kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

সুদি লেনদেন চেনার উপায়

মুফতি হুমায়ুন কবির   

১২ আগস্ট, ২০২১ ১০:৫২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুদি লেনদেন চেনার উপায়

মহান আল্লাহ ব্যবসা-বাণিজ্য হালাল করেছেন আর সুদ হারাম করেছেন। সুদের আরবি প্রতিশব্দ ‘রিবা’। রিবা শব্দটি ‘রিবাআন’ থেকে নির্গত। রিবা শব্দের বিভিন্ন অর্থ আছে। রিবা শব্দের মূল অর্থ অতিরিক্ত হওয়া। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর তাতে আমি পানি বর্ষণ করি। ফলে তা শস্য-শ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদ্গত করে সব ধরনের নয়নাভিরাম উদ্ভিদ।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৫)

রিবা শব্দের এক অর্থ উঁচু। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘এমন বাগান, যা টিলায় আছে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৫)

এ ছাড়া রিবা বর্ধিত, সাধারণ অতিরিক্ততা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়।

সুদের পারিভাষিক সংজ্ঞা : চার মাজহাবের প্রসিদ্ধ ইমামরা রিবার বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন।

হানাফি মাজহাবে রিবার সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া হয়েছে, ‘ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে রিবা এমন অতিরিক্ত বস্তু, যার বিনিময় নেই, যা লেনদেনে কোনো এক পক্ষের জন্য শর্তারোপ করা হয়েছে।’

শাফেয়ি মাজহাব মতে, ‘কোনো নির্দিষ্ট বিনিময়ে নগদভাবে সমানবিহীন চুক্তি করা অথবা উভয় বিনিময় দেরি করা কিংবা যেকোনো একটি আদায়ে দেরি করাকে রিবা বলা হয়।’

হাম্বলি মাজহাব মতে, ‘নির্দিষ্ট বস্তুতে অতিরিক্ত নেওয়া এবং নির্দিষ্ট বস্তুতে শরিয়তনিষিদ্ধ পন্থায় বাকিতে লেনদেন করা। আর এই লেনদেন নিষিদ্ধ হয় সরাসরি কোরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে বা কিয়াসের মাধ্যমে।’

মালেকি মাজহাব মতে, ‘সুদের প্রত্যেক প্রকারের পৃথক সংজ্ঞা আছে।’ (আল মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়াইতিয়া, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ৫০)

লুগাতুল ফুকাহা কিতাব প্রণেতা বলেন, ‘সুদ হলো প্রত্যেক অতিরিক্ত, যা চুক্তিতে শর্ত করা হয়, যার কোনো বিনিময় নেই।’ (লুগাতুল ফুকাহা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৮)

আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যেসব ঋণ ফায়দা টেনে নেবে তা সুদ।’ (আল বিনায়া শরহে হিদায়া, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৯৩)

আল্লামা সারাখসি (রহ.) বলেন, ‘সুদ হলো ওই অতিরিক্ত, যা বিনিময়শূন্য। আর এটি বেচাকেনায় শর্তযুক্ত।’ (মাবসুত, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১০৯)

হিদায়া প্রণেতা বলেন, ‘সুদ হলো ওই অতিরিক্ত, যা যেকোনো এক চুক্তিকারী পাবে। লেনদেন বিনিময়বিহীন শর্তযুক্ত। (হেদায়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬১)

কানজ প্রণেতা বলেন, ‘সুদ হলো আর্থিক লেনদেনে বিনিময়বিহীন অতিরিক্ত সম্পদ নেওয়া।’ (তাবইনুল হাকায়িক, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৮৫)

ফাতাওয়া শামিতে এসেছে, ‘বিনিময়বিহীন অতিরিক্ত সম্পদকে সুদ বলা হয়।’ (ফাতওয়া শামি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১)

সুদের প্রকারভেদ : সুদ প্রাথমিকভাবে দুই প্রকার :

১. ঋণের সুদ বা জাহেলি সুদ। এটি কোরআনে বর্ণিত।

২. বেচাকেনার সুদ। এটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

প্রথমটি স্পষ্ট। এটাকে কোরআনের রিবা বলা হয়। আর দ্বিতীয়টিকে হাদিসের রিবা বলা হয়। এর কারণের বিবরণে চার মাজহাবে মতানৈক্য আছে।

বেচাকেনার সুদ হানাফি, মালেকি ও হাম্বলিদের মতে দুই প্রকার।

১. অতিরিক্তের রিবা বা রিবাল ফজল।

২. বিলম্ব রিবা বা রিবা আন-নাসিয়্যাহ। একে বিলম্ব সুদ বলা হয়। এটি প্রকৃতপক্ষে সুদ নয়; বরং সুদের সন্দেহ সৃষ্টিকারী। বিলম্বের কারণে এই সন্দেহ সৃষ্টি হয়।

অতিরিক্তের রিবা বা রিবাল ফজলের সংজ্ঞা

হানাফিদের কাছে :  ‘রিবাল ফজল ওই অতিরিক্ত, যার বিনিময় নেই, যা লেনদেনে কোনো একপক্ষের জন্য তা শর্ত করা হয়।’

হাম্বলি মাজহাব মতে, ‘রিবাল ফজল ওই অতিরিক্ত, যা একই জাতের সুদি পণ্যের বিনিময়ে পাওয়া যায়।’ (ইবনে কুদামা, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৫৩)

লুগাতুল ফুকাহা প্রণেতা বলেন, ‘সুদি পণ্যে বেশ-কম করে লেনদেন করার নাম রিবাল ফজল। (মুহাম্মদ রাওয়াস কালাজি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৮)

রিবা আন-নাসিয়্যা বা বিলম্ব সুদ :

হানাফি মাজহাব মতে, ‘রিবা আন-নাসিয়্যা হলো, একই জাতের বস্তুতে সময় বৃদ্ধির বিপরীতে অতিরিক্ত নেওয়া।’

লুগাতুল ফুকাহা প্রণেতা বলেন, ‘রিবা আন-নাসিয়্যা হলো, ওই অতিরিক্ত অর্থ-সম্পদ, যা সময়ের বিপরীত নেওয়া হয়।’ (মুহাম্মদ রওয়াস কালাজি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৮)

আল মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যা কুয়াইতিয়্যাতে এসেছে, ‘রিবা আন-নাসিয়্যা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋণে বর্ধিত করা। এই প্রকারকে রিবা আন-নাসিয়্যা বলা হয়। কেননা সেখানে তা দেরিতে নেওয়া হয়। আর অতিরিক্ততা সময়ের বিপরীতে বেচাকেনায় হোক বা ঋণে হোক—তাকে কোরআনে রিবা বলা হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাস স্থাপনকারীরা, তোমরা দ্বিগুণের ওপর দ্বিগুণ সুদ (চক্রবৃদ্ধিহারে) ভক্ষণ কোরো না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩০)

ঋণ দিয়ে সুদ গ্রহণ করা হারাম। তা যে নামেই হোক, হারাম। যেমন—মুনাফা, ইন্টারেস্ট, স্পিড মানি সবই হারাম।

উপসংহার : মৌলিকভাবে সুদ দুই প্রকার। এক. ঋণের সুদ। কাউকে ঋণ দিয়ে পরে বেশি উসুল করা। তা আবার দুই প্রকার এক. ঋণ দিয়ে বেশি নেওয়া। যাকে সরল সুদ বলা হয়। দুই. মেয়াদ শেষ হলে ঋণ আনাদায়ে আরো সময় বাড়িয়ে অতিরিক্ত নেওয়া। এটাকে চক্রবৃদ্ধি সুদ বলা হয়।

দুই. বেচাকেনায় সুদ। এটিও দুই প্রকার। এক. বেশ-কম করে বিক্রি করা, এটাকে রিবাল ফজল বলা হয়। এটি বাস্তব সুদ। তবে এটি সুদ হওয়ার জন্য দুটি শর্ত। এক. একই জাতের হতে হবে। দুই. একই মাপের তথা কায়লি বা ওজনি (কেজি বা সেরি) হতে হবে।

দুই. সময় দিয়ে বাকিতে বিক্রি করা। এটাকে বিলম্ব সুদ বলা হয়। এটি আসলে সুদ নয়; বরং সুদের সন্দেহ (শুবহাতুর রিবা)। কেননা, একটি পণ্য নগদ আদায় করলে অন্যটি পরে আদায় করলে অন্যের সঙ্গে সময় যোগ হয়ে কোরআনের সুদের সাদৃশ্য হয়ে যায়। এ তখন সুদ হবে, যখন একই মাপের বা জাতের না হবে।

তাই হানাফি মাজহাবের মতে, আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল নিম্নরূপ :

১. টাকা বা যেকোনো পণ্য ঋণ দিয়ে সরল সুদ গ্রহণ করা হারাম।

২. টাকা বা যেকোনো পণ্য ঋণ দিয়ে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ গ্রহণ করা হারাম।

৩. বেচাকেনার পণ্য একই জাতের ও একই মাপের হলে বাকিতে বিক্রি এবং বেশ-কম দুটিই হারাম। যেমন—খেজুরের পরিবর্তে খুেজর।

৪. বেচাকেনায় যদি একটি শর্তও পাওয়া না যায় তথা একই জাতের না হয় এবং একই মাপেরও না হয়, তখন দুটিই হালাল। যেমন—টাকার পরিবর্তে খেজুর নেওয়া। তা বেশ-কম করা ও বাকিতে লেনদেন করা বৈধ।

৫. বেচাকেনা যদি একই জাতের হয়, একই মাপের না হয়, যেমন—ছাগলের পরিবর্তে ছাগল। কেননা ছাগল ওজনি ও কায়লি বস্তু নয়, তখন বাকিতে বিক্রি করা হারাম—জাহেলি যুগের সুদের সন্দেহের কারণে। তবে এটি বেশ-কম করে বিক্রি করা বৈধ।

৬. পণ্য যদি একই জাতের না হয়; কিন্তু একই মাপের হয় যেমন—খেজুরের পরিবর্তে গম, তখন বাকিতে বিক্রি করা হারাম। তবে বেশ-কম করা হালাল।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুদমুক্ত জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন!

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।



সাতদিনের সেরা