kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

হোতারা আড়ালেই

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১০:৩৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হোতারা আড়ালেই

জীবন বাঁচানোর জন্য অত্যাবশ্যকীয় ওষুধও কখনো কখনো হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। ভেজাল ও নকল ওষুধের কারণে অনেক সময় রোগী সুস্থ হওয়ার বদলে হয়ে পড়ছে আরো অসুস্থ। প্রাণহানির ঘটনাও কম নয়। কিন্তু ওই সব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাচ্ছে আইনের ফাঁক গলে। বাজারে নকল ওষুধ ছড়ানো চক্রের অনেক সদস্য ধরা পড়ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাদের খানিকটা শাস্তিও হচ্ছে। কিন্তু তাতেও কমছে না ভেজাল ওষুধের কারবারিদের দৌরাত্ম্য। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে ভেজাল ওষুধ তৈরির কারখানা। অন্যদিকে রোগীর স্বজনরা বিভ্রান্ত হয়ে কিনছে নকল ওষুধ, যাতে রোগী সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজনীয় সময়ে ওষুধের উপাদান শরীরে না পাওয়ায় হয়ে পড়ছে আরো অসুস্থ। পুলিশ ও র‌্যাব ধারাবাহিক অভিযানে গ্রেপ্তার করছে ওই চক্রের সদস্যদের। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মূলহোতা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝেমধ্যে শাস্তি দিলেও কমছে না ভেজাল ওষুধের কারবার। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব ও কঠোর নজরদারির অভাবে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাজারে পাওয়া ওষুধ আসল না নকল, তা সাধারণের পক্ষে বোঝা কঠিন। আর ভেজাল ওষুধসহ আটক ব্যক্তিদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে যে ধরনের সাজা দেওয়া হয়, তা মূলত প্রতারণা ও ওষুধ নকল করার অপরাধে। এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাজার সুযোগ নেই।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম এ বিষয়ে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় পরিচালিত অভিযানে নকল ওষুধ বাজারজাতকারীদের সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে ওষুধ নকল করা যে মাত্রার অপরাধ, এর পূর্ণাঙ্গ বিচার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি অপরাধপ্রবণতা কমাতে প্রচেষ্টা মাত্র। মূলত মোবাইল কোর্ট জব্দকৃত মালামাল, আসামির স্বীকারোক্তি ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাত্ক্ষণিক সাজা দিয়ে থাকেন। এসব ঘটনায় অপরাধীদের জন্য যেমন এক ধরনের বার্তা দেওয়া হয়, তেমনি ভেজালবিরোধী অভিযানে জনমনেও স্বস্তি ও সচেতনতা তৈরি হয়।’

সম্প্রতি নকল ইনসুলিন ও প্যাথেডিন তৈরি চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। যাত্রাবাড়ী থেকে বিভিন্ন নকল ওষুধ এবং ওষুধ তৈরির সরঞ্জামসহ তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা ইনসুলিন ও প্যাথেডিনের মতো সংবেদনশীল ওষুধের হুবহু নকল মোড়ক ও বোতল তৈরি করে ভেতরে ভেজাল ওষুধ দিয়ে বাজারজাত করত। গ্রেপ্তার করা আব্দুস সোবাহান, নাইমুর রহমান ওরফে তুষার, রিয়াজুল ইসলাম ওরফে মৃদুল, নারগিস বেগম ও ওয়াহিদকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. আবদুল বাতেন বলেন, ‘প্রতারকচক্রটি ভেজাল ওষুধ তৈরি করে তার গায়ে নামিদামি কম্পানির মোড়ক ব্যবহার করছিল। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে সিল বদল করে মেয়াদ বাড়িয়ে বিক্রি করত। এভাবে তারা ধাপে ধাপে প্রতারণা করে আসছিল। নকল ওষুধের এসব কারবারি মূলত অখ্যাত ফার্মেসিগুলোর মাধ্যমে ওষুধ বাজারজাত করে থাকে। এসব নকল ওষুধ শনাক্ত ও আটক করা অনেকটাই জটিল। প্রাথমিক পর্যায়ে জব্দ আলামত ও আসামিদের স্বীকারোক্তিতে নকল ওষুধ চিহ্নিত করা হয়। পরে তদন্তকালে অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়।’

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, নকল ওষুধের কারবারিরা বিভিন্ন গোপন কারখানায় ওষুধ তৈরি করে। তাতে রোগ নিরাময়ের উপাদান থাকে না। বরং নানা রকম রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণে ওষুধ হয়ে ওঠে বিষ। এরপর তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত কম্পানির লেবেল তৈরি করে লাগিয়ে বাজারে ছেড়ে দেয় নকল ওষুধ। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করে তারা প্যাকেটে মেয়াদ, ব্যাচ নম্বর, মূল্য ইত্যাদি নতুনভাবে সংযোজন করে। এরপর কৌশলে তা বাজারজাত করে থাকে।

বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, অধিক মুনাফার জন্য তারা ভেজাল ওষুধ বিক্রি করে। সিন্ডিকেটের সদস্যরা ধরা পড়লে তাদের আইনি প্রক্রিয়ায়ই ছাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। শাস্তি বা জরিমানা হলে সে ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটপ্রধানরা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। মাঠপর্যায়ের কারবারিরা গ্রেপ্তার হলেও সিন্ডিকেটপ্রধানদের পরিচয় প্রকাশ করে না। মূলহোতারা নানাভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে থাকে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে ফার্মেসি ও ওষুধ কারখানা থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে। সেখানে ওষুধের মান ঠিক না থাকলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হয়। ওষুধ নকলকারীরা এ জন্য চেষ্টা করে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও শহরের অলিগলিতে ভেজাল ওষুধ বাজারজাত করার। বাংলাদেশে ওষুধের সবচেয়ে বড় পাইকারি মার্কেট রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায়। সেখানে সিন্ডিকেট সদস্যরা অবস্থান নিয়ে কম দামে ওষুধ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ব্যবসায়ীদের কাছে গছিয়ে দেয় নকল ওষুধ। এভাবে রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওষুধের দোকানে ছড়িয়ে পড়ে ভেজাল ও নকল ওষুধ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা