kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১            

এত গাড়ি যায় কোথায়!

আরিফুর রহমান    

১৯ মার্চ, ২০১৯ ১১:০২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এত গাড়ি যায় কোথায়!

উন্নয়ন প্রকল্পের নামে মন্ত্রণালয়গুলো যেসব গাড়ি কেনে, প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পর বেশির ভাগ গাড়ির আর হদিস মেলে না। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই সব গাড়ি পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো গাড়িগুলো ব্যবহার করে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এসব গাড়ির বিষয়ের পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত তৈরি হওয়া সমস্যা নিয়েও একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের সময় বাংলাদেশের চলমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না আনা—এ কারণে মাঠপর্যায়ে সৃষ্ট সমস্যা, কাজের পরিধি ও ব্যয় বাড়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদন আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় উপস্থাপনের কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এতে সভাপতিত্ব করার কথা।

পঞ্চম আদমশুমারি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে সাত বছর আগে ২০১১ সালে। ষষ্ঠ আদমশুমারি প্রকল্পের কাজও শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। অথচ পঞ্চম আদমশুমারি প্রকল্পে ব্যবহূত গাড়ি এখন পর্যন্ত বুঝে পায়নি বিবিএস। প্রতি মাসে সমন্বয় সভায় গাড়িগুলো ফেরত দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হলেও তাতে সাড়া মেলেনি। পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা প্রকল্পে ব্যবহূত ঢাকা মেট্রো চ ৫৩-৪৬৭২ গাড়িটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দপ্তরে ব্যবহূত হচ্ছে। আদমশুমারি প্রকল্পের আওতায় নেওয়া বেশ কয়েকটি মাইক্রোবাস ও অন্য গাড়ি বিভিন্ন দপ্তরে ব্যবহূত হচ্ছে।

প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরও যানবাহন সরকারি বিধি অনুসরণ করে পরিবহন পুলে জমা না দেওয়ায় উদ্বিগ্ন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর রীতি মেনে তা পরিবহন পুলে জমা পড়ছে না। যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার নতুন প্রকল্পে যানবাহন কেনা হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যানবাহন কেনাকাটার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে এর হিসাব রাখাও জরুরি। কিন্তু সেটি এখন করা হচ্ছে না। আইএমইডির কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় যেসব গাড়ি কেনা হয়, এত গাড়ি কোথায় যায়, তার কোনো সঠিক তথ্য নেই। এসব গাড়ির ব্যবহার একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনা জরুরি।

জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়েজুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর সামনে সরকারি প্রকল্পের আওতায় কেনা যানবাহনের বর্তমান চিত্র তুলে ধরব। প্রকল্পগুলো শেষ হওয়ার পর বিধি মেনে পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হচ্ছে না। নতুন নতুন প্রকল্পে আবার গাড়ি কেনা হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।’

জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় কেনা ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৪২০৫ জিপটি পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার পর সেটি পুলের মাধ্যমে এখন ব্যবহূত হচ্ছে। অথচ একই মন্ত্রণালয়ের ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় কেনা ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৭৪৬৯ জিপটি পরিবহন পুলে জমা না দিয়ে মন্ত্রণালয়ে ব্যবহূত হচ্ছে। অন্য সব মন্ত্রণালয়েরও একই চিত্র।

সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত কোথায় কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে তা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। তাতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়গুলো সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করে প্রকল্প তৈরি করে না। প্রকল্প প্রণয়নের সময় বাংলাদেশের চলমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আনে না মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। যার ফলে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। পরবর্তী সময়ে কাজের পরিধি বেড়ে যায়। ব্যয়ও বাড়ে।

আইএমইডি বলেছে, বাংলাদেশে প্রকল্প নেওয়ার সময় বর্তমান বাজার মূল্য এবং চাহিদার কোনো বিশ্লেষণ এবং গবেষণা হয় না। এতে করে মাঝপথে গিয়ে প্রকল্প আবার সংশোধন করতে হয়। একটি বাস্তবায়নকারী সংস্থার সক্ষমতা কতটুকু তা বিবেচনা না করেই ওই সংস্থাকে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দেখা হয় না, ওই সংস্থা কাজটি করতে সক্ষম কি না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেকোনো প্রকল্প তৈরির সময় কোনো ধরনের কর্মপরিকল্পনা থাকে না। এমনকি কেনাকাটার পরিকল্পনাও করা হয় না। ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদলি করাও প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যতম বাধা বলে মনে করে আইএমইডি। প্রকল্প পরিচালক বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া বদলি না করার পরামর্শ আইএমইডির। কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়, সেগুলোয় ঋণ চুক্তি সই, দরপত্র মূল্যায়নে উন্নয়ন সহযোগীদের মতামত পেতে অনেক সময় অপচয় হয়। এতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হয়। এ ছাড়া দেশে ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিষেবা সরানোর কাজ দেরি হওয়ায় প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না।

আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়েজুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কেন দেরি হয়, আমরা সব কিছুই প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরব।’ আইএমইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাস্তাঘাট উন্নয়নে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়, তাতে দেখা গেছে, রাস্তার দুই দিকে প্রয়োজনীয় শোল্ডার রাখা হয় না। এ ছাড়া রাস্তার দুই ধারে খাল, পুকুর থাকলে সেখানে প্যালাসাইডিং ওয়াল দেওয়া হয় না। ফলে রাস্তার পেভমেন্ট কম সময়ের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়।

আইএমইডির বড় একটি অভিযোগ, কিছু কিছু মন্ত্রণালয় আছে যারা ডিপিএম বা সরাসরি কেনাকাটা প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে আগ্রহী। এতে সশ্লিষ্ট প্রকল্পে দরপত্র আহ্বানে অবাধ প্রতিযোগিতা থাকে না। আইএমইডি বলেছে, মন্ত্রণালয়গুলোর সক্ষমতার অভাবের কারণে গত অর্থবছরে ৯০টি প্রকল্পে এক কানাকড়িও খরচ হয়নি। ওই প্রকল্পগুলোর জন্য ৯১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এই ৯০টি প্রকল্পে এক টাকাও খরচ না হওয়ার পেছনে উল্লিখিত কারণগুলোকে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা