kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১       

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা ডিএসসিসির

শাখাওয়াত হোসাইন    

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১১:১৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা ডিএসসিসির

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর প্রায় ৯ বছর কেটে গেলেও পুরান ঢাকার রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম সরানোর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। উল্টো ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে বন্ধ থাকা ট্রেড লাইসেন্স শর্ত সাপেক্ষে নবায়ন করে দিচ্ছে সংস্থাটি। সর্বশেষ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসি পুরান ঢাকার পাঁচ রাসায়নিক ব্যবসায়ীর ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করেছে। এ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ৫২০টি লাইসেন্স নবায়ন করল সংস্থাটি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসায় অধিপত্য এবং চড়া দামে গুদাম ভাড়া দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে পুরান ঢাকা থেকে সরতে ইচ্ছুক নন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। বংশাল, চকবাজার ও লালবাগ থানা এলাকায় কেমিক্যাল ব্যবসার এক হাজার ৮৯৬টি লাইসেন্স থাকার কথা হলেও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি বলে জানায় এলাকাবাসী। তারা আর কোনো প্রাণহানি ঘটার আগেই পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর দাবি জানিয়েছে।

এদিকে রাসায়নিকের গুদাম পুরান ঢাকা থেকে সরাতে প্রতিটি বাড়িতে শিগগির তল্লাশি করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।

পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম কেরানীগঞ্জে কেমিক্যাল পল্লীতে সরানোর নির্দেশনা ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ২০১৩ সাল থেকে রাসায়নিক গুদামের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়ন করা বন্ধ করে দিয়েছিল ডিএসসিসি। ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়ন বন্ধ থাকলেও অবৈধভাবেই চলছিল রাসায়নিকের ব্যবসা। তবে ব্যাংকিং কাজের সুবিধার্থে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের জন্য সিটি করপোরেশনকে চাপ দেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের চাপের মুখে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। বেনজিন, ইথাইল অ্যালকোহল, মিথাইল অ্যালকোহল, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, থিনার, গ্লিসারিন, সোডিয়াম থায়ো সালফেটসহ অতি দাহ্য ২৯টি রাসায়নিক দ্রব্য না রাখার শর্তে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় মতবিনিময়সভায়। তবে অতি দাহ্য রাসায়নিক না রাখার বিষয়টি কিভাবে নিশ্চিত করা হবে সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেনি ডিএসসিসি, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর।

ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১৯ ফেব্রুয়ারি মিটফোর্ড এলাকার পাঁচটি রাসায়নিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স পরিদর্শন শেষে তাত্ক্ষণিকভাবে নবায়ন করে দিয়েছে ডিএসসিসি। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো রিপন পারফিউমারি অ্যান্ড কেমিক্যাল, মডার্ন পারফিউমারি অ্যান্ড কেমিক্যাল, উম্মে হানি পারফিউমারি অ্যান্ড কেমিক্যাল, আমিন পারফিউমারি অ্যান্ড কেমিক্যাল ও সজীব পারফিউমারি অ্যান্ড কেমিক্যাল।

ডিএসসিসির দাবি, কেমিক্যাল গুদাম পুরান ঢাকার বাইরে স্থানান্তর এবং অতি দাহ্য ২৯টি রাসায়নিক গুদামে না রাখার শর্তে শুধু প্রদর্শনের জন্য ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে নিয়মিত কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হবে বলেও জানায় সংস্থাটি।

ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, পুরান ঢাকায় রাসায়নিক গুদামের কোনো অনুমতি নেই। পুরান ঢাকায় পণ্য প্রদর্শন করে নিরাপদ স্থানে নির্মিত গুদাম থেকে সরবরাহ করার শর্তে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২৯টি অতি দাহ্য রাসায়নিক বেচাকেনা না করার শর্ত দেওয়া হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, চকবাজার, লালবাগ ও বংশাল থানার অলিগলির বেশির ভাগ বাড়িতে আছে রাসায়নিক দ্রব্যের অবৈধ গুদাম। ওই সব স্থাপনায় সব ধরনের দাহ্য রাসায়নিক দ্রব্য বিক্রি এবং রাসায়নিক দিয়ে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা হয়। কোনো ধরনের সাইনবোর্ড না থাকায় বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে ভেতরে রয়েছে অতিমাত্রায় দাহ্য রাসায়নিক। ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে পাওয়া মোটা অঙ্কের জামানত ধরে রাখা এবং রাসায়নিক ব্যবসায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে গুদাম সরাতে আগ্রহ দেখান না স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইমপোর্টারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ও সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান মেজবাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা নিজেদের স্বার্থেই গুদাম সরায় না। কিন্তু সিটি করপোরেশনসহ সরকারি দপ্তরের উচিত তাদের সরাতে বাধ্য করা। নানা সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি।’

চকবাজারের আজগর লেনের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘মিটফোর্ড এলাকায় আছে কেমিক্যালের দোকান। কিন্তু চকবাজার ও বংশাল এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে কেমিক্যাল গোডাউন। নাম-পরিচয় গোপন করে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার জন্য কোনো সাইনবোর্ডও লাগানো হয় না গুদামে।’

কবে নাগাদ রাসায়নিকের গুদাম সরানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে জানতে চাইলে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে চকবাজার, বংশাল ও লালবাগ থানার প্রতিটি ঘরে। কোনো ধরনের রাসায়নিকের উপস্থিতি পেলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকদের। যেকোনো উপায়ে রাসায়নিকের গুদাম পুরান ঢাকার বাইরে নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শরীফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিটফোর্ড, আরমানিটোলা ও বাবুবাজার এলাকায় কোনো গুদাম নেই, সব শোরুম। এই এলাকার অনেক ব্যবসায়ী গুদাম কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করেছেন। তবে চকবাজারে এখনো গুদাম আছে। এ ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশনের সবার সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা