kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

আমাদের অরিত্রি এবং যুক্তরাজ্যের বেন

এহছান লেনিন   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২২:৫২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমাদের অরিত্রি এবং যুক্তরাজ্যের বেন

প্রতিদিনই আমরা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিই! এই তো কিছুদিন হলো, রাগে-দুঃখে, অভিমানে আত্মহত্যা করে বসলো ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রি। তাতে কার কী আসে যায়! কত শত অরিত্রি প্রতিদিন নিরবে চোখের জল ফেলে, জীবিত থেকেও মরে যায়, তার হিসেব আমরা ক'জনইবা রাখি?

আমার খুব সহজ প্রশ্ন, অরিত্রি যদি বেঁচে থাকতো, স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি তাকে শেষ পর্যন্ত টিসি না দিত, কিংবা সে যদি স্বাভাবিকভাবে স্কুলে যাওয়া-আসাও শুরু করে দিত, তাহলে বিষয়টাকে কীভাবে দেখতাম আমরা?

আমি যতবার কল্পনা করেছি সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া একটা মেয়ে প্রচণ্ড অভিমান নিয়ে, ক্ষোভ নিয়ে, অপমানে মাথা নিচু করে স্বাভাবিক হওয়ার ভনিতা করছে, সমাজের চোখে অপরাধী হয়ে বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, ততবারই মনের ভেতর কেমন কেমন একটা অস্বস্তি নাড়া দিয়ে গেছে। একটা মানুষ যখন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে শেখে, একটা মন যখন পরিপক্কতার স্পর্শ পেতে শুরু করে, ঠিক তখন তাকে বলে দেওয়া হলো, 'মাইয়া, তুমি অপরাধী, তোমার অপরাধের একমাত্র শাস্তি 'ফাঁসি', তবে বিশেষ বিবেচনায় 'যাবজ্জীবন' দেওয়া হলো।'

আমার কেন যেন মনে হয়েছে, এই 'যাবজ্জীবন' থেকে মুক্তি পেতেই, এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পেতে, এই অন্তর্জ্বালা থেকে বাঁচার পথটাই বেছে নিয়েছিল মেয়েটা! মরণে যে মেয়ে ভয় পায় না, সে মেয়ে বেঁচে থাকলে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার মতো যোগ্যতা রাখে বলেই আমার বিশ্বাস।

অথচ বাচ্চারা বড় হতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় প্রতিযোগিতা নামক একটা নেশা। কী অভিভাবক, কী শিক্ষক, কী সমাজ, কেউ কি এই নেশা ধরিয়ে দেওয়ার অপরাধ অস্বীকার করতে পারবেন? মা-বাবারা সব সময় চান তার সন্তান ক্লাসে সেরা হোক। সাঁতার না জানলেও তাকে সাঁতারু হতে হবে, উড়তে না পারলেও তাকে উড়তে হবে! আহারে, কী নির্মম অত্যাচার!

কিছুদিন আগের যুক্তরাজ্যের সেইন্ট হেলেন্সের একটা ঘটনার কথা বলি। বেন নামে এক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। স্কুল কর্তৃপক্ষ মহা চিন্তায় পড়ে গেল কীভাবে ১১ বছরের ওই শিশুকে বলবেন যে, সে তার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। শেষাবধি স্কুল শিক্ষক ক্লার্কসন একটা চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিলেন বেনদের বাসার ঠিকানায়।

প্রিয় বেন,
আমি তোমাকে আজ লিখছি অভিনন্দন জানানোর জন্য। তোমাকে অভিনন্দন তোমার আচার ব্যবহার এবং সেই সঙ্গে স্যাট টেস্টের মূল ধাপে পৌঁছানোর জন্য।

এবছর তোমার বন্ধু গিল, লিন, অ্যাঞ্জেলা, স্টেফ ও আন্নের সঙ্গে তুমি বেশ ভালো কাজ করেছো এবং তুমি বেশ বিস্ময়কর অগ্রগতিও দেখিয়েছ।

তোমার ফল জানানোর জন্যই আজ এই চিঠিটা তোমার বাবা-মাকে আমি লিখছি। আমি স্পষ্টভাবে একটা কথা তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। এই ফলাফল তোমাকে ও তোমার যোগ্যতার কাছে খুবই সামান্য। এগুলো জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এবং সে ক্ষেত্রে তুমি বেশ ভালো করেছো।

তবে বেন, দক্ষতা ও জ্ঞান পরিমাপে ল্যানসবিউরি ব্রিজ কর্তৃপক্ষের মাপকাঠিটা খানিকটা ভিন্ন। তোমার মধ্যে অন্যান্য যেসব অভূতপূর্ব গুণাবলী রয়েছে সেগুলো এই ফল নির্ধারণের সময় পরিমাপ করা হয়নি। তোমার শৈল্পিক যোগ্যতা, দলভুক্ত হয়ে কাজ করার সক্ষমতা, তোমার স্বাধীনচেতা মন, তোমার নরম হৃদয়, নিজ অভিমত প্রকাশ করার ক্ষমতা, খেলাধূলায় পারদর্শিতা, আলোচনার মাধ্যমে তোমার নিজের অগ্রগতি পরিমাপ করার মতো জ্ঞান, তোমার নকশা তৈরির দক্ষতা, এবং সঙ্গীতে তোমার তুখোড় পারদর্শিতা এই ফল নির্ধারণের সময় পরিমাপ করা হয়নি।

আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলছি, এইসব গুণাবলী এবং যোগ্যতা তোমাকে একটি বিশেষ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষে পরিণত করেছে। এসব দেখে আমরা নিশ্চিত, তুমি প্রতিনিয়ত ভালো করছো।

তোমাকে অভিনন্দন, আমরা তোমার জন্য গর্বিত।

শুভেচ্ছান্তে,
মিসেস ক্লার্কসন

অনেক কথাই তো হলো। শুধু বলা হলো না, আর কতজন অরিত্রি মরলে পরে তবে আমাদের অভিভাবকরা, আমাদের শিক্ষকরা, আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী বদলাবে! কতদিন যাবে, মাছকে গাছে ওঠার জন্য তাড়া না দেওয়ার অনুশীলন শুরু হতে, কিংবা বানরকে পানিতে সাঁতরানো না শিখিয়ে গাছে চড়ার কসরত শুরু হতে। জানি না আর কতদিন অপেক্ষায় থাকতে হবে মিসেস ক্লার্কসনের মতো শিক্ষক প্রতিটি স্কুলে তৈরি হতে। সেদিনই আমাদের মুক্তি।

তবে আমি আশাবাদী; আশায় পথ চেয়ে রই হাজারো নয়, লাখো নয়, কোটি কোটি অরিত্রির এভারেস্ট জয়ের উদযাপনে অংশ নেওয়ার।

লেখক: এহছান লেনিন, ফিনল্যান্ড প্রবাসী সাংবাদিক

[লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে সংকলিত]

মন্তব্য