kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রথম মুসলিম চ্যাপলেইনের মুখে ৯/১১-এর বর্ণনা

অনলাইন ডেস্ক   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৫:০১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রথম মুসলিম চ্যাপলেইনের মুখে ৯/১১-এর বর্ণনা

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার বর্ণনা দিয়েছেন সেই সময় মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রথম মুসলিম চ্যাপলিন বা ধর্মীয় ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আবদুল রাশিদ মুহাম্মদ। 

১৯৭৮ সাল থেকে তিনি ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৯৪ সালে আবদুর রশিদ মুহাম্মদ মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রথম মুসলিম চ্যাপলিন হিসেবে নিয়োগ পান। ১১ সেপ্টেম্বরের ভয়াবহ ঘটনার সময় তিনি ওয়ালটার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে দায়িত্ব পালন করছিলেন। 

আবদুর রশিদ মুহাম্মদ ১৯৭৭-৭৯ সালে সান ডিয়াগো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে কাউন্সিলিং এডুকেশন নিয়ে স্নাতকোত্তরে পড়াশোনা করেন। এর আগে তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। 

২০১২ সালে ৬৪ বছর বয়সী চ্যাপলিন মুহাম্মদ সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২৩ বছর দায়িত্ব পালন করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে থাকা অবস্থায় তিনি অবসরে যান। বর্তমানে তিনি লা জোলার ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স মেডিক্যাল সেন্টারে মানসিক স্বাস্থ্য ও আধ্যাত্মিক কাউন্সিলিং অব্যাহত রেখেছেন।

১৯৯৪ সালে তিনি সেনাবাহিনীর মুসলিম চ্যাপলেইন হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। তখনকার পরিসংখ্যান মতে, সামরিক বাহিনীতে মুসলিম সদস্যের সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচ হাজার। তবে তাঁর ধারণামতে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। কারণ অনেকেই নিজের ধর্ম সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে কোনোটা নির্ধারণ করেন না। বর্তমানে মার্কিন সেনাবাহিনীর সব শাখায় ১৫ জন মুসলিম চ্যাপলেইন বা ধর্মীয় ব্যক্তি রয়েছেন। 

হামলার ঘটনার পর মনোবিজ্ঞানীদের পাঁচ সদস্যের দল, সমাজকর্মী ও চ্যাপলিনদের দ্রুততর সময়ে পেন্টাগনে পাঠানো হয়েছিল। ওই সময় তাঁরা প্রতিদিন ৮ ঘণ্টার শিফট করে ২৪ ঘণ্টাব্যাপী দায়িত্ব পালন করেছিল। 

দীর্ঘ তিন সপ্তাহে মুহাম্মদ প্রতিক্রিয়াশীল, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকর্মী, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা, পেন্টাগনের কর্মচারী, মেডিক্যাল কর্মীসহ অন্যান্যদের মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের কাজ করেন। তাদের দেহাবশেষ দুর্ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মুহাম্মদ বলেন, ‌'একদিনের মধ্যেই বিমানের হামলায় পেন্টাগনের ভেঙে পড়া দেয়ালের বাকি অংশে একটি বড় যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা তৈরি করা হয়। জ্বালানির গন্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে ছিল।' আসন্ন সংগঠিত বিশৃঙ্খলাকে অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, স্কুল বা অফিস ভবনে মানুষ যেভাবে অংশ নিয়েছে তার চেয়েও বেশি তাদের অংশগ্রহণ ছিল।

তিনি আরো বলেন, 'সেখানে আমিই একমাত্র সদস্য ছিলাম, যার পোশাকে মুসলিম চাঁদ-তারা চিহ্ন ছিল। কোনো খ্রিস্টান ও ইহুদিদের প্রতীক ছিল না।' অন্যথায় অন্যান্য সামরিক পোশাকের মতো তাকে তা পরতে হতো। 

ওই সময় তার বিশ্বাসের তাকে টার্গেট করা হয়েছিল কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মোটেও না। আমি একজন আর্মি অফিসার ছিলাম। সেখানে আমি একজন চ্যাপলিন ছিলাম।'

ভয়াবহ ঘটনার পর দুর্ঘটনাস্থলের পাশে একটি পার্কিং এরিয়ায় তিনি ও তার সহকর্মীরা পরিষেবা স্থাপন করেন। তাদের অস্থায়ী কোয়ার্টারে একটি ধর্মীয় চিহ্ন রাখা হয়। যে কেউ প্রার্থনা করতে, সান্ত্বনা চাইতে বা বসে ও বিশ্রামে করতে চাইলে তাদের স্বাগত জানানো হতো।

মহাম্মদ বলেন, 'কেউ আমাদের সাথে কথা বলতে চাইলে তার সাথে আমরা কথা বলি। আমি এ সেবায় শুধু শুক্রবার থাকতাম। একজন পেন্টাগনের ভেতরে থাকত; অপরজন  পেন্টাগনের বাইরে থাকত। সেই সময় সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে হতাশায় আচ্ছন্ন ছিল।' 

প্রয়োজনের মুহূর্তে মানুষ সান্তনা দিতে তাদের পাশে দাঁড়াতে পেরে মুহাম্মদ ছিলেন অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি বলেন, 'আমি আমার ভূমিকা পালন করেছি। সেখানে সবাইকে একত্রিত করেছিলাম।' 

মুহাম্মদের মতানুসারে যেকোনো ধর্মের কেউ ভয়ানক কাজ করতে পারেন। আর আল-কায়েদার সন্ত্রাসীরা ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিল। কিন্তু তাদের এ কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই ইসলামী শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না। তাই বলে এ ধর্মের অন্যান্য অনুসারীরা তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী হবে না। 

মুহাম্মদ বলেন, 'আমরা মুসলিম সম্প্রদায় অনেক ভয় ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলাম। সেই সময় মসজিদগুলো চরমভাবে অপবিত্র হয়। কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস বা পুড়িয়ে ফেলা হয়। আমেরিকায় মুসলিম সংগঠনগুলোর অফিস লুণ্ঠিত হয়। এভাবে অনেক বিশৃঙ্খলা, বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে।' 

প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ ওয়াশিংটন ডিসি মসজিদ পরিদর্শন করে উত্তেজনা প্রশমিত করতে সাহায্য করেন। মুহাম্মাদ বলেন, 'সন্ত্রাসীরা ইসলামী শিক্ষা লালন করেন না। আমেরিকার মুসলিম সম্প্রদায় তাঁর এ কাজের জন্য খুব কৃতজ্ঞ।'

২০০১ সালের ১১ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট বুশ ও মার্কিন মন্ত্রিসভার সদস্য, জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ, আইনপ্রণেতা ও হাজার হাজার দর্শকের সাথে তিনিও একটি স্মারক আনুষ্ঠানে অংশ নেন।

তৎকালীন আর্মি চিফ অব চ্যাপলেইন মুহাম্মদকে এ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রার্থনা করার আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, 'আমার ইচ্ছাধীন হলে আমি অবশ্য তাতে অংশ নিতাম না।'
সূত্র : দ্য সান ডিয়াগো ইউনিয়ন ট্রিবিউন



সাতদিনের সেরা