kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ইসলামে বিনোদন ও খেলাধুলার সীমারেখা

মুফতি পিয়ার মাহমুদ   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৯:৪৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ইসলামে বিনোদন ও খেলাধুলার সীমারেখা

ইসলাম ফিতরাতের ধর্ম। তাই মানুষের ফিতরাত তথা স্বভাবজাত চাহিদাকে ইসলাম স্বীকার করেছে অকপটে। তবে সেই স্বভাবজাত চাহিদার পাগলা ঘোড়াকে লাগামহীন ছেড়ে দেয়নি; বরং এর লাগাম টেনে ধরে দিয়েছে সীমারেখা। নির্দিষ্ট করে দিয়েছে তার চৌহদ্দি।

বিজ্ঞাপন

সাহাবি সালমা ইবনে আকওয়া (রা.) বলেন, একজন আনসারি সাহাবি দৌড়ে খুবই পারদর্শী ছিলেন। দৌড় প্রতিযোগিতায় কেউ তাকে হারাতে পারত না। একদা তিনি ঘোষণা করলেন, আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে কেউ প্রস্তুত আছে কি? আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে এ ব্যাপারে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। এ প্রতিযোগিতায় আমি জয়ী হলাম। (সহিহ মুসলিম সূত্রে মাআরিফুল কোরআন : ৭/৮)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আমি এটা পছন্দ করি না যে তোমাদের ধর্মে শুষ্কতা ও কঠোরতা পরিলক্ষিত হোক। (মাআরিফুল কোরআন : ৭/৮)

বর্ণিত হাদিসগুলোর আলোকে এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে খেলাধুলা ও বিনোদন শুধু জায়েজই নয়; ক্ষেত্রবিশেষে তা প্রশংসিত ও পছন্দনীয়। তবে এর সীমারেখা ও চৌহদ্দি অতিক্রম করা যাবে না এবং এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা যাবে না। কারণ প্রত্যেক বিষয়েরই একটি সীমারেখা আছে। যা লঙ্ঘিত হলে সাধারণ মুবাহ ও বৈধ কাজ তো অনেক পরের কথা; নেক আমল ও মুস্তাহাব কাজও জায়েজ থাকে না; বরং তা হয়ে যায় আপত্তি ও প্রতিবাদের উপযুক্ত। হাল জামানায় এই খেলাধুলা ও বিনোদনের অবস্থা এই যে এখন তা আর শুধু খেলাধুলা ও বিনোদন নয়; বরং তা জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। নিম্নে এর ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোকপাত করব, ইনশাআল্লাহ।

খেলা যেন আল্লাহ ও পরকালবিমুখ না করে

যখন বিশেষ কোনো খেলা বিশেষত ফুটবল বা ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়োজন করা হয়, তখন গোটা জাতি ও দেশ এর উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে আল্লাহ-রাসুল, নামাজ-রোজা, ইবাদত-বন্দেগি ও পরকালকে বেমালুম ভুলে যায়। হয়ে উঠে আল্লাহ ও পরকালবিমুখ। অথচ খেলাধুলা ও বিনোদনে এভাবে মত্ত হওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এ ব্যাপারে আছে বিশেষ সতর্কবাণী ও কঠিন শাস্তির ঘোষণা। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘এক শ্রেণির মানুষ এমন আছে, যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে ‘লাহওয়াল হাদিস’ তথা অবান্তর কথাবার্তা ক্রয় করে অন্ধভাবে এবং তা নিয়ে করে ঠাট্টা-বিদ্রুপ। এদের জন্য আছে অবমাননাকর শাস্তি। ’ (সুরা লুকমান, আয়াত : ৬)

বেশির ভাগ সাহাবি, তাবেঈন ও তাফসিরবিদরা এর তাফসির করতে গিয়ে বলেছেন, খেলাধুলা, গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্র, অনর্থক গল্পসহ যেসব বিষয় মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে গাফিল করে দেয়, সে সবই ‘লাহওয়াল হাদিস’-এর অন্তর্ভুক্ত। (মাআরিফুল কোরআন : ৭/৪)

সময়ের অপচয় নিষিদ্ধ

সময় মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শুধু ইসলামই নয়, পৃথিবীর সব ধর্ম, মতবাদ ও ইজমই সময়ের গুরুত্ব দিয়েছে যারপরনাই এবং উপদেশ দিয়েছে সময়কে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর। সময়ের গুরুত্ব প্রসঙ্গে দয়ার নবী (সা.) বলেন, ‘দুটি নিআমত এমন আছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ প্রতারণার শিকার। একটি হলো সুস্থতা, অন্যটি অবসর। ’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২; তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৪)

অর্থের অপচয় নিষিদ্ধ

বিশ্বকাপ উপলক্ষে কী পরিমাণ অর্থের অপচয় হয় তার কিঞ্চিৎ ধারণা নেওয়া যাবে নিচের রিপোর্টগুলো থেকে। ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কী পরিমাণ অর্থের অপচয় করেছে তার কিছুটা অনুমান করা যায় নিচের রিপোর্ট থেকে। সেখানে আছে, এ আয়োজনে ৩৫০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। (কালের কণ্ঠ, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১১)

আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশের যদি এ পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়ে থাকে, তাহলে সমগ্র বিশ্বের কী পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়েছে তা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। অথচ অপচয়ের ব্যাপারে এসেছে কঠোর সতর্কবাণী। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, কখনো অপচয় করবেন না। নিশ্চয় অপচয়কারী শয়তানের ভাই (দোসর)। (সুরা ইসরা, আয়াত : ২৭)

রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা খাবে, পান করবে, পরিধান করবে এবং সদকা করবে, তবে অপচয় ও অহংকার করবে না। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ইচ্ছামতো খাবে, ইচ্ছামতো পরবে। তবে দুটি কাজ থেকে অবশ্যই বেচে থাকবে—১. অপচয় ও ২. অহংকার। (বুখারি : ২/৮৬০)

খেলাধুলা উপলক্ষে নৈতিক স্খলন

বিশ্বমানের খেলা উপলক্ষে পতিতাবৃত্তি সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। যে দেশ এ খেলার আয়োজন করে সে দেশে অসংখ্য পতিতা ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৬ সালের আসরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পরাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইসের আদম পাচারবিষয়ক উপদেষ্টা জন মিলার বলেছিলেন, বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। নারী পাচারের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি। বিশ্বকাপের সময় যৌনকর্মের জন্য হাজার হাজার নারী পাচার হচ্ছে। (দৈনিক ইত্তিফাক : ৭ জুন, ২০০৬)

২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ ব্রাজিল সরকার ঘোষণা করেছিল, এই আসরে পতিতাবৃত্তি ও যৌনকর্মের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি ডলার আয় করবে। (দৈনিক ইনকিলাব, ৬ জুন ২০১৪) 

এই পতিতাবৃত্তি ও অবৈধ যৌনকর্ম এক ভয়াবহ অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পতিতাবৃত্তি ও ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই ব্যভিচার অশ্লীল ও নিকৃষ্টতম কাজ এবং যৌন সম্ভোগের কদর্য পথ। ’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ৩২)

সাহাবি আনাস (রা.) বলেন, আমি নবীজি (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কিয়ামত হবে না অথবা তিনি বলেছেন, কিয়ামতের আলামতগুলো হলো, ১. ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে। ২. মূর্খতা ও অজ্ঞতা বৃদ্ধি পাবে। ৩. মাদকদ্রব্য সেবন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাবে। ৪. ব্যভিচার ও পতিতাবৃত্তি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। (বুখারি, হাদিস : ৬৮০৮)

জুয়া খেলা

বিশ্বকাপ উপলক্ষে জুয়ার মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। আগে একটি ম্যাচে ম্যাচের আগে একবারই বাজি ধরার সুযোগ থাকত। এখন ঘরে বসে টেলিভিশনে খেলা দেখে দেখে বাজি ধরা হয় অসংখ্যবার। ২০০৬ সালে শুধু ইংল্যান্ডেই বাজির লেনদেন ছিল ৭০০ কোটি পাউন্ড। (ইত্তিফাক : ১ জুন ২০০৬)

যদি একটি দেশের পরিসংখ্যানকৃত লেনদেনের পরিমাণ এত হয়, তাহলে সে দেশের যে লেনদেনগুলো পরিসংখ্যানে আসেনি সেগুলো এবং বিশ্বের অন্য দেশগুলোর বাজির লেনদেনের পরিমাণ একসঙ্গে যোগ করা হলে এর সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? অথচ এই জুয়া ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ও নাজায়েজ। এ সম্পর্কে কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, পূজার বেদি ও ভগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু ও শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো। এতে তোমরা (ইহকাল ও পরকালে) সফল হবে। নিশ্চয়ই শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজে বাধা দিতে। অতএব তোমরা কি এ কাজগুলো পরিহার করবে?’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৯০-৯১)

এ ছাড়া জুয়ার দুনিয়াবি ক্ষতিও মারাত্মক। খেলায় বাজি ধরে সর্বস্বান্ত হয়েছে এমন লোকের সংখ্যা সমাজে নেহাত কম নয়। এ নিয়ে পারিবারিক কলহে অনেক সংসার ও পরিবারও হুমকির মুখে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সব ধরনের অবৈধ খেলাধুলা ও বিনোদন থেকে হেফাজত করুন। আমিন



সাতদিনের সেরা