kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

স্মৃতির পাতায় আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)

প্রফেসর ড. আ. ক. ম. আবদুল কাদের   

২০ আগস্ট, ২০২১ ১৭:৪৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্মৃতির পাতায় আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)

প্রফেসর ড. আ. ক. ম. আবদুল কাদের ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী

১৯৯১ সাল থেকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সঙ্গে আমার পরিচয়। প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামিক স্কলার আল্লামা সুলতান যাওক নদভীর মাধ্যমে এ সম্পর্কের সূত্রপাত। ১৯৮৫ সালে আল্লামা সুলতান যওক নদভী চট্টগ্রাম শহরে দারুল মা'আরিফ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে মক্কা ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংস্থা রাবিতা আল আদব আল ইসলামী (ইন্টারন্যাশনাল লিগ অব ইসলামিক লিটারেচার)-এর বাংলাদেশ ব্যুরো অফিস ছিল। প্রতি মাসে এখানে সংস্থার বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠিত হত। এই সংস্থার সদস্য হওয়ায় আমি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.) একসঙ্গে এই সভায় অংশগ্রহণ করতাম।

বিভিন্ন সময় আমি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এখানের সভায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করতাম। বরেণ্য আলেম ও লেখক হওয়ায় তাঁর বাবার নামের সঙ্গে আরও আগ থেকে পরিচিত ছিলাম। তাঁর বাবা আল্লামা আবুল হাসান (রহ.) ছিলেন হাটহাজারী মাদ্রাসার শাঈখুত তাফসির বা বিভাগের প্রধান শিক্ষক। হাদিসের প্রশিদ্ধ গ্রন্থ ‘মিশকাত আল মাসাবিহ’ গ্রন্থের উর্দু ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘তানজিমুল আশতাত’ গ্রন্থটি তিনি রচনা করেন, যা আমার সংগ্রহে ছিল। সেই সুবাদে তাঁর বাবার সঙ্গে পরিচয়। পারিবারিকভাবে তিনি ছিলেন একটি ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারের সন্তান। এই কারণে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেকগুণ বেড়ে যায়। 

তখনকার সময় মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী আমাদের কাছে কেবল একজন আলেম হিসেবে পরিচিত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর সুনাম-খ্যাতি তখনো ছড়িয়ে পড়েনি। আমাদের পারস্পরিক এই সম্পর্ক ছিল একাডেমিক যা টেকসই সম্পর্কের রূপ পরিগ্রহ করে। এরপর থেকে দারুল মা'আরিফে যেসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে আমি ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী কখনো প্রবন্ধ উপস্থাপক, আবার কখনো ডেলিগেট হিসাবে অংশগ্রহণ করেছি। 

এছাড়াও তাঁর কর্মস্থল দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসায় আল্লামা আহমদ শফী (রহ.)-এর আমন্ত্রণে আমি তিন বছর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদানের জন্য আমন্ত্রিত হই। এতে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করি। সেই সময় আমরা একসঙ্গে মেহমান খানায় দুপুরের খাবার গ্রহণ করেছি। এসব ক্ষেত্রে আমার সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ করতেন মাদ্রাসার তৎকালীন শিক্ষক আল্লামা আবু তৈয়ব আবদুল্লাহপুরী। এরপর আমি যতবারই হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়েছি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। যখনই সাক্ষাত হয়েছে আমাদের মধ্যে আন্তরিকপূর্ণ পরিবেশে বিভিন্ন বিষয়ে মত-বিনিময় ও আলাপ-আলোচনা হয়েছে।

২০০৪ সালে আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। তখন বিভাগের উদ্যোগে ‘ইসলামী সাহিত্য : প্রকৃতি ও পরিধি’ শীর্ষক একটি মনোজ্ঞ সেমিনারের আয়োজন করি। আমার একান্ত স্নেহভাজন ছাত্র বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক অধ্যাপক ড. আহমদ আলী এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করে। এই সেমিনারে আমি চট্টগ্রামের প্রখ্যাত ওলামা-মাশায়েখ ও ইসলামিক স্কলারদের আমন্ত্রণ জানাই। সকলেই এতে অংশগ্রহণ করে মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, আল্লামা সুলতান যাওক নদভী, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক আহমদ প্রমুখ। সেমিনার শেষে আমি সবার জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করি। সবাই তাতে অংশগ্রহণ করেন।

২০১০ সালে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভের পর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর কর্মতৎপরতা অনেকগুণ বেড়ে যায়। তখন থেকে তাঁর সঙ্গে আমার আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। তবে গত বছর একটি ঘটনাকে কেন্দ্রকরে হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি ঘোষণার পর আমি কালবিলম্ব না করে সংগঠনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনকে ফোন করি। তাকে পরামর্শ দিয়ে বলি, এ ধরনের কর্মসূচি কওমি মাদরাসার জন্য ইতিবাচক কোনো ফল বয়ে আনবে না। একজন উপদেষ্টা হিসেবে তিনি যেন বিষয়টি নিয়ে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সাথে কথা বলেন। এ বিষয়ে ফেসবুকে দুইটি পোস্ট দেই। কেই কেউ নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করলেও শেষে দেখা যায়, আমার আশংকা অমূলক ছিল না।

May be an image of one or more people, monument and text

দীর্ঘদিন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সাথে দেখা বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে হয়েছিল, তিনি হয়ত আমার কথা ভুলে গেছেন। কিন্তু আমার ধারণা ছিল অমূলক। কারণ ২০১৭ সালে তাঁর বন্ধু ও সহপাঠী জনাব মাওলানা জালাল উদ্দিন আমার সাথে দেখা করেন। কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে আমার হাতে দেন। হাতে নিয়ে দেখি তা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর লেখা। তিনি আমার জন্য সৌজন্য কপি পাঠিয়েছেন। আরবি ভাষায় লেখা বইয়ের নাম, ‘আত তাওহিদ ওয়াল শিরক ওয়া আকসামুহা। বইটি প্রকাশ করেছে ওমানের মাকতাবা আল রাইয়্যান নামে বিখ্যাত একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তা প্রকাশ করে। বইটি খুলে দেখি তাতে আমার নাম লেখা, আল্লামা ‘ড. আবদুল কাদির’। এর নিচে ফার্সিতে লেখা ‘জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষ থেকে’। বইটি হাতে পেয়ে বুঝলাম, স্বরচিত বই হাদিয়া পাঠিয়ে পুরাতন সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করছেন।

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ছিলেন একজন বরেণ্য আলিমে দ্বীন, ইসলামের বিশুদ্ধ চিন্তা-চেতনাধারী মধ্যপন্থার অনুসারী। তাঁর কথা ও আচরণে প্রান্তিকতার ছাপ ছিল না। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। ভাবগম্ভীর পরিবেশে কথা বলতেন। সবসময় আল্লাহর স্মরণ ও উম্মাহর চিন্তায় বিভোর থাকতেন। অযথা সময় নষ্ট করতেন না। ইলমে হাদিস শাস্ত্রের খেদমত ও দ্বীনের প্রচার ও প্রসার ছিল তাঁর জীবনের মিশন। শাপলা চত্বরের ঘটনার পর তাঁর চলাফেরা অনেকটা সীমিত হয়ে পড়ে। একের পর এক মানসিক চাপ ও ক্রমাগত শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে দুর্বল করে ফেলে।

গতকাল বৃহস্পতিবার (১৯ আগস্ট) চট্টগ্রাম শহরে যাওয়ার পথে শুনতে পেলাম, বাংলাদেশের এই প্রাজ্ঞ আলেম, সমকালীন ইতিহাসের আলোচিত ব্যক্তিত্ব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ইন্তেকাল করেছেন। একটু পর চট্টগ্রাম শহর থেকে হাটহাজারীর দিকে একটি এ্যাম্বুলেন্সকে ছুটে যেতে দেখলাম। গাড়ির সামনে ও পেছনে পুলিশের গাড়ি। জানতে পারলাম আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মরদেহ নেওয়া হচ্ছে। 

মহান আল্লাহ এই বরেণ্য আলেমের সব দ্বীনি খিদমত কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করুন। আমিন। 

লেখক :অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা