kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

মাটির ময়নার \'আনু\' এখন পান বেচেন

হোসেইন জামাল   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ ১১:১৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাটির ময়নার \'আনু\' এখন পান বেচেন

জীবন নিয়ে অনেক সিনেমা হয়, কিন্তু সিনেমার মতো জীবন! কি জানি, কেমন হবে এর উত্তর- যখন আলোচনার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠবেন 'মাটির ময়না'র আনু। প্রয়াত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদের সেই 'মাটির ময়না' এবং ওই সিনেমার সেই ছোট্ট ছেলেটি, যার নাম আনু- কথা তাঁকে নিয়েই। দেশের সীমানা পেরিয়ে যে চলচ্চিত্রটি সাড়া ফেলেছিল বিখ্যাত কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে শুরু করে আরো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাতে 'আনু' নামের নিষ্পাপ চেহারার বালকটির অতি সাবলীল অভিনয় হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল বহু দর্শকের। সেদিনের বালক আনু আজ টগবগে তরুণ।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু তাঁর জীবনের গল্পটা এই মুহূর্তে বড়ই সাদামাটা। তাতে উজ্জ্বল হয়ে থাকার মতো শৈল্পিক স্পর্শের ছিটেফোঁটাও নেই। আনু 'মাটির ময়না' সিনেমার নাম। বাস্তবের নুরুল ইসলাম বাবলুর জীবন সুকান্তের কবিতার মতোই কঠোর-কঠিন গদ্যে লেখা। 'হয়তো' এত দিনে আনু হতে পারতেন এ দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের ব্যস্ততম অভিনেতাদের একজন। তার বদলে তিনি এখন ব্যস্ত থাকেন ছোট্ট চা-দোকানে পান-বিড়ি বেচায়। শ্রমিক বাবার কর্মস্থল চট্টগ্রামের হাফিজ জুটমিল কলোনির চায়ের দোকানটিই যে এখন সেই আনু ওরফে বাবলুর কর্মক্ষেত্র!
কোনো এক আকস্মিকতার সূত্র ধরে গত শনিবার মোবাইল ফোনে এই প্রতিবেদকের যোগাযোগ ঘটে মাটির ময়নার আনুর সঙ্গে। অনেকটা সময় কাটে কথোপকথনে। আর তাতে উঠে আসে বাবলুর সিনেমার আনু হয়ে ওঠা, তারপর আবার জীবনের বাস্তবতায় অচিরেই বাবলুতে প্রত্যাবর্তনের কথকতা।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার কালিকাপুর গ্রামে ১৯৮৮ সালের ৩ এপ্রিল বাবলুর জন্ম। পড়ালেখায় আগ্রহ থাকলেও অতিরিক্ত দুষ্টামির কারণে তাতে খুব একটা এগোয়নি। ১৯৯৯ সালে মামা আবু সাঈদ তাকে নিয়ে আসেন ঢাকায়। ভর্তি করে দেন ইউসেফ স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে। তাঁরা থাকতেন মগবাজার চেয়ারম্যানগলিতে ভোলা চাচার বাসায়। একদিন ভোলা চাচার বাসায় আসেন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের এক ভাগ্নি পূর্বা। তারেক মাসুদ তখন একজন শিশুশিল্পী খুঁজছিলেন। পূর্বা মামাকে জানান বাবলুর কথা। তারপর একদিন ফার্মগেটে তারেক মাসুদের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় বাবলুর। আর সেদিনই জন্ম হয় আনুর।
এরপর কেটে যায় দেড় মাস। হঠাৎ একদিন ডাক পড়ে। এবার হাতে একটি স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাবলু বলেন, 'আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমাকে মুখস্ত করতে বলেছে। আমি করেছি। এভাবে ছয় মাস কেটে যায়। ২০০০ সালের শেষের দিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় প্রথম মাটির ময়না সিনেমার কাজ শুরু হয়। আমি যে সিনেমায় অভিনয় করছি, প্রথমে তা বুঝতেই পারিনি। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়ার আগে সিনেমাটি আমাদের দেখানো হয়। তখন সব বুঝতে পারলাম। '
সিনেমা তৈরি শেষ। আনুর গল্পও শেষ হতে শুরু করে। ঢাকায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ে বাবলুর জন্য। 'ছোটখাটো দুই-একটা কাজ আসত। তবে ঠিকমতো টাকা-পয়সা দিত না। এভাবে তো ঢাকা শহরে চলা যায় না। তাই রাগ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি আর কাজ করব না। '- বাবলুর কণ্ঠে স্পষ্টতই অভিমানের সুর।
পড়াশোনাটা না করা নিয়েই বাবলুর দুঃখবোধের কথা শোনা গেল বেশি। তার প্রতিধ্বনি তুলে বললেন, 'মাটির ময়নার পর হাতে আর কাজ আসেনি। তখন তারেক স্যারের সঙ্গেই টুকিটাকি কাজ করতাম। এভাবেই কেটে যায় অনেকটা সময়। একদিন স্যারও (তারেক মাসুদ) মারা গেলেন এক্সিডেন্টে। এরপর তো কাজের আর কোনো আশাও করতে পারিনি। ' কথায় কথায় বাবলু জানালেন, এমনকি মাটির ময়না সিনেমার সহ-অভিনেতাদের সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ রাখেন না তিনি। 'কী হবে যোগাযোগ রেখে!'- অভিমান ঝরে পড়ে বাবলুর বুক চিরে।
একটা সময় পর্যন্ত নানা কাজের কারণে পড়াশোনাটা ভালোভাবে করা হয়নি। তবে পড়াশোনার করার ইচ্ছা থেকেই আবার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন বাবলু। অভাবের সংসারে বাবা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বড় ছেলে হিসেবে বাবাকে সাহায্য করাটাও গুরুত্বপূর্ণ তাঁর কাছে। তাই বাবার কর্মস্থলের পাশে একটা চায়ের দোকান খুলেছেন তিনি। ছেলেকে একজন বড় অভিনেতা হিসেবে দেখার ইচ্ছা ছিল বাবলুর বাবা মোহাম্মদ হায়দার আলীর। 'মাটির ময়নায় অভিনয় করার পর ওকে নিয়ে সাড়া পড়ে যায়। আমিও তখন স্বপ্ন দেখতাম বাবলু একজন বড় অভিনেতা হবে। কয়েক বছর তারেক স্যারের সঙ্গে কাজ করেছে। স্যার মারা যাওয়ার পর আর তেমন ভালো কোনো কাজ পায়নি। তাই চায়ের দোকানটা করতে দিলাম। জীবন তো চালাতে হবে। '- ছেলের মতো আক্ষেপ বাবার কণ্ঠেও।
মোবাইল ফোনেই সেদিন আরো কথা হয় বাবলুর সঙ্গে। বললেন, 'অনেক নির্মাতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। মোরশেদুল ইসলাম স্যারের কাছে বায়োডাটা জমা দিয়েছি। কোনো সাড়া পাইনি। অন্যান্য নির্মাতার কাছেও তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ ছিল না। তাই ধীরে ধীরে সিনেমার জগত থেকে সরে আসতে বাধ্য হই। ' মাটির ময়নার সুবাদে এত স্বীকৃতির পরও ভালো কোনো কাজ না পাওয়াটা বাবলুকে হতাশ করেছে। তবে এখনো বাবলু স্বপ্ন দেখেন হয়তো কোনো দিন আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন, ফুটিয়ে তুলবেন অন্য কোনো আনুর চরিত্র।



সাতদিনের সেরা