kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

বিয়ে নবী-রাসুলদের সুন্নাত

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা   

১১ অক্টোবর, ২০২১ ১১:২৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিয়ে নবী-রাসুলদের সুন্নাত

মানবজাতির স্বভাবগত পরিচ্ছন্নতা, মানসিক ভারসাম্য ও চারিত্রিক পবিত্রতার অন্যতম উপায় হলো বিয়ে। পবিত্র, পরিচ্ছন্ন, সংযত ও সুশৃঙ্খল জীবনের জন্য বিয়ের বিকল্প নেই। সুন্নাহ পালন, পাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার্থে বিয়ে অন্যতম ইবাদত হিসেবে পরিগণিত হয়। এ জন্য ইসলামে বিয়ের যথেষ্ট গুরুত্ব ও তাৎপর্য আছে।  

বিয়ে প্রজন্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে : বিয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠে নারী-পুরুষের শান্তি-সুখের পরিবার। এরপর পরিবারে জন্ম নেয় ভালোবাসার সেতুবন্ধ মানবশিশু। সেই শিশু একসময় পূর্ণ মানবে পরিণত হয়। এভাবেই মানব প্রজন্মের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো।’ (সুরা : হুজরাত, আয়াত : ১৩)

দৃষ্টিকে অবনমিত করে : শারীরিক, মানসিক ও চারিত্রিক পবিত্রতা অনেকটা নির্ভর করে বিয়ের ওপর। নিখুঁত ইবাদতের জন্য এসব পবিত্রতা একান্ত প্রয়োজন। বিয়ের উপকারিতা ও বিয়ের বিকল্প দুটিই হাদিসে বলে দেওয়া হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) আমাদের বলেছেন, ‘হে যুবক সম্প্রদায়, তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে দৃষ্টিকে অবনমিত করে এবং লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আর যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোজা পালন করে। কারণ রোজা যৌন প্রবৃত্তি নিবৃত্ত করে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৬৮৫;  মুসলিম, হাদিস : ৩৪৬৬)

নবী-রাসুলদের সুন্নাত : ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ে শুধু একটি উৎসাহিত বিষয়ই নয়; বরং নবী-রাসুলদের সুন্নাত। ইয়াহইয়া (আ.) ও ঈসা (আ.) ছাড়া সব নবী-রাসুল বিয়ে করেছেন। আবু আইয়ুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘চারটি জিনিস নবী-রাসুলদের সুন্নাত। লজ্জাবোধ, সুগন্ধি ব্যবহার, মিসওয়াক ও বিয়ে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০৮০)

আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার উপায় : বিয়ে মহান আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার মাধ্যম। এর জন্য প্রয়োজন আল্লাহর ওপর ভরসা ও নিজের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার সদিচ্ছা। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমাদের মধ্যে যে ছেলেদের স্ত্রী নেই এবং যে মেয়েদের স্বামী নেই তাদের এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদের বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তারা অভাবগ্রস্ত থাকে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের ধনী করে দেবেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)

শান্তি ও সুশৃংখল জীবনের মাধ্যম : বিয়ে মানসিক প্রশান্তি, স্বাভাবিক ও সুশৃংখল জীবনের অন্যতম মাধ্যম। বিয়ের মাধ্যমে দুটি পরিবারের মধ্যে সখ্য ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়। পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে সুন্দর পৃথিবী গড়ে ওঠে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে আছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য তাতে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ২১)

বিয়ে যেভাবে বরকতময় হয় : সর্বোত্তম, কল্যাণকর ও বরকতময় বিয়ে হলো, যা খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহজসাধ্যভাবে অল্প খরচে অনুষ্ঠিত হয়। জমকালো আয়োজন, জৌলুসপূর্ণ আলোকসজ্জা, গান-বাদ্য এবং খরচের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিয়ের বরকত নষ্ট করে। ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘সর্বোত্তম  বিয়ে হলো যা খরচের দিক থেকে সহজসাধ্য হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৯)

বিয়ের ক্ষেত্রে ধার্মিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া : সাধারণত বিয়ের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য, সম্পদ ও বংশমর্যাদা দেখা হয়। এগুলোর কোনোটাই টেকসই প্রশান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। প্রশান্তির জন্য প্রয়োজন নৈতিকতা, দায়িত্বসচেতনতা, কর্তব্যবোধ, কল্যাণকামিতা, অল্পে তুষ্টি, পরকালকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইত্যাদি। এসব আছে দ্বিনের মধ্যে। এ জন্য বিয়ের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) ধার্মিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে বলেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘চারটি গুণ দেখে মেয়েদের বিয়ে করা হয়। তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য এবং ধার্মিকতা। তোমরা ধার্মিকতাকে প্রাধান্য দাও।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৮০২)

বিয়ের বয়স ও যোগ্যতা : ইসলাম বাল্যবিয়েকে নিরুৎসাহ করলেও বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে কোনো সীমারেখা নির্ধারণ করেনি; বরং শারীরিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে সক্ষমতা অর্জনকেই বিয়ের যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করেছে। অঞ্চলভেদে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী বিয়ের সমীচীন বয়সসীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে বিশেষ অবস্থায় এ বয়সসীমা শিথিলও হতে পারে। যেমন—কোনো ব্যক্তির যৌনসংক্রান্ত অনাচারে লিপ্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকলে এবং অন্য সামর্থ্য অর্জিত হলে তার বিয়েতে বাধা দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে কোনোভাবে সমীচীন নয়। এভাবে কোনো নারী শারীরিক, মানসিকভাবে পূর্ণতা লাভ করার পর সুযোগ্য পাত্র পাওয়া গেলে তার অভিভাবকদের দ্রুত বিয়ের আয়োজন করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন এমন কোনো ব্যক্তি তোমাদের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করে, যার দ্বিনদারি ও চারিত্রিক দিক তোমাদের মুগ্ধ করে, তখন তোমরা ওই ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দাও। যদি তোমরা তা না করো তাহলে সমাজে বিরাট ফিতনা-ফাসাদ ও বিপর্যয় দেখা দেবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৪)

পরিশেষে বলা যায়, দ্বিনদারিকে প্রাধান্য দিয়ে এবং চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার নিমিত্তে সুন্নাহমাফিক বিয়ের আয়োজন জীবনকে বরকতময় করে তুলবে এবং আত্মিক প্রশান্তি নিশ্চিত করবে, ইনশাআল্লাহ।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা