kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে পুলিশের ভাষ্যই বিশ্বাস করতে হবে মিডিয়াকে?

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ জুলাই, ২০১৭ ০৮:১৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে পুলিশের ভাষ্যই বিশ্বাস করতে হবে মিডিয়াকে?

ফাইল ফটো

খুলনায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে গতকাল সোমবার দুজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এদের মধ্যে একজন হত্যা মামলার আসামি এবং অপরজন তার সহযোগী ছিল বলে পুলিশের অভিযোগ।

পুলিশ বলছে, এই দুজনকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলার মুখে বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় তারা। যদিও এই রকম 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হওয়ার খবর মোটেই নতুন নয়।

এসব ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশের দেওয়া ভাষ্যের বাইরে তেমন কোনো বাড়তি তথ্য পাওয়া যায় না। তা ছাড়া পুলিশের ভাষ্যও প্রায় সব ক্ষেত্রেই হয় হুবহু এক ধরনের। তাই জনমনে বিভিন্ন সময়ে সন্দেহ তৈরি করে এই ঘটনাগুলো।

কিন্তু সংবাদ মাধ্যমগুলোকেও কি পুলিশের দেওয়া ভাষ্যই অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করতে হবে? এই ধরনের কথিত 'বন্দুকযুদ্ধের' ঘটনা তারা কীভাবে কাভার করতে পারে?

খুলনা ঘটনার ক্ষেত্রেই যেমন জেলার সদর থানার কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছেন, রবিবার গভীর রাতে পুলিশের ১৫/২০ জনের একটি দল আটক ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বের হন। পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে শহরের প্রভাতী বিদ্যালয় এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলার মুখে পড়েন তারা। এরপর 'বন্দুকযুদ্ধে' গুলিবিদ্ধ হন অভিযুক্ত দুজন।

অবিকল এই বিবরণের মতোই, পুলিশের হেফাজতে থাকা গ্রেপ্তার আসামিকে নিয়ে এভাবে অস্ত্র উদ্ধার বা অভিযানে বেরোনোর পর বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনার কথা মাঝেমধ্যে শোনা যায়। কিন্তু আসলেই সেখানে কোনো 'বন্দুকযুদ্ধ' হয়েছিল কিনা সেটা যাচাই করার সুযোগ বেশি থাকে না। 

বাংলা ট্রিবিউনের সংবাদ বিভাগের প্রধান হারুন-উর-রশীদ মনে করেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে বন্দুকযুদ্ধের সম্পর্কে আরো তথ্য বের করা সম্ভব।

তিনি বলেন, 'একটা বন্দুকযুদ্ধের তো অনেক টেকনিক্যাল দিকও থাকে। মানে গুলিটা কোন দিক থেকে লাগল, কীভাবে লাগল এই সব। সামনের দিক থেকে লাগলে বোঝা যাবে মুখোমুখি সংঘর্ষে লেগেছে, শরীরের পেছনের দিকে লাগলে বোঝা যাবে পালানোর সময় লেগে থাকতে পারে। কাজেই সংবাদমাধ্যম যদি নিহতের অটোপসি রিপোর্ট বা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ইত্যাদি খতিয়ে দেখতে পারে, তাহলে আমার মনে হয় এখানেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অবকাশ আছে।'

আসলে একজন পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কীভাবে তার কাছে অস্ত্র আসতে পারে বা অভিযুক্তকে সাথে নিয়ে কেন অস্ত্রের খোঁজে যেতে হবে কিংবা দলের একজন ধরা পড়েছে এটা জানার পরও সহযোগীরা গাঢাকা না দিয়ে কেন পুরনো আস্তানায় থাকবে- এসব নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন জনগণের মনে। আর এসব কারণেই একজন পাঠক, দর্শক বা শ্রোতার কাছে বন্দুকযুদ্ধের খবরগুলো এখন অবিশ্বাস্য এবং একপেশে খবর মনে হয়ে থাকে।

বন্দুকযুদ্ধের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে ঢাকার এক পথচারী বিবিসিকে বলেন, 'এটা আদৌ বিশ্বাস করা যায় না। যে লোকটা কাস্টডিতে আছে সে কীভাবে লড়াই করবে, তাও আবার বন্দুক নিয়ে?'

রাজধানীর আরও এক বাসিন্দার কথায়, 'পত্রিকায় বন্দুকযুদ্ধের যে সব গল্প বেরোয় আমি তো সেগুলো পড়িই না। কারণ আমি মনে করি ওগুলো গল্পই। আপনিই বলুন না, কেন অ্যারেস্ট হওয়া একজন লোককে নিয়ে পুলিশ অস্ত্র খুঁজতে যাবে?'

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের বাইরে সাংবাদিকরা যেসব তথ্য সংগ্রহ করেন সেসব অনেক সময় প্রচার বা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না।

এ বিষয়ে হারুন-উর-রশীদ নামের এক প্রতিবেদক বলেন, এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলো কিছুটা সেলফ সেন্সরশিপ করে থাকে। মানুষের কাছে খবরের অপর পিঠটা দেখাতে না পারাটাও একরকম ব্যর্থতা।

তার কথায়, 'প্রতিটা বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার রিপোর্ট করার ক্ষেত্রেও সংবাদমাধ্যমের একটা দায়িত্ব আছে। কোট-আনকোট করেই যদি আমরা দায় সারি, তাহলে তো ফলো-আপ রিপোর্ট করার সময়ও আমাদের ভাবতে হবে সেটা কি এবার তুলে নিতে পারব না কি বজায় রেখে যাব?'

তিনি বলেন, 'আসলে এখানে সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতাই আছে আমি বলব। মিডিয়া এখানে বিনিয়োগ করতে চায় না বরং নিজেদের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে চলে। আর তাদের ওপর যে চাপ থাকে সেটাও তো অস্বীকার করা যায় না।'

মি. রশীদ বলেন, 'যারা বলেন ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা আছে এবং এটা বলে সেগুলোকে জাস্টিফাই করতে চেষ্টা করেন, তারাই যখন দেশে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকেন এবং দেশের নীতি-নির্ধারক হন, সেটাই তো সবচেয়ে বড় চাপ।'

এদিকে বন্দুকযুদ্ধের খবর নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন বা বিতর্ক সেই বিষয়ে জানতে চেয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি তাদের কেউই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা