kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১            

‘বোমা’ আতঙ্কে বসবাস আরো বিপর্যয়ের ভয়

ওমর ফারুক, রেজোয়ান বিশ্বাস ও শওকত আলী   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১০:৪৬ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



‘বোমা’ আতঙ্কে বসবাস আরো বিপর্যয়ের ভয়

‘নিমতলী পুড়ল, চকবাজারও পুড়ল; এখন কোন দিন যে আমগো এলাকা পোড়ে সেই চিন্তায় আমরা অস্থির। আমার দোকানের আশপাশে সব কেমিক্যালের দোকান। আগুন লাগলে রক্ষা নাই। নিমতলীর ঘটনার পর ভাবছিলাম একটা ঘটনা ঘইটা গেছে, আর হয়তো ঘটব না। কিন্তু চকবাজারের ঘটনা দেখে এখন আর চোখে ঘুম আসে না।’ গতকাল শুক্রবার এভাবেই নিজের আতঙ্কের কথা বলছিলেন পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার এক মুদি দোকানি।

একই রকম কথা শোনা যায় চকবাজারের আশপাশের এলাকা চক মোগলটুলী, চাঁদনীঘাট, পাটুয়াটুলী এলাকার অনেক বাসিন্দার মুখেও। গতকাল দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত ওই এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি রাস্তার পাশের ভবনগুলোর নিচতলায় রাসায়নিক পদার্থের দোকান। তবে ছুটির দিন হওয়ায় দোকানগুলো ছিল বন্ধ। হোটেল, ওষুধের দোকানসহ বিভিন্ন দোকান খোলা ছিল। কথা বলতে গেলে নিজেদের ভয় ও আতঙ্কের কথা তুলে ধরেন ওই সব দোকানের ক্রেতা-বিক্রেতারা। তাঁরা জানান, রাসায়নিকের দোকানের দিকে তাকালেই ভয় লাগে তাঁদের।

মিটফোর্ড এলাকায় বেশির ভাগ মার্কেটেই দেখা গেছে কোনো না কোনো ধরনের রাসায়নিকের দোকান। সবচেয়ে বেশি দোকান পারফিউমের। মিটফোর্ড রোডের ৩৯ নম্বর ভবনে আছে আল-আরাফাত নামের একটি হাসপাতাল। ওই হাসপাতাল ঘেঁষেই রাসায়নিকের দোকান ফেমাস পারফিউমারি সাপ্লায়ার্স। স্থানীয় লোকজন জানায়, দোকানটিতে রাসায়নিক দ্রব্য বিক্রি করা হয়। আল-আরাফাত হাসপাতালের কর্মী আশরাফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চকবাজারের ঘটনার পর আমরা খুব ভয়ের মধ্যে রয়েছি।’ 

মিটফোর্ড রোডে ওষুধের দোকান মেসার্স জনি করপোরেশনে কথা হয় বিক্রয়কর্মী মো. সাত্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চকবাজারের ঘটনার পর থেকে আমরা খুব ভয় ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সময় পার করছি। আমাদের দোকানের আশপাশে অনেক কেমিক্যালের দোকান।’ দোকানের সামনে খুঁটির সঙ্গে ঝুলে থাকা বিদ্যুৎ ও ক্যাবল সংযোগের তার দেখিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দেখেন, দেখেন অবস্থা। আগুন লাগলে বাঁচার কোনো সুযোগ নাই।’

আরেকজন জানালেন, মিটফোর্ডে কেমিক্যালের যত দোকান আছে তার অর্ধেকও নেই চকবাজারে। আগুনের পর চকবাজারের যে অবস্থা হয়েছে, মিটফোর্ড রোডে আগুন লাগলে পরিস্থিতি হবে আরো ভয়াবহ।

মো. হানিফ চাকরি করেন কারওয়ান বাজারে একটি প্রতিষ্ঠানে। তাঁর বাসা মোগলটুলী এলাকায়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখানে আমাদের নিজেদের বাড়ি। আমাদের বাড়ির আশপাশে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে কেমিক্যালের গুদাম। নিমতলী ঘটনার পর বহু আন্দোলন হলো কেমিক্যালের গুদামের বিরুদ্ধে। কিন্তু কেমিক্যাল ব্যবসায়ীরা এতটাই শক্তিশালী যে তাদের নড়াতে পারেনি কেউ। নিমতলীর ঘটনার পর থেকেই ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে থাকি আমরা। এর মধ্যে চকবাজারের ঘটনার পর গত দুই রাত ধরে ঘুমাতে পারছি না। মনে হয় এই বুঝি আগুন ধেয়ে আসছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নিজের বাড়ি না হলে এমন মৃত্যুফাঁদের মধ্যে বসবাস করতাম না। অন্য এলাকায় ভাড়া বাসায় চলে যেতাম। আমার দাবি, পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গুদাম সরিয়ে মানুষজনকে বাঁচতে দেওয়া হোক।’

মো. হানিফের বক্তব্যের কিছুটা সত্যতা পাওয়া গেল চকবাজারে আগুনে ছারখার হওয়া বাড়ি হাজি ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে গিয়ে। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায় পুড়ে যাওয়া বাড়ির সামনে শতাধিক লোকের ভিড়। আশপাশের গলিতেও হাজার হাজার মানুষ। সবাই ওই বাড়ির দিকে এগোতে চাইছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের এগোতে দিচ্ছিল না। ভিড় সামালাতে পুলিশকে লাঠি দিয়ে ধাওয়া করতেও দেখা যায়।

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানশনের বেইসমেন্টের পুরোটাই দাহ্য পদার্থে ঠাসা। প্লাস্টিকের বড় বড় ড্রামের পাশেই রাসায়নিক দ্রব্যের শত শত জার। বস্তায়ও রাসায়নিক দ্রব্য ভরা। ভবনের দোতলার পুরোটাই রাসায়নিকের গুদাম। ওই ভবনে আগুন নির্বাপণের কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। তবে সৌভাগ্যের বিষয় আগুনে ভবনের ওপরের চারটি ফ্লোরের সব মালপত্র পুড়ে গেলেও আগুনের শিখা পৌঁছায়নি বেইসমেন্টের ভেতরে। ওখানে আগুন লাগলে পুরো ভবন বিস্ফোরিত হয়ে গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারত।

ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই পাশের গলির এক বাসিন্দা কথা বলতে শুরু করেন। তখন আরেকজন তেড়ে এসে বলেন, ‘প্লাস্টিকের দানা কোনো কেমিক্যাল না। আধা ঘণ্টা আগুনে জ্বালিয়ে দানাকে নরম করতে হয়। উল্টাপাল্টা কথা বলে মিডিয়াকে বিভ্রান্ত করবেন না।’ পরে জানা গেল, ‘প্লাস্টিকের দানা কেমিক্যাল নয়’ দাবি করা লোকটির নাম আবদুল কাদের। তিনি মুক্তা প্লাস্টিক নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক। তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলায়। পরে আবদুল কাদের কালের কণ্ঠকে জানান, ঘটনার সময় তিনি তাঁর দোকান বন্ধ করে কয়েক পা এগিয়ে মসজিদের কাছে যেতেই একটি পিকআপে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ দেখতে পান। সেখান থেকেই আগুন ছড়িয়ে যায়। তিনি আবারও বলেন, ‘প্লাস্টিকের দানা কোনো সমস্যা না। এটা গলাতে আধা ঘণ্টা লাগে। মানুষ ভুল তথ্য দিচ্ছে। চকবাজারের এই এলাকা প্লাস্টিক দানার জংশন।’

তবে এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান, ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা ও তিন তলায় পারফিউমের গুদাম ছিল। পারফিউম খুবই দাহ্য পদার্থ। আগুন লাগার পর পারফিউমের গুদাম জ্বলে ওঠায় এমন বিপর্যয় ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন।

সেখানে উপস্থিত আরেক বাসিন্দা খুরশিদ আলম বলেন, ‘কেমিক্যালের গুদামগুলো বাসাবাড়ির ভেতরে ম্যাক্সিমাম আছে। অনেকে হয়তো জানেও না। কেমিক্যালের দোকান সরিয়ে নিতে বলা হয়। কিন্তু কেউ শোনে না।’

ওয়াহিদ ম্যানশনের বেশির ভাগ অংশই রাসায়নিকের গুদাম : গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুনে পোড়া ওয়াহিদ ম্যানশনে অবস্থান করে দেখা যায়, ভবনের বেইসমেন্টে রাসায়নিক দ্রব্যে ভরা শত শত বস্তা, কার্টন ও ড্রাম স্তরে স্তরে সাজানো। পণ্যগুলোর সবই অতি দাহ্য পদার্থ। ফায়ার সার্ভিস ওই সব বস্তা, ড্রাম ও কার্টন প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করে জানতে পেরেছে, ওই সব রাসায়নিক দ্রব্য অস্ট্রিয়া, ভারত, জাপান ও চীন থেকে আমদানি করা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, বেইসমেন্টটি গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হলেও সেখানে ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সেখানে যে পরিমাণ কেমিক্যাল রয়েছে তাতে যদি আগুন লাগত তাহলে পুরো ভবনটি বিস্ফোরিত হওয়ার প্রচণ্ড ঝুঁকি ছিল। বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের মৃত্যুঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও জীবন তুচ্ছ করে রাসায়নিকের গুদামের মধ্যেই বসবাস করছিল নারী, শিশুসহ অনেকেই।

ওয়াহিদ ম্যানশনের বেইসমেন্ট থেকে চারতলা পর্যন্ত কয়েকটি কক্ষ ছাড়া পুরোটাই রাসায়নিকের গুদাম। বেইসমেন্ট থেকে বেরিয়ে ভবনটির দোতলায় সিঁড়িঘরের পাশেই দুটি বস্তা পড়ে থাকতে দেখা যায়। বস্তার ভেতরে প্লাস্টিক কণা বলে জানা গেছে। পাশেই দুটি নীল রঙের ড্রাম। সিঁড়ি বেয়ে দরজার সামনে যেতেই পারফিউমের পোড়া গন্ধ নাকে লাগে। সেখানে নানা ব্র্যান্ডের বডি স্প্রে, এয়ার ফ্রেশনার, লোশনের পোড়া ক্যান পড়ে ছিল। ক্লারিশ ব্র্যান্ডের পারমিউমের ক্যানের গায়ে আগুনের সতর্কতামূলক চিহ্ন দিয়ে নিচে লেখা রয়েছে, ‘এক্সট্রিমলি ফ্লেমেবল’ অর্থাৎ অতি দাহ্য।

ওখান থেকে বেরিয়ে তিনতলায় ওঠার আগে গেটে লেখা ওয়াহিদ মঞ্জিল। অর্থাৎ ওই অংশটি আবাসিক বলে মনে হয়। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, তিন ও চারতলায় আবাসিক কক্ষের পাশাপাশি বিভিন্ন কক্ষে রাসায়নিক সরঞ্জাম। ওপরের দুটি ফ্ল্যাটে বাড়ির মালিকের দুই ছেলে পরিবার নিয়ে থাকতেন। আরো দুটি ফ্ল্যাটে ছিলেন ভাড়াটিয়ারা। নিচতলায় পোড়া জিনিসপত্র চোখে পড়ে। গেটের পাশে একটি চৌকি পড়ে ছিল। সেখানে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী থাকতেন। তিনি ঘটনার রাতে ভবনের সামনে ঝাড়ু দিতে গিয়ে পুড়ে মারা যান। আগুনে ওই নিরাপত্তাকর্মীর মেয়ের জামাই ইব্রাহিম (৩০) ও তাঁর এক ঘনিষ্ঠজনও মারা যান। গেটে থাকা মনির নামে একজন এসব তথ্য দিয়ে বলছিলেন, তিন বছর ধরে এই বাসায় তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন তিনি (মনির)। ঘটনার রাতে পরিবার নিয়ে তিনি বাসায়ই ছিলেন। আরো ছিলেন বাড়ির মালিকের ছোট ছেলে সোহেল ও তাঁর পরিবার এবং অন্য ভাড়াটিয়া। এ ছাড়া চারতলায় বাড়ির মালিকের বড় ছেলে হাসান পরিবার নিয়ে থাকেন। তবে হাসান ঘটনার সময় বাসায় ছিলেন না।

ভবনটির নিচতলার মুক্তা প্লাস্টিকের মালিক আব্দুল কাদের বলেন, ওপরে দোতলাসহ চারতলা পর্যন্ত ক্যামিকেল জাতীয় কোনো কিছুর গুদাম ছিল সেটা কখনো জানার চেষ্টা করেননি তিনি। গত ৩০ বছর ধরে তিনি ওই ভবনে ব্যবসা করছেন। আগুন লাগার ৫ থেকে ৭ মিনিট আগে দোকান থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে এগোতেই বিকট শব্দ পান তিনি। এরপর পেছনে তাকিয়ে দেখেন আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুন এত বেশি ছড়ায় যে কাউকে উদ্ধার করার কোনো অবস্থাই ছিল না। তিনি জানান, ওয়াহিদ ম্যানশনের নিচতলায় বেশির ভাগ প্লাস্টিকের দোকান। দোকানগুলো হলো এসআর প্লাস্টিক, পারভেজ প্লাস্টিক, টিআর প্লাস্টিক, মুক্তা প্লাস্টিক, আহসান প্লাস্টিক, শাওন প্লাস্টিক, মফিজ প্লাস্টিক, মদিনা ডেকোরেটর (রঙের দোকান), ডি এন্টারপ্রাইজ প্লাস্টিক, শরিফা ফ্রিজ ও ডেকোরেশন। দোতলায় কসমেটিক ও পারফিউমের গুদাম ছিল।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, “আগুন আন্ডারগ্রান্ডের এই বেইসমেনে ঢুকতে পারলে ঘটনার ভয়াবহতা আরো বাড়ত। অগ্নিনির্বাপণের সময় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম ‘আগুন কনফাইন্ড (সীমিত) করে রাখার’।” গতকাল দুপুরে ওয়াহিদ ম্যানশনে ক্যামিকেলের গুদাম দেখিয়ে তিনি বলেন, টিনের কৌটা, প্লাস্টিকের বস্তা বা কার্টনের মধ্যে যেসব কেমিক্যাল রয়েছে সেগুলো অতি দাহ্য পদার্থ।

ঘটনাস্থলের অবস্থা ব্যাখ্যা করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান কালের কণ্ঠকে বলেন, পুরো জায়গাটাই (ওয়াহিদ ম্যানশন) কেমিক্যালের দোকান আর গুদামে ভরা ছিল। এ কারণেই আগুনের ভয়াবহতা এত বেশি ছিল।

ওয়াহিদ ম্যানশনে কেমিক্যাল থাকার কথা তদন্ত কমিটিগুলোর সরেজমিন পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। গতকাল সকাল থেকে তদন্ত কমিটিগুলোর সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অনেকটা একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, ওয়াহিদ ম্যানশনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তদন্ত কমিটির সদস্য এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান গতকাল ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরিদর্শন করে বলেন, ‘ভবনে অবশ্যই কেমিক্যাল ছিল। সেই সঙ্গে ভবনের ভেতরে গ্যাস লাইটার রিফিলের ক্যানেস্টার ছিল। এটা নিজেই একটা দাহ্য পদার্থ। এ ছাড়া অন্যান্য কেমিক্যালও ছিল। প্রতিটি জিনিসই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। পারফিউমের বোতলে রিফিল করা হতো এখানে। সেই বোতলগুলো ব্লাস্ট হয়ে বোমের মতো কাজ করেছে। এগুলো আগুন টিগার করেছে, যে কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। কেমিক্যালের কারণেই আগুন এভাবে ছড়িয়েছে। তা না হলে কখনোই আগুন এভাবে ছড়ায় না।’

লে. কর্নেল এস এম জুলফিকার রহমান আরো বলেন, ‘আমরা দেখেছি এখানে যে জিনিসগুলো আছে সেগুলো অবশ্যই কেমিক্যাল। ওয়াহিদ ম্যানশনে কেমিক্যাল ছিল না—শিল্পমন্ত্রী কথাটা কোন আঙ্গিকে বলেছেন এটা আমার জানা নেই।’

কমিটির আরেক সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ভবন পরিদর্শনকালে দেখেছি পাঁচটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াহিদ ম্যানশনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার কলাম এবং বিমগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভবনটা ব্যবহার করা যাবে কি না তা আগামী সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত বলা যাবে। এ ছাড়া অন্য ভবনগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য যে শক্তি দরকার তা আছে বলে আমরা মনে করি। আমরা ঘুরে দেখলাম, ওয়াহিদ ম্যানশন একটি অনেক বড় ভবন। এটি কমপক্ষে ১০ কাঠা জমির ওপর নির্মিত। এ ধরনের ভবনের মধ্যে মাত্র একটি সিঁড়ি, যা পর্যাপ্ত নয়। ভবনের দ্বিতীয় তলাটা পুরোটাই গুদাম ছিল। ওই ভবনে আগুন নির্বাপনের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়।’

রাজউকের অথরাইজড অফিসার নুরুজ্জামান জাহিদ বলেন, ‘এই ভবনটি রাজউক অনুমোদিত কি না আমরা ওভাবে এখনো তথ্য নিতে পারিনি। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাবে আসলে তারা অনুমোদন নিয়ে ভবন নির্মাণ করেছে কি না।’

ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও সিটি করপোরেশনের মেয়র এলাকাবাসীকে অনুরোধ করেছেন তারা যেন এই কেমিক্যালগুলো সরিয়ে নেয়। এখানে কিন্তু কোনো কেমিক্যালের লাইসেন্স দেওয়া হয়নি এবং কোনো লাইসেন্স রিনিউ করা হয়নি। এগুলোর জন্য আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন আগুন লেগেছে এবং কারা এই ঘটনার জন্য দায়ী কমিটি সে বিষয়ে তদন্ত করবে।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে অনেক ক্লু পেয়ে আমরা ধারণা করছি, গ্যাস সিলিন্ডার অথবা কেমিক্যাল বিস্ফোরণে আগুন ধরতে পারে।’ গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

এদিকে বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন পরিদর্শক মুনীরা ইয়াসমিন ও তোফাজ্জল হোসেন।

সেই পিকআপের সিলিন্ডারটি অক্ষত : পরিদর্শক শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা কয়েকটি গাড়ি চেক করেছি। অনেকেই দুর্ঘটনাস্থলে থাকা যে পিকআপটির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাতের কথা বলেছিল, সেই পিকআপের সিলিন্ডারটি অক্ষত অবস্থায় আছে।’

বিস্ফোরিত হয়নি ট্রান্সফরমার : ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের কারণে আগুন লাগেনি বলে জানান ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান। তিনি বলেন, পুরান ঢাকার এই আগুনের ঘটনায় দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন লালবাগ জোনের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী সারোয়ার কায়নাত ও প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম মুকুল।

তবে প্রাথমিক তদন্ত শেষে বিকাশ দেওয়ান বলেন, চুড়িহাট্টা মোড়ের আগুনের ঘটনায় কোনো ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়নি।

চার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ : ওয়াহিদ ম্যানশন ছাড়াও আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত আরো তিনটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে রাজউক। অপর তিনটি ভবন হলো—ওয়াহিদ ম্যানশনের পাশের পাঁচতলা ভবন, সামনের একটি চারতলা ভবন এবং পাশের অপর একটি দোতলা ভবন। গতকাল ওই সব ভবনের গায়ে লাল কালি দিয়ে লেখা দেখা যায়, ‘ভবনটি ব্যবহার না করার জন্য সকলকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’ ওই ভবনগুলোর নিচতলায় অন্তত ২০টি দোকান ছিল। সেগুলোতে কেমিক্যাল, খাবার হোটেল, প্লাস্টিক, চা-সিগারেট ও দুটি ওষুধের দোকান ছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা