kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

মানুষ গড়ার শিল্পীদের শ্রদ্ধা ভালোবাসা

কালের কণ্ঠ’র দশম জন্মদিনে ৩০ শিক্ষাগুরুকে সম্মাননা প্রদান

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১১ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৭:৪০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মানুষ গড়ার শিল্পীদের শ্রদ্ধা ভালোবাসা

বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে কালের কণ্ঠ’র সম্মাননা পাওয়া শিক্ষকদের সঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী, ইউজিসি চেয়ারম্যান, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদক। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সরাসরি শিক্ষার্থী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই গুণী শিক্ষক দীর্ঘ ছয় দশক জ্ঞানের আলো বিলিয়েছেন শিক্ষার্থীদের মাঝে। মানুষ গড়ার এ শিল্পীকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংবর্ধনা ও সম্মাননা দিয়েছে দেশের অন্যতম পাঠকপ্রিয় দৈনিক কালের কণ্ঠ। সম্মাননায় অভিভূত অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জীবনে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছি। শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা পেলাম এই প্রথম। কালের কণ্ঠ শিক্ষকদের সংবর্ধনা ও সম্মাননার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
 
কালের কণ্ঠ’র সংবর্ধনা ও সম্মাননায় নিজের মুগ্ধতা ও ভালোবাসার কথা জানিয়ে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, গবেষক, সংগঠক ও অধ্যাপক সন্জীদা খাতুন গেয়ে শোনান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের কয়েক পঙিক্ত—‘যদি প্রেম দিলে না প্রাণে/ কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে’। তার আগে ড. সন্জীদা খাতুন বলেন, ‘একজন গুণী শিক্ষক শুধু শিক্ষার্থীদের আলোকিত করেন না, আলোড়িত করেন গোটা দেশকেও। শিক্ষক হিসেবে জীবনে এই প্রথম সম্মাননা পেলাম। সত্যিই আমি অভিভূত।’
 
মানুষ ও জাতি গঠনের শিল্পী মহান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, সন্জীদা খাতুনকেই শুধু নয়, শিক্ষার নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য ৩০ জন গুণী শিক্ষককে গতকাল বৃহস্পতিবার সংবর্ধনা ও সম্মাননা দিয়েছে কালের কণ্ঠ। শিক্ষকদের অবদান ও গুরুত্বের কথা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে তুলে ধরা হয় বিশেষ ক্রোড়পত্রে। ‘ধন্যবাদ, স্যার’ শীর্ষক ওই আয়োজনে শুধু রাজধানী নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষকদেরও তুলে আনা হয়।
 
গতকাল সংবর্ধনা ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে বিদ্যায়তনের শিক্ষক ছাড়াও ছিলেন ক্রীড়া, চলচ্চিত্র, উদ্যোক্তাসহ নানা মাধ্যমের গুণী মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দেশের বহু তারকা ক্রিকেটারের প্রশিক্ষক ওয়াহিদুল গনি। এ ছাড়া ছিলেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর প্রামের মেয়েদের ফুটবল প্রশিক্ষক মফিজ উদ্দিন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া কমপ্লেক্সে কালের কণ্ঠ কার্যালয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে সম্মানিত শিক্ষকদের উত্তরীয় পরিয়ে দেন কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন ও নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা কামাল। ক্রেস্ট, মানপত্র ও অর্থমূল্যের চেক তুলে দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। কালের কণ্ঠ’র মূল কার্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় কার্যালয়েও গতকাল সংবর্ধনা ও সম্মাননা দেওয়া হয় গুণী শিক্ষকদের। রাজশাহীতে সংবর্ধনা ও সম্মাননা জানানো হয় কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হককে, নেত্রকোনায় দেওয়া হয় লেখক ও গবেষক অধ্যাপক যতীন সরকারকে, মৌলভীবাজারে দেওয়া হয় গুণী শিক্ষক রসময় মোহান্তকে।
 
অসুস্থতা ও ব্যস্ততার কারণে কয়েকজন শিক্ষক অনুষ্ঠানে আসতে না পারায় সম্মাননার ক্রেস্ট, মানপত্র ও অর্থমূল্যের চেক পৌঁছে দেওয়া হয় তাঁদের বাসায়।
 
সত্যকে আশিংক নয় পূর্ণভাবে প্রকাশ করার প্রত্যয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আলোকিত হয়ে ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে কালের কণ্ঠ। অল্প সময়েই পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে পত্রিকাটি। পাঠকপ্রিয় দৈনিকটি ১০ বছরে পা রাখল গতকাল। এ উপলক্ষে কালের কণ্ঠ কার্যালয়ে গুণী শিক্ষকদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা জানানো হয়। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কালের কণ্ঠ কার্যালয় সাজানো হয় শিক্ষকদের ছবি দিয়ে। ‘ধন্যবাদ, স্যার’ শীর্ষক ফেস্টুনে শোভা ছড়ায় শিক্ষকদের উজ্জ্বল মুখমণ্ডল। ছবির ওই শিক্ষকদের মধ্যে আছেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক, অধ্যাপক যতীন সরকার, অধ্যাপক সন্জীদা খাতুন, অধ্যাপক অজয় রায়, অধ্যাপক শাহলা খাতুন, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, অধ্যাপক মোহাম্মদ শফি, অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, অধ্যাপক সৈয়দ ফারহাত আনোয়ার, নুরুল আলম, নাছিমা আক্তার, ডেভিড রিচার্ড মুর্মু, সিরাজুল ইসলাম, রসময় মোহান্ত, ফজলুর রহমান, শাহনাজ পারভীন, অসিতরবণ ঘোষ, মফিজ উদ্দিন, ওয়াহিদুল গনি, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, শামীম আহসান, জাহাঙ্গীর আলম শাহ, সালমান খান, বদরুল হুদা খান ও সাবিরুল ইসলাম।
 
শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক কথাসহিত্যিক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘শিক্ষকরা জাতির শ্রেষ্ঠ মানুষ। তাঁরা জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন। আমার বাবাও একজন শিক্ষক। শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করি।’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কালের কণ্ঠকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেমের প্রতি আমাদের যে কমিটমেন্ট রয়েছে, সেটা নিয়ে এগিয়ে যাবে কালের কণ্ঠ। আমরা সত্যকে পুরোপুরিভাবেই প্রকাশ করি। পাশাপাশি কালোকে কালো, সাদাকে সাদা হিসেবেই উল্লেখ করি।’
 
কালের কণ্ঠ সম্পাদক কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। আমি বলব শিক্ষকরা মানুষ গড়ার শিল্পী। কারিগর তৈরি করেন, শিল্পী তৈরি করার পাশাপাশি প্রাণ সঞ্চারও করেন। মানুষের হৃদয় আলোকিত করে সত্য ও সুন্দরের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেন শিক্ষকরা।’ ওই সময় তিনি কালের কণ্ঠ’র নানা সামাজিক দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করেন।
 
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘কালের কণ্ঠ সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল ও দৃঢ়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেমে প্রাণিত হয়ে তারা এগিয়ে চলেছে। মহান শিক্ষকদের সম্মাননা ও সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।’
 
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘সত্যকে সত্য ও মিথ্যাকে মিথ্যা বলার দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে কালের কণ্ঠ’র। শুধু নেগেটিভ সংবাদ নয়, পজিটিভ সংবাদও তারা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। এ পত্রিকা আমি নিয়মিত পড়ি, লিখিও।’
 
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে গান গেয়ে শোনান বিশিষ্ট নজরুলসংগীত শিল্পী ফেরদৌস আরা। এ ছাড়া সমবেত কণ্ঠে গান গেয়ে শোনান সুরসপ্তকের শিল্পীরা।
 
ঢাকার বাইরে থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
 
রাজশাহী : কালের কণ্ঠ’র দশম জন্মদিন উপলক্ষে রাজশাহীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কিশোরবেলার গল্প শোনান বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার খুব কড়া শাসন ছিল। কিন্তু তিনি আমাকে ঘুরে বেড়াতে কখনোই বাধা দেননি। এমনকি সারা দিন কোথায় ছিলাম ও কী করলাম, তা নিয়েও কিছু জিজ্ঞেস করেননি। তবে ভয় করতাম আমার ফুফুকে। ছোটবেলায় খুবই দুরন্তমনা ছিলাম। পুরো গ্রাম চষে বেড়াতাম।’
 
গতকাল দুপুর ১২টায় রাজশাহী নগরীর একটি রেস্তোরাঁয় ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে রাজশাহীর পবা উপজেলার ২৬ জন অনাথ শিশুর মধ্যে খাতা-কলম ও পেনসিল বক্স বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে হাসান আজিজুল হককে গুণী শিক্ষক সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
 
মৌলভীবাজার : মৌলভীবাজারে শিক্ষক রসময় মোহান্তকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ক্রেস্ট ও চেক গ্রহণ করে রসময় মোহান্ত বলেন, ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আমি পিছিয়ে পড়া কমলগঞ্জ থানার মানুষকে একটু এগিয়ে আনার জন্য শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে নিয়েছিলাম। কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছে। কোনো মহৎ কাজ করলে সেটা বৃথা যায় না। আজ সেটা প্রমাণিত হলো। গ্রামে পড়ে থাকা আমার মতো মানুষকে কালের কণ্ঠ খুঁজে বের করে আজ সংবর্ধিত করল।’
 
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আগে শুভসংঘের সদস্য ও আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে একটি শোভাযাত্রা মৌলভীবাজার শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোভাযাত্রা শেষে প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে কেক কেটে কালের কণ্ঠ’র জন্মদিন আয়োজন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সিলেট বিভাগের প্রবীণ সাংবাদিক এম এ সালাম ও শুভসংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি রাশেদা বেগম।
 
নেত্রকোনা : জেলা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক, গবেষক অধ্যাপক যতীন সরকারকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, ‘কালের কণ্ঠ আমাকে যে সম্মাননা দিয়েছে, আমি তার যোগ্য না। কেননা আমার সঙ্গে আরো যে গুণী ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে, আমি তাঁদের তুলনায় কিছুই না। প্রকৃত সাংবাদিকরা সব সময় সত্যকে সমাজের সামনে তুলে ধরে। যতীন সরকারকে দেশের প্রথম সারির পত্রিকা প্রথম আলো, সমকাল, কালের কণ্ঠ দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরেছে।’ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নেত্রকোনা জেলা প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা