kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১                     

‘গণহত্যা’ শুরুর খবর ছিল মার্কিন তারবার্তায়

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ঢাকা থেকে বার্তাটি পাঠান যুক্তরাষ্ট্রের দূত

মেহেদী হাসান   

২৫ মার্চ, ২০১৯ ১৫:১৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘গণহত্যা’ শুরুর খবর ছিল মার্কিন তারবার্তায়

পাকিস্তান বাহিনীর নিধনযজ্ঞ ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ শুরুর দু’দিনের মাথায় ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ গণহত্যার খবর পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর। ঢাকায় তৎকালীন আমেরিকান কনসাল জেনারেল আর্চার কে. ব্লাডের পাঠানো সেই তারবার্তার বিষয়বস্তু ছিল ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ (বাছাই করে গণহত্যা)। এরপর আরো অন্তত ১৩টি বার্তায় পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে আর্চার ব্লাডের পাঠানো বার্তাটি। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, পাকিস্তান বাহিনীর হত্যাযজ্ঞকে গণহত্যা বলা যায়। তাঁর ওই বার্তায় ক্ষুব্ধ হয়ে তৎকালীন নিক্সন প্রশাসন তাঁকে ওয়াশিংটনে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের অবমুক্ত করা আর্চার ব্লাডের সেই তারবার্তাগুলো পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যার দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ আর্চার ব্লাড তাঁর পাঁচ অনুচ্ছেদের তারবার্তার প্রথম অনুচ্ছেদে লিখেছিলেন, ‘আমরা এখানে, ঢাকায়, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ত্রাসের রাজত্ব প্রত্য করে স্তব্ধ ও আতঙ্কিত। প্রামাণিক তথ্য ক্রমেই জোরালো হচ্ছে যে সামরিক আইন প্রশাসকের কাছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের তালিকা আছে এবং তাদের বাড়ি থেকে বের করে গুলি করে মারার মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে নির্মূল করার চেষ্টা চলছে।’

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে তিনি আওয়ামী লীগের নেতারা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা ও শিকদের হত্যার শিকার হওয়ার তথ্য তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘ফলিত পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ফজলুর রহমান, দর্শন বিভাগের প্রধান ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী অধ্যাপক দেব, ইতিহাস বিভাগের প্রধান এম আবেদিনকে হত্যা করা হয়েছে বলে আমাদের কাছে খবর আছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের রাজ্জাককেও মেরে ফেলার গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়া তালিকায় জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত ও প্রাদেশিক সভার বেশ ক’জন সদস্যের নাম রয়েছে।’

আর্চার ব্লাড তাঁর ওই তারবার্তার তৃতীয় অনুচ্ছেদে লিখেছিলেন, ‘উপরন্তু, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সহায়তায় অবাঙালি মুসলমানরা ধারাবাহিকভাবে দরিদ্র লোকদের কোয়ার্টারগুলোতে হামলা চালাচ্ছে এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছে।  ঢাকার রাস্তায় হিন্দুদের ও ঢাকাছাড়তে আগ্রহী অন্যদের ঢল নেমেছে। আমেরিকানদের বাড়িঘরে অনেক বাঙালি আশ্রয় চেয়েছে এবং তাদের বেশিরভাগই আশ্রয় দিচ্ছেন। 

চতুর্থ অনুচ্ছেদে মার্কিন ওই কূটনীতিক ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ কারফিউ জোরদারের তথ্য দিয়ে জানান, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ‘সার্চ অ্যান্ড ডেসট্রয়’ (তল্লাশি ও ধ্বংস) মিশনের জন্য সহায়ক করার লক্ষে এমনটি করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। 

পঞ্চম অনুচ্ছেদে ব্লাড লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র আজ না হোক কাল আলোর মুখ দেখবেই।’ ওই বার্তাতেই তিনি পাকিস্তান সরকারে মিথ্যা বিবৃতি ও অস্বীকারের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বুঝেও না বোঝার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। 

ব্লাড লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাদের নিজেদের দেশের লোকজনের বিরূদ্ধে যে মাত্রায় সহিংসতা শুরু করেছে তার প্রেক্ষিতে অন্তত আড়ালে হলেও পাকিস্তান সরকারের প্রতি আমাদের হতাশা জানানো উচিত।’

পরদিন ২৯ মার্চ আর্চার ব্লাড যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরে পাঠানো আরেকটি তারবার্তায় পুরান ঢাকায় এক আমেরিকান যাজকের বরাত দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের বর্ণনা দেন। এছাড়া ২৫ ও ২৬ মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের তথ্যও রয়েছে ওই বার্তায়। 

আর্চার ব্লাড লিখেছেন, পাকিস্তানি বাহিনী লোকজনকে ভীত-সন্ত্রাস করতে চাচ্ছে এবং সামরিক আইন কর্তৃপ সমাজের জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী সবাইকে নির্মূল করবে। 

বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সনপ্রশাসনের ইয়াহিয়াঘেঁষা নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে আর্চার ব্লাড ও তাঁর সহকর্মীরা মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে ঐতিহাসিক একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল। সেখানে তাঁরা নিক্সনের নীতির নিন্দা জানান। ২০ জন সহকর্মীর একাত্নতা পোষণ করা ওই বার্তায় আর্চার ব্লাড আলাদা এক মন্তব্যে লিখেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, পূর্ব পাকিস্তানে এখন যে সংগ্রাম চলছে, তার সম্ভাব্য যৌক্তিক পরিণতি হলো বাঙালিদের বিজয় এবং এর পরিণতিতে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।’

ওই তারবার্তায় ব্লাড লিখেছিলেন, ‘আমাদের সরকার গণতন্ত্রের নিপীড়ন এবং নৃশংসতার বিরূদ্ধে নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার তার নাগরিকদের রায় জারদার ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বরং উলটো তারা পশ্চিম পাকিস্তান শাসিত সরকারকে শান্ত করতে এবং তাদের বিরূদ্ধে সম্ভাব্য এবং সঙ্গত নেতিবাচক আন্তর্জাতিক জনসংযোগের চাপ হ্রাস করতে নমনীয়তা প্রদর্শন করছে।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘‘অতি সাম্প্রতিককালের পাকিস্তানকেন্ত্রিক নীতিতে আমাদের স্বার্থকে মূলত মানবিক বলে বিবেচনা করা হয়েছে। আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংঘাত যাকে কিনা দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহুলব্যবহৃত শব্দ ‘গণহত্যা’ দিয়েও প্রকাশ করা যায়, সেটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসেবে দেখে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের নৈতিক এমনকি মানবিক হস্তপেও না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সাধারণ আমেরিকানরা এ নীতিতে তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেছে।’’

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র কনস্যুলেট থেকে পাঠানো তারবার্তাতেও গণহত্যার কথা ছিল। এরপর ১৫ জুন হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার তথ্য তুলে ধরেন এবং পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়া বন্ধের অনুরোধ জানান। 

১৯৭১ সালের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী হেনরি কিসিঞ্জারকে পাঠানো পররাষ্ট্র দফতরের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি থিওডোর এল এলিয়ট জুনিয়রের বার্তাতেও বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার তথ্য ছিল। ১৯৭১ সালের ১৫ জুন ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট নিক্সন, তাঁর জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী হেনরি কিসিঞ্জার ও ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিংয়ের মধ্যে আলোচনাতেও গণহত্যার প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর ভারতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় মার্কিন প্রশাসনকে গণহত্যার নিরব দর্শক হিসেবে অভিহিত করে বেশ কিছু চিঠির কথা জানানো হয়।

১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে লেখা চিঠিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে ওই বছরের ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা চালানোর কথা উল্লেখ করেন।

১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে পাঠানো অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের চিঠিতেও গণহত্যার প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে। ১৯৭৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের বৈঠকেও গণহত্যার কথা ওঠে আসে। সেখানে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘‘পাকিস্তানি জেনারেল ফরমান আলী খান তাঁর স্ক্রেচ প্যাডে লিখেছিলেন এবং আমরা তা পেয়েছি-‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ জমিন অবশ্যই লাল রঙে রাঙাতে হবে।’ ভুট্টো যখন ঢাকায় এসেছিলেন তখন আমি তাকে এ বিষয়টি বলেছি। আমি তাকে দেখিয়েছি। আমি তাকে বলেছি, ‘তোমার পক্ষ থেকে কিছু করো।’  

৬৭ হাজার অবাঙালি পরিবার বাংলাদেশে বসবাস করছে যারা পাকিস্তানে ফিরে যেতে চায়। তারা তাদের ফেরত চায় না। আমরা তাদের রাখতে চাই না। তারা শিবিরে আছে। আমরা তাদের খাওয়াতে পারি না। আমাদের সম্পদ নেই। আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি। আমি গণহত্যার শিকার। পাকিস্তানিরা কেন উদারতা দেখাতে পারে না?’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা