kalerkantho

'কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি সম্ভাবনাময় কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে'

বাকৃবি প্রতিনিধি   

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৪:০৪ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



'কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি সম্ভাবনাময় কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে'

স্বাধীনতা পরবর্তী কৃষির উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য অনন্য। কৃষির উন্নয়নে জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮'তে সবচেয়ে চমকপ্রদ সংযোজন হচ্ছে ন্যানো প্রযুক্তি। জাতীয় কৃষি নীতিতে এ প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি, গবেষক, কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদদের কৌতূহলী ও উদ্বুদ্ধ করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ন্যানো প্রযুক্তি কি, বাংলাদেশের কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বিভিন্ন বিষয়ে কালের কণ্ঠের মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. এহসানুল কবীর। তিনি বলেন, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ন্যানো প্রযুক্তি একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। ন্যানো কণার ব্যবহার উদ্ভিদের পুষ্টির উন্নয়ন, সার ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি, ফসলে উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পানি ব্যবস্থাপনা, ফসলের রোগ নির্ণয়, বালাই দমন, খাদ্য মোড়কীকরণ এক কথায় কৃষির উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম। 

কালের কণ্ঠ: ন্যানো প্রুযুক্তি বলতে আসলে কি বুঝায়?
ড. এহসানুল কবীর: পারমাণবিক বা আণবিক স্কেলে অতি ক্ষুদ্র ডিভাইস তৈরি করার জন্য ধাতব বস্তুকে সুনিপুণভাবে কাজে লাগানোর বিজ্ঞানকে ন্যানো টেকনোলজি বলে। ১ মিটারের ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগকে বলা হয় ১ ন্যানো মিটার। আর এই ন্যানো মিটার স্কেলে যে সমস্ত প্রযুক্তি সম্পর্কিত সেগুলোকেই ন্যানো প্রযুক্তি বলে।

কালের কণ্ঠ: ন্যানো প্রযুক্তি ধারণাটি কিভাবে আসল, এ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
ড. এহসানুল কবীর: ১৯৬৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থবিদ রিচার্ড ফিলিপস ফাইনম্যানকে ন্যানো প্রযুক্তির জনক বিবেচনা করা হয়। তিনিই প্রথম ১৯৫৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অনুষ্ঠিত আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির এক সভায় এক বক্তৃতায় ন্যানো প্রযুক্তির ধারণা দেন। তারপর থেকেই ন্যানো প্রযুক্তি নিয়ে সারাবিশ্বে গবেষণা শুরু হয়।

কালের কণ্ঠ: কৃষিতে কিভাবে এটি কাজে লাগবে?
ড. এহসানুল কবীর: ন্যানো টেকনোলজি কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদের কাছে এটি একটি নতুন বিষয় বলেই মনে হচ্ছে। এর কারণ দুটি- প্রথমত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রমে এবং বিষয়বস্তুতে ন্যানো প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত নয় ও দ্বিতীয়ত দেশে কৃষি গবেষণার অগ্রাধিকার ভিত্তিক ক্ষেত্রগুলোয় ন্যানো প্রযুক্তি এর আগে কখনো স্থান পায়নি।

কালের কণ্ঠ: উন্নত দেশে এর ব্যবহার সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন?
ড. এহসানুল কবীর: উন্নত দেশে তাদের সকল ক্ষেত্রেই এটির ব্যবহার করছে। আজকের আধুনিক যত আবিষ্কার রয়েছে, তার সবগুলোতেই কোনো না কোনওভাবে এটি ব্যবহার করছে। বর্তমানে মানুষের জীবনের সাথে সম্পর্কিত যত বিষয় রয়েছে তার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কিভাবে ব্যবহার করা যায় সেটির গবেষণা চলছে।

কালের কণ্ঠ: বাংলাদেশের কৃষিতে কতটুকু প্রয়োজন মিটাবে?
ড. এহসানুল কবীর: পরিবেশ রক্ষায়, পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনে, পানির বিশুদ্ধকরণে ন্যানো- প্রযুক্তি সম্বলিত ছাঁকনি ব্যবহারে, শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনে ন্যানো- প্রযুক্তি ব্যবহার করার সময় এসেছে। ন্যানো- প্রযুক্তির এসব যুগান্তকারী অবদান আমাদের জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

কালের কণ্ঠ: কৃষির কোন কোন ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি কাজে লাগবে?
ড. এহসানুল কবীর: আমাদের কৃষি প্রধান দেশ। ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে সবার প্রথমে কৃষিতে ব্যবহার জরুরি। কারণ এই খাতে আছে অভিনব সব সম্ভাবনা। কৃষিতে ন্যানো দ্রব্য সম্বলিত সার জমির উর্বরতা বাড়াবে। যদিও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো প্রযুক্তি কৃষকের মাঠ পর্যায়ে এখনো তেমন একটা শুরু হয়নি। কিন্তু শিগগিরই কৃষিতে নানা রকম ন্যানো প্রযুক্তির প্রয়াগ শুরু হবে, তা আশা করা যায়।

অর্থাৎ কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে- ফসলের রোগ নির্ণয়, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, ন্যানো পেস্টিসাইড, ন্যানো ফার্টিলাইজার, ন্যানো হার্বিসাইড, অগ্রাধিকারভিত্তিক ফুড প্যাকেজিং, মৃত্তিকা দূষণ নির্ণয় ও দূরীকরণ, ফসল উন্নয়ন (জাত), উদ্ভিদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সহনশীলতা বৃদ্ধি, সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কালের কণ্ঠ: এ প্রযুক্তির সুবিধা সম্পর্কে যদি বলতেন?
ড. এহসানুল কবীর: ন্যানো প্রযুক্তির সাধারণ জীবনে অ্যাপ্লিকেশনের জন্য সীমাহীন সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ স্বাভাবিক পদার্থের বৈশিষ্ট্য রয়েছে ন্যানো প্রযুক্তির থেকে আলাদা এবং কার্যকলাপও বেশি। ভবিষ্যতে ন্যানো প্রযুক্তি আমাদের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কালের কণ্ঠ: কৃষি গবেষণায় এটি কেমন ভূমিকা রাখতে পারবে?
ড. এহসানুল কবীর: কৃষিতে ভারি ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত এবং শোধন করে ন্যানো প্রযুক্তির সার, বালাইনাশক উদ্ভাবন ও ব্যবহারের মাধ্যমে উপকরণ দক্ষতা অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, ন্যানো সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূমির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

কালের কণ্ঠ: সরকার কৃষিনীতি ২০১৮-এ যুক্ত করেছে এটি, তাহলে এখন আমাদের কাজ কি হবে?
ড. এহসানুল কবীর: পরিবর্তিত জলবায়ুতে রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব ও অজৈব অভিঘাতের কারণে ভবিষ্যৎ ফসল উৎপাদন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত শস্য উৎপাদন বর্তমানের তুলনায় ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে চাহিদার ভিত্তিতে নতুন ও অধিকতর কার্যকর প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন। সম্ভবত সে বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ তে জীবপ্রযুক্তি ও ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আগামী দিনের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতের নীতি গ্রহণ করেছে।

কালের কণ্ঠ: ন্যানো ফার্টিলাইজার সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
ড. এহসানুল কবীর: ন্যানো ফার্টিলাইজার হচ্ছে ‘স্লো রিলিজার’। এটি ফসলের ক্ষেতে ব্যবহার করলে গাছের গোড়ায় জমা থাকবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গাছকে পুষ্টি সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। কোনো অপচয় হবে না তেমনি গাছটিও সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করতে পারবে। এটা এমন একটি সার যেখানে ফসলের প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদানকে অনেক কম মাত্রায় এবং এক সাথে মিশিয়ে উপাদানগুলোকে কম্প্যাক্ট করে পলিমারাইজড করা হয়। ফলে স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। আকারে ছোট হওয়ায় বীজের ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে এই পার্টিকেল বীজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেও প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে। ফলে উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। সেক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশের মতো ন্যানো ফার্টিলাইজার তৈরি করে তা দেশের কৃষকদের হাতে তুলে দিতে পারলে সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে এক যুগান্তকারি অগ্রগতি সাধিত হবে।

কালের কণ্ঠ: এটি দ্রুত বাংলাদেশের কৃষিতে যুক্ত করতে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
ড. এহসানুল কবীর: বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে ন্যানো প্রযুক্তি যেসব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গবেষণা ও বাণিজ্যিক ব্যবহার করা প্রয়োজন সেগুলো হলো- উদ্ভিদ পুষ্টি, শস্য সংরক্ষণ, রোগ বিস্তার-সংক্রান্ত বিষয় ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগ নির্ণয়, জীবপ্রযুক্তি, প্রাণী স্বাস্থ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পণ্য প্যাকেটজাত, পানি ব্যবহার দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি কার্যক্রম। এক্ষেত্রে আলাদাভাবে দেশের যেকোনো জায়গায় গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা খুবই জরুরি। তবেই এ প্রযুক্তির সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষিতে লাগানো যাবে।

কালের কণ্ঠ: বাকৃবিকে কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার আতুড়ঘর বলা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয় কেমন ভূমিকা রাখতে পারে?
ড. এহসানুল কবীর: কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। তা সত্ত্বেও ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা সমাধানের জন্য গবেষণা করা প্রয়োজন। আবার এটি একটি ব্যয়বহুল প্রযুক্তি। সেক্ষেত্রে এককভাবে
এর গবেষণা করা সম্ভব হচ্ছে নাা। আমি মনে করি, কৃষিতে ন্যানো কণা বাণিজ্যিককরণের আগে এর সম্ভাব্য ক্ষতিকারক দিকগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এটি নিয়ে গবেষণাগার স্থাপন করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারে। এক্ষেত্রে বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেম ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমার মনে হয়।

কালের কণ্ঠ: এটি ব্যবহারে আমাদের ভবিষ্যত কৃষি কেমন হবে?
ড. এহসানুল কবীর: ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার ও গবেষণায় উল্লিখিত চিহ্নিত ক্ষেত্রগুলো নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। দেখেন, সময়োপযোগী নীতি প্রণয়ণ এবং তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের নেতৃত্বদানে সফলতার জন্য কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তায় উন্নয়নশীল বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত। কৃষি উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলো খুবই বিস্তৃত এবং যথাযথভাবে ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষিকে আরো টেকসই ও লাভজনক করা সম্ভব। কৃষি গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে ব্যবহৃত রাসায়নিক সারের ৫০ শতাংশের বেশি ও বালাইনাশকের ৯৮ শতাংশের বেশি নানাভাবে নন-টার্গেটেড জীব ও প্রতিবেশে অপচয় হয়। বর্তমানে এক কেজি চাল উৎপাদনে তিন-চার হাজার লিটার পানি ব্যবহার হয়। অস্বাভাবিক হারে অদক্ষ কৃষি উপকরণের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে শুধু যে ফসল উৎপাদন খরচ বাড়ছে তা নয়, সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও অব্যবৃহৎ রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ক্রমে বিপন্ন করে তুলছে। এসব মোকাবেলায় কৃষি নীতিতে উপকরণের ব্যবহার হ্রাসের লক্ষ্যে যুক্তি সঙ্গত কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ন্যানো প্রযুক্তির গবেষণা ও প্রয়াগে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এখনই। তবে এজন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি ও দেশের চাহিদামাফিক গবেষণা তারপরই বলা যাবে ভবিষ্যত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা