kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

লিজার ঘাতক মোস্তাকিমের আদালতে স্বীকারোক্তি

খুনের ছুরি দিয়েছিল এক বন্ধু

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ১২:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খুনের ছুরি দিয়েছিল এক বন্ধু

গাজীপুরে লিজার ঘাতক মোস্তাকিম ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে গতকাল বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে সহপাঠীসহ আশপাশের কলেজের শিক্ষার্থীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রেম ও বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়ায় মাত্র সাত দিন আগে শারমিন আক্তার লিজাকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল বখাটে মোস্তাকিম রহমান রাজু। লিজার মা-বাবা ঘটনাটি মোস্তাকিমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শামীমের মাধ্যমে তার মাকে জানায়। গত শনিবার মোস্তাকিম ও তার মা বাসায় গিয়ে লিজার মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে আর উত্ত্যক্ত না করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এর তিন দিন পরই বুধবার দুপুরে পরীক্ষা দিয়ে কলেজ থেকে ফেরার পথে ছুরিকাঘাত করে লিজাকে হত্যা করে মোস্তাকিম। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি ঘটনার আগে তাকে দিয়েছিল তারই ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু। ঘটনার সময় ওই বন্ধুসহ চারজন অল্প দূরে অবস্থান করছিল।

এদিকে লিজার ঘাতক মোস্তাকিম ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে সহপাঠীসহ আশপাশের কলেজের শিক্ষার্থীরা।

গতকাল দুপুরে লিজার ভাইয়ের করা মামলায় মোস্তাকিমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে খুনের বিস্তারিত বর্ণনা দেয় মোস্তাকিম। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে বিচারক অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হামিদুল ইসলাম তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন বলে জানান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনাবাড়ী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কলিন্দনাথ গোলকার। 

কোনাবাড়ী থানার ওসি এমদাদ হোসেন জানান, মোস্তাকিম পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে প্রেম ও বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সে লিজার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। এর ওপর তার মায়ের কাছে অভিযোগ জানানোর কারণে মাসহ তাকে লিজার বাসায় গিয়ে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। বন্ধুরা এ ঘটনা শুনে লিজাকে শায়েস্তার পরামর্শ দেয়। তাদের পরামর্শেই হত্যার ভয় দেখিয়ে বিয়ের প্রস্তাবে রাজি করাতেই সে বন্ধুর দেওয়া ছুরি দিয়ে কোনাবাড়ী কাঁচাবাজারের ভেতর লিজাকে আঘাত করে। আঘাতটি গলার নিচের দিকে লেগে শ্বাসনালি কেটে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং শ্বাসনালি কেটে যাওয়ায় লিজার মৃত্যু হয়।

থামেনি মা-বাবার কান্না : গতকাল দুপুরে লিজাদের আাামবাগের বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, যে ঘরে লিজা ঘুমাত ওই ঘরে বসে অঝোরে কাঁদছেন মা তাছলিমা বেগম। পাশের ঘরে শয্যা নিয়েছেন বাবা শফিকুল ইসলাম। তাছলিমা বেগম জানান, গত এক মাস থেকে তাঁর একমাত্র মেয়ের পিছু নিয়েছিল বখাটে মোস্তাকিম। পরে বাড়িতে এসে ক্ষমা চায় এবং ভবিষ্যতে আর কখনো বিরক্ত করবে না বলে জানায়। তাদের কথায় আশ্বস্ত হওয়ায় বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়নি। তাহলে হয়তো এমন নৃশংসতা এড়ানো যেত। তিনি ঘাতক মোস্তাকিমের ফাঁসি দাবি করেন। একই দাবি জানিয়ে বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আর যেন আমার মত কোনো বাবার বুক এভাবে আর খালি না হয়। কোনো বখাটে যেন আর একটি মেয়েকেও উত্ত্যক্ত করতে না পারে, প্রশাসন সে ব্যবস্থা নিক।’ 

একাধিক মেয়েকে উত্ত্যক্ত করেছে মোস্তাকিম : গতকাল দুপুরে কোনাবাড়ীর আমবাগ পশ্চিমপাড়া এলাকার মোস্তাকিমদের ভাড়া বাসায় গিয়ে ঘরের দরজা তালাবদ্ধ দেখা যায়। প্রতিবেশীরা জানায়, মোস্তাকিমদের বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী থানার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে। বাবা আবুল কাশেম একটি প্রতিষ্ঠানের দারোয়ান ছিলেন। এক মাস হলো সিমেন্টের দোকান দিয়েছেন। মোস্তাতাকিমের মা ঝুটের গুদামে কাজ করেন। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে মোস্তাকিম ছোট। গত বুধবার বিকেল থেকে ঘর তালা দিয়ে মা-বাবাও উধাও হয়ে গেছেন। বাড়ির মালিক হাজি জামাল উদ্দিন জানান, মোস্তাকিমের নামে মেয়েসংক্রান্ত একাধিক ঘটনা শুনেছেন। এ নিয়ে বিচার-সালিসও হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, ৮-৯ মাস আগে এক মেয়েকে উত্ত্যক্ত এবং ঘরে ঢুকে পড়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এলাকায় সালিস বসে। মাফ চেয়ে সে ওই সময় রক্ষা পায়। তারও চার-পাঁচ মাস আগে আরেক স্কুলছাত্রীকে প্রেম নিবেদন ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তার বিচার হয়েছিল। তার চলাফেরাও ছিল বখাটে ছেলেদের সঙ্গে। কলেজছাত্র হলেও সে দিনের বেশির ভাগ সময় স্কুল বা কলেজের সামনে আড্ডা দিয়ে কাটাত।

বিক্ষোভ ও মানববন্ধন : কোনাবাড়ীর ক্যামব্রিজ কলেজের ছাত্রী শারমিন আক্তার লিজা হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছে কোনাবাড়ী এলাকার কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। সকাল ১১টার দিকে কোনাবাড়ী এলাকায় ক্যামব্রিজ কলেজ, লিংকন মিলেনিয়াম কলেজসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা ঘাতকের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দেয়। এতে কিছু সময়ের জন্য ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

মন্তব্য