kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দীন এর চিরবিদায়

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১ মার্চ, ২০১৪ ১৩:১২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দীন এর চিরবিদায়

'উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই/নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই'- জীবন সায়াহ্নে এসেও বিদ্রোহী কবি নজরুলের দ্রোহের কবিতা ধ্বনিত হতো ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দীন আহমেদের কণ্ঠে। ভাষা আন্দোলনের সময় রাজশাহী কলেজ চত্বরের ঐতিহাসিক শহীদ মিনারটি নির্মাণে অংশ নিয়ে তিনি দ্রোহের ওই লাইন দুটি নিজের দেহে লিখে নিয়েছিলেন। সেদিনের উত্তাল দিনের সেই ভাষা সৈনিক আজ সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিলেন। আজ শনিবার ভোরে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন সাঈদ উদ্দীন আহমেদ (ইন্নালিল্লাহি...রাজেউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক কালের কণ্ঠর কাছে একান্ত সাক্ষাৎকারেও কবিতার এই চরণগুলো আবৃত্তি করেছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই ভাষা সৈনিক। ওই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক কালের কণ্ঠে তাঁকে নিয়ে একটা লেখাও ছাপা হয়েছিল, যার শিরোনাম ছিলো 'চলতে ফিরতে পারেন না সাঈদ উদ্দীন'। ওই সাক্ষাৎকারে মাতৃভাষার এই যোদ্ধা একুশে পদক না পাওয়ার হতাশা ব্যক্ত করেন। বাংলার মাটির সবচেয়ে বড় সম্মননার প্রত্যাশা তো মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানরাই করতে পারেন। অবশেষে একুশে পদক না পাওয়ার বেদনা নিয়েই শেষ বিদায় নিলেন ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দীন আহমেদ।
তিনি শুধু ভাষা সৈনিকই ছিলেন না, ছিলেন সম্পাদক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক। ডায়েবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন। তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণাগ্রাহী রেখে গেছেন। আজ বাদ জোহর রাজশাহী সাহেব বাজার বড় মসজিদ প্রাঙ্গণে এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের জানাজা নামাজ শেষে কাদিরগঞ্জ গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন হবে।
রাজশাহী মেডিক্যালের আইসিইউ এর ইনচার্জ ডা. জামিল রহমান জানান, সাঈদ উদ্দীন আহমেদ ডায়াবেটিসসহ কয়েকটি জটিল রোগে ভুগছিলেন। এ অবস্থায় আজ ভোর ৩টার দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
সাঈদ উদ্দীন আহমেদের ছেলে অ্যাডভোকেট রবি উদ্দীন আহমেদ জানান, বার্ধক্যজনিত কারণ ছাড়াও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন বাবা। এই অবস্থায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রবিবার তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে ওই দিনই তাঁকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন সোমবার তাঁকে হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়।
১৯৫০ সালে সাইদ উদ্দিন আহমেদ রাজশাহী মুসলিম হাইস্কুল থেকে এএসসি পাস করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি রাজশাহী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। তখন ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর সর্বস্তরের পেশাজীবী ছাত্র-জনতা অংশ নেয়। তাঁদের মধ্যে দেখা গিয়েছিল টগবগে এ ছাত্রকে। ভাষার জন্য যাঁরা একত্র হয়েছিলেন, সাঈদ উদ্দীন আহমেদ তাদের অন্যতম। ভাষা আন্দোলনের পুরো সময়টা রাজশাহী উত্তাল ছিলো ছাত্র-জনতার আন্দোলনে।
অনেকে দাবি করেন, ভাষা শহীদদের স্মরণে রাজশাহী কলেজ চত্বরে দেশের প্রথম শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর সক্রিয় সেনাদের অকাট্য দাবি, দেশের প্রথম শহীদ মিনার ছিলো এটিই। এই শহীদ মিনার নির্মাণেও অবদান ছিলো ভাষা সৈনিক সাঈদ উদ্দীন আহমেদের।
ওই শহীদ মিনারটি নির্মাণের পর তার গায়ে বিদ্রোহী কবিতার দুটি লাইন লিখে দিয়েছিলেন তিনি। সেই থেকে যখনই তিনি কবিতার এ দুটি চরণ আবৃত্তি করতেন, তখনই তাঁর দুচোখে জল নেমে আসত।
এদিকে, ভাষা সৈনিকের মৃত্যুতে রাজশাহীজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ছুটে যান সাইদ উদ্দিন আহমেদে বাড়িতে। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন সবাই।
সাইদ উদ্দিনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোসা. নূরুন্নাহার বেগম। এক শোক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, জনাব সাইদ উদ্দিন আহমদ ছিলেন রাজশাহীবাসীর সর্বজন শ্রদ্ধেয় বহু প্রতিভাধর ব্যক্তি। জাতীয় মুক্তির প্রতিটি আন্দোলনে তাঁর কলমও সব সময় সরব থেকেছে। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন প্রতিভাবান প্রবীণ দেশপ্রেমিক হারালাম। আমি তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন।
 



সাতদিনের সেরা