kalerkantho


ঈদ উৎসবে চাঙ্গা অর্থনীতি, প্রয়োজন টেকসই ব্যবস্থাপনা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৮ আগস্ট, ২০১৮ ১২:৩৩



ঈদ উৎসবে চাঙ্গা অর্থনীতি, প্রয়োজন টেকসই ব্যবস্থাপনা

প্রতীকী ছবি

প্রবাদ আছে' বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি'। আর এই উৎসবে চলে অর্থ ব্যয়ের মহোৎসব। এতে করে ঈদসহ প্রতিটি উৎসব পার্বনে অর্থনীতি নতুন করে গতি পায়। কাজেই উৎসব কেবল আনন্দ আর বিনোদনের মধ্যেই সীমিত থাকে না। আসছে কোরবানির ঈদ। কেবল পশু কেনাই মূল নয়, সেমাই-চিনি, নয়া কাপড়, আঁতর গোলাপ কেনা থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশে ভ্রমণও চলতে থাকে। মূলত এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বিপুল বিশাল অর্থ লেনদেন হয়। এ কারণে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদে অর্থনীতি চাঙ্গা হয় বেশি মাত্রায়। 

শহরের অনেকই নাড়ির টানে ইতিমধ্যে বাড়ি ফিরছেন। আর শহরে যারা আছেন তারাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যারা বাড়ি যাচ্ছেন না, তারাও গ্রামে টাকা পাঠাচ্ছেন ঈদের জন্য। প্রবাসে বসবাসরতরা দেশে প্রিয়জনের জন্য অর্থ পাঠাচ্ছেন। ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের শহর-গ্রামে অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে। নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূল থাকায় এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো থাকায় অন্য যেকোনো বছরের  তুলনায় এই ঈদে অর্থনীতি চাঙ্গা থাকবে বেশি হারে। 

পাশাপাশি ৩/৪ মাস পরে জাতীয় নির্বাচনের তিন মাস আগে কোরবানির ঈদ। ভোটের মাঠ দখলে রাখতে রাজনীতিবিদরা বেশি বেশি করোবানি দেবেন এবার। কোরবানির মূল আকর্ষণ ১ কোটি ৪০ লাখ পশু বিক্রির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। আর সীমান্তে কড়াকড়ির মধ্যেও ভারত ও মিয়ানমার থেকে পশু আসতে শুরু করেছে। কোরবানির পশু জবাই, মাংস কাটাকুটি, চামড়া বিক্রি, পশুর হাড়-গোড় বিক্রিতে জড়িত হয় বহু মানুষ। ঈদের পুরো সপ্তাহ জুড়েই চলে এই কর্মকাণ্ড।  

এ ছাড়া চামড়া, মসলা, দা-বঁটি, পরিবহন, পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। বাড়ছে টাকার প্রবাহও। প্রবাসে বসবাসরত কর্মীদের প্রেরিত রেমিটেন্স  দেশে আসছে ব্যাপক হারে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই ইতিমধ্যে বোনাস পেয়েছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা কোরবানির গরু কিনতে এলাকায় টাকা পাঠাচ্ছেন। পাশাপাশি নেতাকর্মীদের কাছেও পাঠাচ্ছেন টাকা। এভাএ দুই ঈদেই বাজারে টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। শহর থেকে গ্রামমুখী হয় টাকা। অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক দিক হল, বণ্টন ব্যবস্থায় একটি পরিবর্তন হয়। এতে অধিকাংশ মানুষের কাছেই টাকা পৌঁছে যায়। 

চন্দ্র মাস হিসেবে আগামি ২২ আগস্ট দেশে কোরবানির ঈদ উদযাপিত হবে। এ হিসাবে কোরবানির বাকি মাত্র ৪ দিন। এ ঈদে পশু জবাইকে কেন্দ্র করেই উৎযাপিত হয় মূল উৎসব। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে দেশে গবাদি পশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। এর মধ্যে গরু ও মহিষ ২ কোটি ৩৫ লাখ। ছাগল ও ভেড়া ২ কোটি ৫৫ লাখ।

মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এ বছর কোরবানির উপযোগী ১ কোটি ৪০ লাখ পশু রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ লাখ ৫০ হাজার গরু ও মহিষ এবং ৬৯ লাখ ৫০ হাজার ছাগল ও ভেড়া। গত বছর কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ পশু। অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, কোনো কারণে ভারত থেকে গরু আমদানি না হলেও এ বছর পশুর সংকট হবে না। বিগত সময়ের হিসেবে প্রতিবছর গড়ে ২০ লাখ গরু ভারত থেকে বাংলাদেশে আসে। সরকারি হিসাবে ২০১৩ সালে ভারত থেকে গরু আসে ২৩ লাখ ৭৪ হাজার। ২০১৪ সালে এসেছে ২০ লাখ ৩২ হাজার। ২০১৫ সালে ২২ লাখ। তবে সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে এবার আসার পরিমাণ কিছুটা কমবে।

অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার আরো বড় কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে গরুর মাংস রপ্তানি বেড়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ভারতের মাংস রপ্তানি ৩ দশমিক ৪২ গুন বেড়েছে। ২০০৯ সালে দেশটি দশমিক ৬০৯ মিলিয়ন টন মাংস রপ্তানি করে। ২০১৪ সালে তা বেড়ে ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়। মাংস উৎপাদনে ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে দিয়েছে ভারত।

পশুর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতেও চামড়ার ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতিবছর দেশে দেড় কোটিরও বেশি পশুর চামড়া পাওয়া যায়। এর বড় অংশই আসে কোরবানির পশু থেকে। চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ খাতের মূল বাজার ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বাজারসহ এ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়।
 
দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৫ লাখ মেট্রিক টন। রসুনের চাহিদা ৬ লাখ মেট্রিক টন, আদা ৪ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। গরম মসলা বিশেষ করে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতারও উল্লেখযোগ্য অংশ কোরবানিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১৪-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন এলাচ, ৭ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন দারুচিনি, ১৭০ মেট্রিক টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ মেট্রিক টন জিরা আমদানি হয়। কোরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের। 

কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো কামার আইটেম। ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা ছাড়া কোরবানিই সম্ভব নয়। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানিতে পণ্যটির বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। ঈদ আসার ৩-৪ মাস আগে থেকে তারা সাধ্যমতো বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেন। ঈদের আগে তাদের এতই ব্যস্ত থাকতে হয় যে, কথা বলার সময় থাকে না।

ঈদকে সামনে রেখে গত বছর প্রবাসীরা রেমিটেন্স পাঠিয়েছিল ১৩১ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮৪ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ১১ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, এ বছর রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। এ উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।

এই বিশাল বিপুল অর্থ লেন দেনের বাইরে বেশ কয়েকটি খাতের কর্মকাণ্ড অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস বাবদ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বোনাস ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ অর্থ ঈদ অর্থনীতিতে বাড়তি যোগ হচ্ছে।

ঈদকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ঘটায় শহর-বন্দর ও গাঁও-গেরামে। এক কথায় দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম অব্দি অর্থনীতির গতি সঞ্চার এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সিপিডির এক গবেষণায়, ঈদের অর্থনীতির আকার যাই হোক না কেন, দেশের ভেতরে এর মূল্য সংযোজন কতটুকু সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক পণ্যই এ উপলক্ষে আমদানি হয়ে আসে। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের চাহিদাতেও বৈচিত্র্য আসে। নিম্ম, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ সরাসরি অর্তনৈতিকভাবে বেশি উপকৃত হয়। তবে প্রত্যাশা, দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যাতে বছরের প্রতিটি দিন তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে, স্বাচ্ছন্দে বাসবাস করতে পারে সেই ব্যবস্থা করা গেলেই তা অর্থনীতির জন্য হবে টেকসই ব্যবস্থা।

লেখক: মোতাহার হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট  

(এ বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)



মন্তব্য