kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

সায়িদ বিন আল মুসায়্যিব (রহ.)

বিখ্যাত তাবেয়ি যেভাবে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন

আল্লামা ইবনে খাল্লিকান (রহ.)   

২৪ নভেম্বর, ২০২১ ১২:১৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিখ্যাত তাবেয়ি যেভাবে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন

সায়িদ বিন আল মুসায়্যিব (রহ.)-কে বলা হয় তাবেয়িদের সর্দার। তিনি সরাসরি সাহাবাদের কাছ থেকে হাদিস, তাফসির, ফিকাহসহ বিভিন্ন শাখার জ্ঞান আহরণ করেন। ইসলামের প্রথম ধারকদের থেকে ইলম আহরণ করায় উম্মাহর উত্তম আদর্শ ছিলেন তিনি। তাকওয়া, ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতাসহ একজন আলেমের সব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।

মদিনায় জন্ম : সায়িদ ১৫ হিজরিতে ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে মদিনায় কুরাইশ বংশের মাখজুম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। বিখ্যাত সাহাবি সাআদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.) ও আবু হুরাইরা (রা.)-সহ অনেকের কাছ থেকে তিনি হাদিস বর্ণনা করেছেন। বড় বড় সাহাবি ও রাসুল (সা.)-এর স্ত্রী আয়েশা (রা.)-থেকেও হাদিস শুনেছেন। মদিনার বিখ্যাত সাতজন ফকিহর অন্যতম ছিলেন তিনি। যেকোনো বিষয়ে তার মতামত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হতো। 

ওমর (রা.)-এর বিচারকার্য সম্পর্কে অভিজ্ঞ : আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) এক ব্যক্তিকে বললেন, তুমি অমুককে (সায়িদ) এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করো। অতঃপর আমাকে এসে তা জানাবে। সেই লোক নির্দেশ পালন করে। আবদুল্লাহ (রা.) নিজ সঙ্গীদের বললেন, এই ব্যক্তি (সায়িদ) বড় আলেম। রাসুল (সা.) তাকে দেখলে অনেক খুশি হতেন। তিনি অনেক সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছেন। তাদের থেকে হাদিস শুনেছেন। রাসুল (সা.)-এর স্ত্রীদের কাছে গিয়ে ইলম অর্জন করেছেন। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি তার (আবু হুরাইরা) এক মেয়ের জামাতা ছিলেন। ইমাম জুহরি (রহ.) ও মাকহুল (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, সবচেয়ে বড় ফকিহ কে ছিলেন, আপনারা যাদের সান্নিধ্য পেয়েছেন? তারা বলেছিলেন, সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)। 

৪০ বছর জামাতে নামাজ : সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলেছেন, ‘আমি এ পর্যন্ত ৪০ বার হজ করেছি। গত ৫০ বছরে আমার কখনো নামাজের তাকবিরে উলা ছুটে যায়নি। মসজিদের প্রথম কাতারে যত্নবান হওয়ায় ৫০ বছরের নামাজে আমি কোনো ব্যক্তির পায়ের দিক দেখিনি। ৩০ বছর যাবৎ মুয়াজ্জিন যখন আজান দিতেন, তখন আমি মসজিদে থাকতাম। কথিত আছে, তিনি এশার নামাজের অজু দিয়ে ফজরের নামাজ পড়তেন। 

স্বনির্ভর আলেম : তাঁকে প্রায় ৩০ হাজার পরিমাণ উপহারের অর্থ গ্রহণের আহ্বান জানানো হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার এগুলোর দরকার নেই। বনু মারওয়ানকেও দরকার নেই। আল্লাহর কাছে তাদের ও আমার ফয়সালা হবে।’ তার একটি উক্তি ছিল, আল্লাহর আনুগত্য বান্দাকে সম্মানিত করে এবং আল্লাহর অবাধ্যতা বান্দাকে লাঞ্ছিত করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের বিজয়ের জন্য এটুকু যথেষ্ট, সে শত্রুকে আল্লাহর অবাধ্যতায় নিমগ্ন দেখবে।’ শরিয়ত সমর্থিত উপায়ে সবাইকে উপার্জনে উদ্বুদ্ধ করে তিনি বলতেন, ‘ওই ব্যক্তির মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, যে সম্পদ উপার্জন করে অন্যের হক আদায় করে না ও মানুষ থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রাখে না।’ 

ফিরিয়ে দেন খলিফার প্রস্তাব : তৎকালীন খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান নিজ ছেলে ওয়ালিদের সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) তাঁর সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। বরং তাঁর অভাবী সুযোগ্য ছাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেন। খলিফা আবদুল মালিক নানাভাবে চেষ্টা করেন। তাঁর ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করেন। তীব্র শীতের সময় তাঁকে বেদম প্রহার করা হয়। পানি ঢালা হয়।

শিক্ষার্থীর সঙ্গে মেয়ের অনাড়ম্বর বিয়ে : ইবনে আবি ওয়াদায়াহ (রহ.) বর্ণনা করেন, আমি নিয়মিত সায়িদ বিন মুসায়্যিব (রহ.)-এর মজলিসে বসতাম। কয়েক দিন তাঁর দরসে আমি অনুপস্থিত থাকি। এরপর এলে তিনি বললেন, কোথায় ছিলে? আমি বললাম, আমার স্ত্রী মারা গেছেন। তাই ব্যস্ত ছিলাম। তিনি বললেন, আমাদের জানাতে। তাহলে জানাজায় আমরাও উপস্থিত হতাম। উঠে যাওয়ার সময় তিনি বললেন, আর কাউকে বিয়ে করেছ? আমি বললাম, আল্লাহ আপনাকে রহম করুন, আমাকে কে মেয়ে বিয়ে দেবে? আমার কাছে তো দুই-তিন দিরহাম ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি বললেন, আমি দিলে তুমি কি করবে? আমি বললাম, অবশ্যই করব। অতঃপর তিনি হামদ ও দরুদ পাঠ করে দুই বা তিন দিরহামের বিনিময়ে বিয়ে দিলেন। এদিকে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমি বাড়ি ফিরে যাই। কার কাছ থেকে ঋণ করা যায় তা নিয়ে ভাবতে থাকি। মাগরিবের নামাজ পড়ি। আমি রোজাদার ছিলাম। রুটি ও তেল দিয়ে ইফতার করি। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ে। কে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর আসে, সায়িদ। এদিকে আমি সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব ছাড়া পরিচিত সায়িদ নামের সব ব্যক্তির কথা ভাবলাম। কেননা গত ৪০ বছরে বাড়ি ও মসজিদ ছাড়া তাকে আর কোথাও দেখা যায়নি।

অনেক ভেবে দরজা খুলে দেখি, সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব দাঁড়ানো। আমি ভাবলাম, হয়তো তিনি আগের মত ফিরিয়ে নিতে এসেছেন। আমি তাঁকে বললাম, হে আবু মুহাম্মদ, আপনি কাউকে পাঠালেই তো আমি আপনার কাছে আসতাম। তিনি বললেন, ‘না, বরং তোমার কাছে আসাই অধিক উপযুক্ত।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখন তাহলে আমাকে কী নির্দেশ দিচ্ছেন? তিনি বললেন, তুমি তো পরিবারহীন। সদ্য বিয়ে করেছ। নিঃসঙ্গ রাত কাটাবে। তাই তোমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছি। সমান উঁচু হওয়ায় সে পিতার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। অতঃপর তিনি মেয়েকে দরজার ভেতর রেখে দরজা ঠেলে দেন। এদিকে লজ্জায় মেয়ে পড়ে যায়। আমি দরজা লাগিয়ে দিই। এরপর ছাদে উঠে প্রতিবেশীদের ডাক দিই। সবাই এসে জিজ্ঞেস করল, তোমার কী হয়েছে? আমি বললাম, সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব আমার সঙ্গে তাঁর মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এমনকি তিনি না জানিয়ে তাঁর মেয়েকে রেখে গেছেন। সে এখন আমার ঘরে আছে। সবাই মেয়ের কাছে যায়। আর আমার মায়ের কাছে খবর পৌঁছলে তিনিও আসেন। মা বললেন, মেয়েকে তিন দিন পর্যন্ত সাজসজ্জা করাব। এর মধ্যে তাকে স্পর্শ করলে তোমার সঙ্গে কখনো দেখা করব না।

আমি তিন দিন অপেক্ষা করে স্ত্রীর কাছে যাই। সে ছিল সবচেয়ে সুন্দরী, রূপবতী, পবিত্র কোরআনের দক্ষ হাফেজ, রাসুল (সা.)-এর হাদিস সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী ও স্বামীর অধিকার বিষয়ে খুবই সচেতন। দীর্ঘ এক মাস পর আমি সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিবের দরসে উপস্থিত হই। তখন তিনি দরস দিচ্ছিলেন। সালাম দিলে উত্তর দিলেন। কোনো কথা বললেন না। একদম সবাই চলে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ওই মানুষের কী খবর? আমি বললাম, বন্ধু যেমন কল্যাণ চায় ও শত্রু যেমন মন্দ চায় সে তেমনি আছে। তিনি বললেন, তুমি কোনো কষ্ট পেলে লাঠি তো আছে। অতঃপর আমি বাড়ি ফিরে যাই। (এক বর্ণনায় আছে) তিনি আমার কাছে ২০ হাজার দিরহাম পাঠিয়ে দেন।

মদিনার বাজারে শাস্তিদান : তৎকালীন খলিফার কাছে মদিনার গভর্নর চিঠি লিখে অভিযোগ করেন যে, মদিনাবাসী যুবরাজ ওয়ালিদ ও সুলায়মান উভয়ের জন্য বাইয়াত করতে সম্মত আছে। কিন্তু সায়িদ ইবনুল মুসায়্যিব এর বিরোধিতা করছেন। সায়িদ (রহ.) বলেন, রাসুল (সা.) একসঙ্গে দুজনের কাছে বাইয়াত থেকে নিষেধ করেছেন। পরে আবদুল মালিকের নির্দেশনামতে সায়িদকে বিরোধিতা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। কিন্তু বিরত না থাকায় তাঁকে বস্ত্রহীন করে ৫০ বেত্রাঘাত করা হয় এবং মদিনার বাজারে ঘোরানো হয়। তখন মানুষ আছরের নামাজ পড়ে ফিরছিল। সায়িদ (রহ.) বললেন, ‘এসব মুখ আমি গত ৪০ বছরে কখনো দেখিনি।’ কারণ তিনি সব সময় মসজিদে সবার আগে আসতেন এবং সবার পরে বের হতেন।

মৃত্যু : এ ঘটনার পর থেকে তিনি মানুষকে তাঁর মজলিসে বসতে নিষেধ করতেন। এমনকি পরিচিতরাও তাঁর মজলিসে বসা ছেড়ে দেয়। অপরিচিত কেউ যেন না বসে সে ব্যাপারে তিনিও সজাগ থাকতেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল কেউ তাঁর কাছে বসে যেন নির্যাতিত না হয়। ৯২ বা ৯৪ বা ১০৫ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

আল্লামা ইবনে খাল্লিকান (রহ.) রচিত ওয়াফায়াতুল আয়ান (২/২৩৭৫-৩৭৮) থেকে মুহাম্মদ হেদায়াতুল্লাহ অনুবাদ।



সাতদিনের সেরা