kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

বাংলাদেশে জেটিআইয়ের প্রবেশ, গুরুত্ব পাচ্ছে না জনস্বাস্থ্য

মাহামুদ সেতু   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২২:৫৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশে জেটিআইয়ের প্রবেশ, গুরুত্ব পাচ্ছে না জনস্বাস্থ্য

ছবি প্রতীকী

জনস্বাস্থ্যের জন্য তামাক কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ তা সবারই জানা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অশিক্ষিত একজন শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষই তামাকের ভয়াবহতার বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান রাখেন।

কিন্তু তার পরেও দেশে তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণন কমছে না। বরং শঙ্কার বিষয় হলো, এই খাতে আরো বড় আকারের বিনিয়োগ হচ্ছে, যা দেশের আনাচে কানচে তামাকের বিষ ছড়িয়ে দেবে।

চলতি বছরের আগস্ট থেকেই বিশ্ব বাজারে তামাকের একটি সংবাদ আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামাক উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (জেটিআই) বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের অন্যতম শিল্পগ্রুপ আকিজের তামাক ব্যবসা কিনে নিয়েছে।

এজন্য প্রতিষ্ঠান দু’টির মধ্যে ১২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার চুক্তি হয়। গত ৩০ নভেম্বর ‘প্রথম আলো’র একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জেটিআই আকিজের সম্পূর্ণ পাওনা অর্থাৎ ১২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। যদিও আকিজ গ্রুপ এই সংবাদের প্রতিবাদ জানায় এবং ২ ডিসেম্বর ‘প্রথম আলো’ অপর এক সংবাদ থেকে জানা যায়, জেটিআই আকিজের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করেনি; বরং পুরো অর্থ পরিশোধে ছয় বছর সময় লেগে যাবে।
 
আকিজ ও জেটিআইয়ের দেনাপাওনা এখানে আলোচনার মূখ্য বিষয় নয়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, দেশজুড়ে তামাক বিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের পরেও জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা না করে আকিজ গ্রুপ দেশের মাটিতে বিদেশি বেনিয়াদের বিষ বিপণনে সহযোগীর ভূমিকা পালন করছে।

অন্যদিকে এর বিরুদ্ধে সরকারের কোনো ব্যবস্থা না নেয়াটাও হতাশাজনক। কারণ, বাংলাদেশ ডব্লিউএইচও’র বৈশ্বিক তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল-এফসিটিসি স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ। তাছাড়া ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে দেশে তামাক বাণিজ্যের এতো বড়ো একটি পট পরিবর্তনে সরকারের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ জরুরি ছিল।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, জেটিআই ও আকিজের ব্যবসা হস্তান্তরের সুযোগে সরকার স্ট্যাম্প শুল্ক হিসেবে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা আয় করছে। জেটিআই তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমনটাই জানিয়েছে। আর এই অর্থযোগ থাকাতেই হয়তো প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব হারিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে।

যার ফলে, বিদেশি বিনিয়োগের উছিলায় বিষ বিপণনকে নীরবে সম্মতি দিচ্ছে তারা। খোদ জেটিআইয়ের ৬ আগস্ট ২০১৮-এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, আকিজের তামাক ব্যবসা কেনার ফলে তাদের দীর্ঘ মেয়াদে মুনাফা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখবে।

কারণ হিসেবে তারা বলছে, বাংলাদেশ বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম সিগারেটের বাজার এবং প্রতি বছর সেটা ২ শতাংশ হারে বাড়ছে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরিচালিত সমীক্ষা গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) ২০১৭ অনুসারে বাংলাদেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা কমছে। ২০০৯ সালে দেশে মোট প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ২৩ শতাংশ ধূমপান করতো; ২০১৭ সালে তা ১৮ শতাংশে নেমে এসেছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে, জেটিআই ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ার যে তথ্য দিচ্ছে তা নিঃসন্দেহে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে। এই মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হয়ে তরুণ জনগোষ্ঠী ধূমপানে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এবার জেটিআইয়ের অর্থ পরিশোধের সংবাদটির আলোচনায় আসা যাক। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম আকিজের তামাক ব্যবসা অধিগ্রহণে জেটিআইয়ের অর্থ পরিশোধের বিষয়ে ৩০ নভেম্বর ২০১৮ সংবাদ প্রকাশ করেছে। সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ২৯ নভেম্বর জেটিআইয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কথা।

জেটিআইয়ের বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘প্রথম আলো’র সংবাদে বলা হয়েছে, জেটিআই এদেশে জাপানি মান ও উদ্ভাবন নিয়ে বাজারে আসবে। ‘সমকাল’-এও প্রায় একই ধরনের বক্তব্য এসেছে। এই সংবাদগুলো দেখে মনে হয়, মান উন্নয়নের ফলে সেই তামাকজাত পণ্যগুলো সেবনকারীদের বেশি ক্ষতি করবে না। অর্থাৎ, ওই একটি বাক্য জেটিআইয়ের পণ্যকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ‘বিষ’ যতো উন্নতই হোক, তা ধ্বংসই ডেকে আনবে। সেই দিক বিবেচনায়, ‘জাপানি মানের’ সিগারেট যে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাবে না, সে কথাটি প্রতিবেদনে আসেনি।

একই প্রতিবেদনে জেটিআইয়ের কর্মীবান্ধব পরিবেশের কথা বিজ্ঞপ্তির বরাতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উচ্চ বেকারত্বের দেশে, এই সুযোগ-সুবিধার কথা শুনে তরুণ-যুবকরা নিঃসন্দেহে প্রভাবিত হবে। কিন্তু তামাক কারখানায় কাজ করা ও তামাক উৎপাদনে জড়িত কৃষকরা যে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন সেটা সংবাদে বলা হয়নি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার কথাও উল্লেখ করা যায়। এফসিটিসির অনুচ্ছেদ ১৭-তে তামাক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিপণন পর্যন্ত জড়িত কর্মীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তামাক শিল্পের পরিবর্তে অন্য কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকার এই আর্টিকেল বাস্তবায়নে এখনো কোনো নীতিমালা গ্রহণ করেনি।

এখানে, ১৯৯৯ সালে জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ সরকারের একটি রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রুলের কথা স্মরণীয়। সেই রুলে হাইকোর্ট সরকারকে কয়েকটি নির্দেশনা প্রদান করে। যার মধ্যে ছিল: তামাক শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি, নতুন করে কোনো তামাক শিল্প স্থাপনের অনুমতি না দেয়া এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তামাকজাত পণ্য উৎপাদন ছেড়ে বিকল্প খাতে বিনিয়োগে বাধ্য করা; গণমাধ্যমে তামাক পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা; গণপরিবহন ও পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করা। কিন্তু শেষের দুইটি নির্দেশনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিলেও শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও অন্য খাতে বিনিয়োগে বাধ্য করতে সরকার কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি।

এই সুযোগে জেটিআই বেকার তরুণ-যুবকদের প্রলুব্ধ করতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কর্মীদের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির চটকদার কথার ফাঁদ থেকে বের হতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবেই কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এমন ভাষা ব্যবহার করবে, যেটা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করে। একজন দক্ষ সাংবাদিক সেখান থেকে ছেঁকে শুধু সংবাদটুকুই নেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হলে সফল হয় বিজ্ঞপ্তি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান। এই সফলতা পেয়েছে জেটিআই। ‘সমকাল’-এর সংবাদে জেটিআইয়ের পণ্যগুলোকে ‘বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড’ নামে পরিচিত করিয়ে দেয়া হয়েছে। যা স্পষ্টতই তামাক পণ্যের পরোক্ষ বিজ্ঞাপন।

এফসিটিসির অনুচ্ছেদ ১৩ অনুসারে কোনো গণমাধ্যমে তামাক কোম্পানির বিজ্ঞাপন ও বিপণন সহায়ক কোনো তথ্য প্রচার এবং স্পন্সর গ্রহণ নিষেধ। কিন্তু প্রকাশিত সংবাদগুলোতে এটা মানা হয়নি। যদিও আইনিভাবে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মী বা সেই প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যাবে না। কারণ এখানে সরাসরি কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়নি। তবে, নৈতিক বিবেচনায় অবশ্যই সাংবাদিক ও প্রতিষ্ঠানগুলো দায় এড়াতে পারে না। জনস্বাস্থ্যের দিকটি বিবেচনা করে তামাক কোম্পানি নিয়ে সংবাদ প্রচারে তাদের আরো সচেতন থাকা দরকার।

লেখক : মাহামুদ সেতু। মিডিয়া ম্যানেজার, অ্যান্টি-টোব্যাকো প্রোগ্রাম, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ।

(এই বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)

 

মন্তব্য