; রাসায়নিক শিল্প-কারখানা এখন হবে মুন্সীগঞ্জে। রাজধানীর নিমতলীতে ২০১০ সালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানির পর ওই বছর পুরান ঢাকা থেকে সব রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শিল্প মন্ত্রণালয়। প্রকল্প অনুমোদনসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করে কেরানীগঞ্জে যখন জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে তখন বিসিক নতুন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ৩১০ একর জায়গায় হবে রাসায়নিক কারখানা।

বিসিক বলছে, কেরানীগঞ্জে ৫০ একরের অল্প জায়গায় রাসায়নিক শিল্প-কারখানা হবে না। এই পরিবর্তিত সিদ্ধান্তের ফলে আরো কয়েক বছরের জন্য ঝুঁকিতে থাকল পুরান ঢাকা। কেরানীগঞ্জে যেখানে রাসায়নিক কারখানা স্থাপন ২০১ কোটি টাকায় শেষ হওয়ার কথা ছিল, মুন্সীগঞ্জে সে খরচ উন্নীত হয়েছে এক হাজার ৬৪৮ কোটি টাকায়। সরকারি কর্মকর্তাদের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত ও অদূরদর্শিতায় খরচ বাড়ছে আট গুণ। শতাংশের দিক দিয়ে ৭১৭ শতাংশ; টাকার অঙ্কে এক হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। নতুন প্রস্তাবটি এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে বিসিক।

রাসায়নিক কারখানা কেরানীগঞ্জের পরিবর্তে কেন মুন্সীগঞ্জে—এর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, কেরানীগঞ্জে যে জায়গা রাসায়নিক কারখানা নির্মাণের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, সে এলাকায় ব্যাপক ঘনবসতি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। তা ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস হচ্ছে কেরানীগঞ্জে। এমন বাস্তবতায় সেখানে রাসায়নিক কারখানা নির্মাণের পর ফের অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। হতাহত হবে অসংখ্য মানুষ। ক্ষয়ক্ষতি হবে ব্যাপক।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, একটি রাসায়নিক কারখানা করতে হলে সেখানে লেক, ফায়ার সার্ভিস অফিস, বর্জ্য শোধনাগার, রাস্তাঘাট এসব করা আবশ্যক। কিন্তু ৫০ একর জায়গার মধ্যে এসব অবকাঠামো নির্মাণ করার কোনো পরিকল্পনা বিসিকের ছিল না। এখন তা মুন্সীগঞ্জে স্থানান্তর করা হচ্ছে। অবশ্য মুন্সীগঞ্জে জমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়নেই খরচ হয়ে যাবে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার মতো।

শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, বিসিকসহ সংশ্লিষ্ট যেসব কর্মকর্তা জায়গা ঠিক করার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন এবং পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন, তাঁদের মাথায় তখন কেন এসব বিষয় আসেনি তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। একবার কেরানীগঞ্জ, একবার মুন্সীগঞ্জ—এর মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের অদূরদর্শিতা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং খামখেয়ালি সিদ্ধান্তই ফুটে উঠেছে বলে মনে করেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

স্থপতি ইকবাল হাবিব কালের কণ্ঠকে বলেন, পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই সময় লেগেছে আট বছর। এখন আবার নতুন সিদ্ধান্ত হয়েছে মুন্সীগঞ্জে। এর মাধ্যমে আরো কত বছরের জন্য ঝুঁকিতে পড়ল পুরান ঢাকার বাসিন্দারা? তিনি বলেন, ‘এই আট বছরে আমাদের শুধু স্খলন হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ওপরটাও খেয়েছে, তলারটাও খেয়েছে।’

জানতে চাইলে সদ্য যোগ দেওয়া বিসিকের চেয়ারম্যান মোস্তাক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেরানীগঞ্জে ৫০ একর জায়গার মধ্যে এত বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই বড় পরিসরে আমরা মুন্সীগঞ্জে রাসায়নিক কারখানা নির্মাণ করব। এটা হবে নদীর পাশে। তাই সবার জন্যই স্থানটি মঙ্গলজনক হবে।’ মোস্তাক হাসান বলেন, রাসায়নিক কারখানা করলেই তো হবে না; সেখানে লেক, ফায়ার সার্ভিসের অফিস, সিইটিপি, প্রশাসনিক ভবন থাকতে হবে। সার্বিকভাবে কারখানা হতে হবে পরিবেশবান্ধব। কেরানীগঞ্জে তা করা সম্ভব ছিল না।

তাহলে আগে কেন এসব চিন্তাভাবনা করা হলো না—এই প্রশ্নের জবাবে বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, ‘চিন্তাভাবনা করা হয় না বলেই তো বিসিকের জমি খালি পড়ে থাকে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন হয় দেশে। নদী দখল করে শিল্প-কারখানা করা হয়। আমি নতুন এসেছি। চেষ্টা করব কিছু করার জন্য। আমি মনে করি, পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা সরাতে হলে বড় পরিসরেই তাদের নিতে হবে। সে জন্যই স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’

পুরান ঢাকার নিমতলীতে ২০১০ সালের অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখে সরকার ওই বছর রাসায়নিক গুদাম কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিসিক কর্মকর্তাদের কারখানার জন্য স্থান নির্ধারণ এবং প্রকল্প অনুমোদনে মাঝখানে সময় লেগেছে আট বছর। কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক কারখানা নির্মাণে ২০১ কোটি টাকার প্রকল্পটি গত ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদনও দেওয়া হয়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর কেরানীগঞ্জে রাসায়নিক কারখানা সরিয়ে নিতে তোড়জোড় শুরু করে শিল্প মন্ত্রণালয়। কিন্তু বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর চাপা পড়ে চুড়িহাট্টার ঘটনা। মাঝখানের এই সময়ে বিসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কেরানীগঞ্জ যেহেতু জনবহুল এলাকা, তাই সেখানে রাসায়নিক কারখানা করা নিরাপদ হবে না।

বিসিক থেকে পাওয়া তথ্য মতে, এখন ঢাকা-দোহার অভিমুখী সড়কের মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার তুলসীখালি সেতু সংলগ্ন এলাকায় ৩১০ একর জমি রাসায়নিক কারখানার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। পুরোটাই ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি। এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেছে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন। গোয়ালিয়া, চিত্রকোট ও কামারকান্দা-এই তিন মৌজায় জমিতে বড় পরিসরে পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক কারখানা করতে চায় বিসিক। এই প্রকল্পের আওতায় ৩১০ একর জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি চার লাখ ৩২ হাজার ঘনমিটার ভূমি উন্নয়ন করা হবে। এ ছাড়া একটি অফিস ভবন, ফায়ার সার্ভিস ইউনিট, সীমানাপ্রাচীর, রাস্তা নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ, পুলিশ ফাঁড়ি, বিদ্যুত্লাইন, গ্যাসলাইন, জেটি এবং একটি সিইটিপি নির্মাণ করা হবে।

শিগগিরই প্রকল্পটি সংশোধিত আকারে একনেক সভায় অনুমোদন পাবে বলে জানিয়েছেন বিসিক চেয়ারম্যান। বিশাল এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ ২০২২ সালে শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিসিক।

মন্তব্য