kalerkantho


‘মুখ চিনে’ বিধি প্রয়োগ খাদ্য অধিদপ্তরে!

আশরাফুল হক   

১৭ মে, ২০১৮ ১০:২৪



‘মুখ চিনে’ বিধি প্রয়োগ খাদ্য অধিদপ্তরে!

খাদ্য অধিদপ্তরের বদলি, ছুটি বরখাস্তসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোনো নিয়ম-নীতি মানা হচ্ছে না। একজনকে বদলি করে অল্প দিনের মধ্যেই তাঁকে আবার বদলি করা হচ্ছে। তা ছাড়া মামলায় জামিনে থাকা আসামিকে বরখাস্ত করা বাধ্যতামূলক হলেও তা কারো ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে আবার কারো ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। এসব নিয়ম না মানার পেছনে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের প্রভাবশালীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরের বিধি-বিধান সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় না। যাঁরা নীতিনির্ধারকদের অনৈতিক সুবিধা দেন না, তাঁদের জন্য বিধি-বিধানের খড়্গ সব সময় প্রস্তুত থাকে। এখানে মুখ চিনে বিধি প্রয়োগ করা হয়।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ এলএসডির খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামাল উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। গত ৮ জানুয়ারি আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন কামাল উদ্দিন সরকার। এর পর থেকে যথারীতি সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অথচ মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে মুক্ত হলেও চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দপ্তরের নিরাপত্তা প্রহরী রানা কুমার শীলকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনাটি উল্লেখ করে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মাহবুবুর রহমান খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসানের কাছে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের খাদ্য পরিদর্শক মো. কামাল উদ্দিন সরকারকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ জারির বিষয়ে নির্দেশনা চেয়েছেন। গত ১১ জানুয়ারি এ আবেদন খাদ্য অধিদপ্তরে এলেও কোনো নির্দেশনা দেননি মহাপরিচালক।

এ টি এম সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী লালমনিরহাট জেলার আদিতমারির উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। দুর্নীতির মামলায় জামিনে রয়েছেন। জামিনে থাকাকালে তাঁকে সাময়িক বরখাস্তের নিয়ম রয়েছে। অথচ তাঁকে বরখাস্ত না করে পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বিএসআর) ১-এর ৭৩ নম্বর বিধিতে বলা হয়েছে, ‘ফৌজদারি অভিযোগে অথবা দেনার দায়ে জেলে আটক সরকারি কর্মচারী গ্রেপ্তার হওয়ার তারিখ হইতে সাময়িক বরখাস্ত বলিয়া বিবেচিত হইবেন এবং বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন।’ একই প্রসঙ্গে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অফিস মেমোরেন্ডামে বলা হয়েছে, ‘কোনো কর্মচারী গ্রেপ্তারের পর বা আত্মসমর্পণের পর জামিনে মুক্তি লাভ করিলেও সাময়িক বরখাস্ত হিসেবে বিবেচিত হইবেন।’

রাঙামাটি সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম কর্মস্থলে অবস্থান করেন না। তিনি প্রায়ই অফিসে দেরিতে যান। ছুটির আগেই তিনি অফিস ত্যাগ করেন। বিভিন্ন সময় অফিসের জরুরি কাজে তাঁকে পাওয়া যায় না। তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে তাঁকে বারবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হলেও তিনি তা আমলে নেন না। গত ২ ফেব্রুয়ারি নিরাপদ খাদ্য দিবসের শোভাযাত্রা এবং আলোচনা অনুষ্ঠানে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও তা তিনি মানেননি। ওই সময় তিনি ভারতে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় একটি অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। সরকারি কর্মচারী হয়ে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে বিদেশে যেতে হলে সরকারের অনুমতিসহ বহির্বাংলাদেশ ছুটি নিতে হবে। তিনি বহির্বাংলাদেশ ছুটিসহ কোনো ধরনের অর্জিত ছুটি নেননি। ভারতে অবস্থানের ছবি তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কারণ দর্শানো নোটিশ এবং খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিতভাবে এসব অভিযোগ করেছেন রাঙামাটির জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক। কিন্তু এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি খাদ্য অধিদপ্তর।

ঢাকার এরিয়া রেশনিং কর্মকর্তা নাইয়ার রানুকে ডি-৬ থেকে খাদ্য অধিদপ্তরে বদলি করা হয়। তাঁকে পদায়ন করা হয় সহকারী উপপরিচালক আইডিটিএস পদে। সেখান থেকে তাঁকে বদলি করা হয় ডি-৯-এ। এসব বদলির ঘটনা ঘটেছে দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে। প্রশাসনিক নানা অনিয়মের অভিযোগে খাদ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালক নাইয়ার রানুকে ডি-৬ থেকে প্রত্যাহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁকে প্রত্যাহার করা হলেও অল্প দিনের ব্যবধানেই আবার ডি-৯-এ পোস্টিং পাইয়ে দেওয়া হয়। রেশনিংয়ের এসব পোস্টিং অত্যন্ত লোভনীয় বলে জানান খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

সিলেটের বিশ্বনাথের উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শাহ আল মামুন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর থেকে অদ্যাবধি কর্মস্থলে অনুপস্থিত। খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন। অনুমতি ছাড়া বিদেশে অবস্থানের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

ফরিদপুরের অম্বিকাপুর এলএসডি থেকে গত ২৯ জানুয়ারি ফরিদপুর সদরে বদলি করা হয় সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা মুহাম্মদ আলমগীর হোসেনকে। তাঁর জায়গায় বদলি করা হয় অম্বিকাপুর এলএসডির সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা শেখ জিকরুল আলমকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে অম্বিকাপুর এলএসডিতে বদলি করা হয়েছে। অথচ বদলি নীতিমালায় রয়েছে, দুই বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কোনো প্রশাসনিক কারণ ছাড়া কাউকে বদলি করা যাবে না।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 


মন্তব্য