kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

বিবিসি'র প্রতিবেদন

রাফির মৃত্যুতে বদলাবে দৃষ্টিভঙ্গী?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ১৫:৩২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাফির মৃত্যুতে বদলাবে দৃষ্টিভঙ্গী?

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম বিবিসি। এ প্রতিবেদনে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা কর্তৃক নুসরাতের শ্লীলতাহানির ঘটনা থেকে শুরু করে নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারা, দেশজুড়ে প্রতিবাদ, নুসরাতের জানাজা এবং আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য তুলে আনা হয়েছে। 

বিবিসি'র প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যালয়ে রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়া হয়। এ ঘটনার দু সপ্তাহেরও কম সময় আগে স্কুলের প্রধানশিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্লীতনাহানির মামলা করা হয়। তার (রাফি) সাহসিকতা যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। আগুন দেয়ার পাঁচদিনের মাথায় তার মৃত্যু এবং এর মাঝের ঘটনা বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার রক্ষণশীল দেশগুলোতে নারীদের যৌন হয়রানির বিষয়গুলোকে তুলে এনেছে। 

নুসরাতের বয়স ১৯। সে ঢাকার ১০০ মাইল দক্ষিণের ছোট একটি শহর ফেনীর বাসিন্দা। সে একটি মাদ্রাসা বা ইসলামিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতো। গত ২৭ মার্চ সে অভিযোগ করে, প্রধানশিক্ষক তাকে তার অফিস কক্ষে ঢেকে নিয়ে আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করছিল। আরো বাজে কিছু ঘটার আগেই সে দৌড়ে পালিয়ে যায়। 

প্রতিবাদ

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অনেক নারী এবং কম বয়সী মেয়েরা যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা সমাজ কিংবা তাদের পরিবারের দ্বারা লজ্জিত হওয়ার ভয়ে চেপে যায়। কিন্তু এখানে এ ঘটনা প্রকাশ করার মাধ্যমে নুসরাত ভিন্ন হয়ে ওঠে। সে তার পরিবারের সহায়তায় পুলিশের কাছে যায় এবং অভিযোগ দায়ের করে। স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে সে ঘটনার বয়ান দেয়। এই বাজে অভিজ্ঞতা থেকে দূরে রাখতে তাকে নিরাপদ পরিবেশ প্রদান করা উচিত ছিল। পরিবর্তনে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুসরাতের বয়ানকে ভিডিও-তে ধারণ করেন। 

ভিডিও-তে স্পষ্ট ছিল যে নুসরাত মনপীড়ায় ভুগছিল এবং ক্যামেরা থেকে তার মুখ লুকানোর চেষ্টা করছিল। এ অবস্থায় পুলিশ কর্মকর্তা বলতে শোনা যায় যে 'এটা কোনো বড় ঘটনা না' এবং তিনি নুসরাতকে তার মুখ থেকে হাত সরাতে বলেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিডিওটি ফাঁস হয়। 

রাফি এক সংরক্ষণ পরিবারের মেয়ে। একটি ছোটো শহরে থাকতো। একটি ধর্মীয় স্কুলে পড়াশোনা করতো। একটা মেয়ে হিসেবে তার অবস্থানে থেকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলা বাজে পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় এমন ঘটনায় আক্রান্তই তার সমাজ দ্বারা হয়রানির শিকার হয়। অনেক সময় অনালাইনে আক্রান্তকে হেনস্থা করা হয়। আবার অনেক সময় হামলার শিকারও হতে হয়। নুসরাত এ সবকিছুর মধ্যে দিয়ে গেছে। 

২৭ মার্চ পুলিশের কাছে যাওয়ার পর প্রধানশিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর নুসরাতের পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে থাকে। এরপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তুলে ধরেছে বিবিসি। সেই প্রধানশিক্ষকের মুক্তির দাবিতে একদল মানুষের সমাগম, স্থানীয় রাজনীতিবিদদের অংশ নেয়া, নুসরাতকে দোষারোপ করা এবং ৬ এপ্রিল ফাইনাল পরীক্ষার দিনে সেই নৃশংস ঘটনার কথা বলা হয়েছে। 

নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আমি আমার বোনকে স্কুলে নিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমাকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। আমাকে যদি প্রবেশ করতে দেয়া হতো হয়তো আমার বোনের কপালে এমনটা ঘটতো না। 

বাংলাদেশি মিডিয়াগুলো নুসরাতের খবরে ছেয়ে যায়। ১০ এপ্রিল রাফি মারা যায়। ফেনীতে তার জানাজায় হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হন, বলা হয় বিবিসি'র প্রতিবেদনে। 

ঢাকায় নুসরাতের পরিবারের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎতের কথাও বলা হয়েছে। বিভিন্নজনের মন্তব্যও প্রকাশ পেয়েছে প্রতিবেদনে। 

নুসরাতের জানাজা

বিবিসি বাংলার ফেসবুক পেজে আনোয়ার শেখ লিখেছেন, এ ধরনের ঘটনায় অনেক মেয়ে ভয়ে তা প্রকাশ করে না। বোরকা, এমনকি লোহার তৈরি পোশাকও ধর্ষকদের আটকাতে পারবে না। 

লোপা হোসাইন লিখেছেন, আমি সারাজীবনে একটা কন্যা সন্তান চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমি ভীত। এই দেশে কন্যা জন্ম দেয়ার মানে ভয় আর দুশ্চিন্তার জীবন। 

নারী অধিকার বিষয়ক গ্রুপ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৯৪০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল সংখ্যাটা আরো বেশি হবে। 

ওমেন লইয়ার্স' অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক সালমা আলী বলেন, যখন একজন নারী যৌন হয়রানির বিচার চাইতে আসেন, তখন তাকে অনেক হয়রানিতে পড়তে হয়। মামলাগুলো বছর বছর চলতে থাকে। এ সমাজে লজ্জায় পড়েন আক্রান্তরা। এসব অভিযোগ তদন্তে পুলিশেরও ইচ্ছার অভাব রয়েছে। বিচার চাইতে চাইতেই আক্রান্ত হাল ছেড়ে দেন। শেষ পর্যন্ত অপরাধীরা শাস্তি পায় না এবং একই অপরাধ আবারো করে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কাবেরি গায়েন বলেন, এ ঘটনা আমাদের কাঁপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু অতীতেও আমরা দেখেছি, ঘটনাগুলো সময়ের সাথে ভুলে যায় মানুষ। আমার মনে হয় না এ ঘটনার পর বড় কোনো পরিবর্তন আসবে। ন্যায়বিচার হয় কিনা তা দেখতে হবে। 

কিন্তু এখন মানুষের মনে প্রশ্ন: নুসরাতের বিষয়টি তার আক্রান্ত হওয়ার আগে কেন মনোযোগের কেন্দ্র হলো না? আর তার ঘটনা কি যৌন হয়রানির বিষয়ে বাংলাদেশে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী বদলে দেবে? 
সূত্র: বিবিসি 

মন্তব্য