kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

একটা চাকরি চাই!

রিয়াদ আনোয়ার শুভ   

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৬:০৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একটা চাকরি চাই!

১৯৭৬ সালের মে মাস। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে রাজশাহী থেকে ফারাক্কা মিছিল বের হবে। সেই মিছিলের সংবাদ ও ছবি সংগ্রহ করার জন্য ঢাকা থেকে সাংবাদিকরা রাজশাহীতে পৌঁছেছেন। রংপুরের নবীন সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের তখনো পর্যন্ত কোনো পত্রিকায় স্থায়ী চাকরি হয়নি। কিন্তু 'সংবাদে' লেখা পাঠান, সেগুলো ছাপা হয়; এই পর্যন্তই। তাঁর নিজের কোনো কার্ড নেই। তারপরও প্রবল উৎসাহ ও চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে তিনি মিছিলের দু'দিন আগেই নিজের পকেটের টাকা খরচ করে রাজশাহীতে পৌঁছে যান।

ভাসানীর মিছিল কাভার করার জন্য সংবাদ অফিস থেকে সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার পাঠানো হয়েছে। তাঁদের কাছে মোনাজাত উদ্দিন পাত্তাই পেলেন না। বরং মোনাজাত উদ্দিনকে পেয়ে ঢাকার ওই সাংবাদিকরা 'পান-বিড়ি-সিগারেট' আনার মতো ফুট-ফরমায়েসের কাজ কিছুটা করিয়ে নিলেন। মোনাজাত উদ্দিনও 'ভয়ে ভয়ে, বিনয়ের সাথে' সেই কাজ করে দেন। প্রতিবাদ করতে পারেননি। ঢাকার সাংবাদিকরা 'যদি মাইন্ড করে'! কারণ তাঁর তো তখন 'চাকরি চাই, নিয়োগপত্র পেতে হবে'।

'সংবাদ'-এর সন্তোষ গুপ্ত সরাসরি বলে দিয়েছেন, 'সংবাদ-এর জন্য উত্তরাঞ্চল ভিত্তিক খবর ও ছবি পাঠাতে পারেন, ভালো হলে ছাপাও হবে। কিন্তু চাকরি'র ব্যাপারে আমি কোনো সুপারিশ করতে পারবো না। আপনার নিজের কাজের যোগ্যতায় যদি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আদায় করতে পারেন, করুন।' ফলে মোনাজাত উদ্দিনের কাছে প্রশ্নটা যোগ্যতার। তাঁকে সেই যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। ভাসানী মিছিল শুরুর আগে স্থানীয় এক মাদ্রাসার মাঠে বক্তব্য দিলেন। মোনাজাত উদ্দিন তাঁর নিজের ভাঙা ক্যামেরা দিয়ে দূর থেকে সমাবেশে ভাসানীর বক্তব্যরত কয়েকটি ছবি তুলে নিলেন। যদিও জানেন এগুলো কোনো কাজে লাগবে না। তারপরও নেশায় পড়ে তুলে নিলেন ছবিগুলো। একবার ভাসানীর মঞ্চের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনো পত্রিকার কার্ড তো নেই! তাই আয়োজকরা ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিলেন। অপমান! থোরাই কেয়ার করলেন মোনাজাত উদ্দিন।

ভাসানী বক্তব্য শেষ করে যে স্থান দিয়ে মিছিল নিয়ে যাবেন আগে থেকেই তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন মোনাজাত উদ্দিন। কারণ, অন্যান্য সাংবাদিক ও ফটো সাংবাদিকদের জন্য গাড়ি তৈরি আছে মিছিলের সাথে যাবার জন্য। মোনাজাত উদ্দিনের সেখানে জায়গা হবে না তা তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু অন্যান্য সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়িটি মুহূর্তেই মিছিল যে দিকে যাবে সেদিকে না গিয়ে ঠিক তার উল্টো দিকে যাত্রা শুরু করল। গাড়ির সাংবাদিকরা 'গাড়ি ঘুরাও, গাড়ি ঘুরাও' বলে চিৎকার শুরু করে দিলেন। কিন্তু ততক্ষণে জনতার স্রোত এতো প্রবল হয়ে উঠেছে যে বেচারা চালকের আর সেই ক্ষমতা ছিল না। এদিকে মিছিল প্রায় চলে গেছে আধা মাইলের মতো। উপায়ান্তর না দেখে সাংবাদিকরা গাড়ি থেকে নেমে দৌঁড় লাগালেন মিছিলের সামনের দিকে। কিন্তু জনতার স্রোতে সেই প্রচেষ্টাও খুব বেশি সফল হল না।

প্রমোদ গুনলেন মোনাজাত উদ্দিন। যে অবস্থা তাতে 'সংবাদ'-এর ফটোগ্রাফারের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই মিছিলের সামনে ভাসানীর ছবি তোলা সম্ভব নয়। অথচ এই ছবি মোনাজাত উদ্দিনের কাছে তোলা আছে। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিলেন এই ছবি ও সংবাদ নিয়েই রওনা দেবেন ঢাকার পথে। তখনকার দিনে রাজশাহী থেকে ঢাকা মানে অনেক দূর আর অফুরন্ত সময়েরও ব্যাপার। কিন্তু মোনাজাত উদ্দিন রাত বারোটার আগেই ঢাকায় পৌঁছবেন এমন পণ করেই রওনা হয়ে গেলেন। পকেটে মাত্র পঞ্চাশটি টাকা। বৃষ্টি পড়ছে গুড়ি গুড়ি। প্রবল প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করে রাজশাহী-নাটোর-ঈশ্বরদী-পাবনা-নগরবাড়ি ঘাট হয়ে ঠিক রাত এগারোটায় ঢাকায় পৌঁছেন আর সাড়ে এগারোটায় পৌঁছেন বংশালের 'সংবাদ' অফিসে।

সন্তোষ গুপ্ত তখন 'সংবাদ'-এর টেবিলে মাথা গুজে বসে আছেন। রাজশাহী থেকে কোনো ছবি তো দূরের কথা সংবাদও এসে পৌঁছেনি। মোনাজাত উদ্দিনকে দেখে সন্তোষ গুপ্ত বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, 'আমি ঠিকই ধারণা করেছিলাম, আপনি আসবেন। ছবি এনেছেন? ফিল্মটা দিন, আপনি বসুন। আমি আপনার খাবারের ব্যবস্থা করি।' কিন্তু মোনাজাত উদ্দিন খাবার স্পর্শ না করে লিখতে বসে যান। একটানা সংবাদ লিখে শেষ করে তারপর বসেন খাবার টেবিলে। 'সংবাদ'-এর প্রথম পাতায় ফারাক্কা মিছিলের লিড নিউজ এলো ছয় কলাম জুড়ে। খবরটি ছাপা হলো মোনাজাত উদ্দিনের নামে। দু'টি ছবিও ছাপা হলো তাঁর নাম দিয়ে। রাতে, অফিসেই পত্রিকার ফাইলের ওপর শুয়ে থাকলেন। কিন্তু সেই রাতে আনন্দে ঘুম এলো না মোনাজাত উদ্দিনের দু'চোখে।

সকালে সন্তোষ গুপ্ত বাসা থেকে ফোন করে জানালেন, 'সংবাদ' সম্পাদক আহমেদুল কবীর তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন। কবির সাহেব এলেন। মোনাজাত উদ্দিনকে ডেকে নিলেন কামরায়। বললেন, 'তোমার কাজে আমি খুব খুশি হয়েছি। কি চাও তুমি?' এই কথা শুনে, হাঁটু-বুক-গলা তিনই কেঁপে উঠলো মোনাজাত উদ্দিনের। মিনমিনে গলায় বললেন, 'একটা চাকরি।' শেষ পর্যন্ত মোনাজাত উদ্দিন নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পেরেছিলেন 'সংবাদ' তথা সারা বাংলাদেশের সংবাদ জগতের কাছে। যোগ্যতা দিয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের কাঙ্গাল হরিনাথের পর প্রথম সার্থক 'চারণ সাংবাদিক'।

১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফুলছড়ি থানাধীন যমুনা নদীতে কালাসোনার ড্রেজিং পয়েন্টে দু’টি নৌকাডুবির তথ্যানুসন্ধান করতেই অসুস্থ শরীর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন গাইবান্ধায়। যাবার পথে ‘শেরেবাংলা’ নামক ফেরিতেই তিনি দুর্ঘটনার মুখে পতিত হন। ফেরির ছাদ থেকে হঠাৎ করেই পানিতে পড়ে মারা যান। মোনাজাত উদ্দিনের মৃত্যু বার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা...। 

মন্তব্য