kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

জার্মান কূটনীতিক যেভাবে ইসলামী চিন্তাবিদ হলেন

অনলাইন ডেস্ক   

২৯ জুলাই, ২০২১ ১৮:০২ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জার্মান কূটনীতিক যেভাবে ইসলামী চিন্তাবিদ হলেন

জার্মানির প্রশিদ্ধ কূটনীতিক ড. মুরাদ উইলফ্রেড হফম্যান। জীবনের এক পর্যায়ে সড়ক দূর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যু মুখে এসেও রক্ষা পান। অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসক জানান, ‘এ ধরনের দুর্ঘটনায় সাধারণত কেউ রক্ষা পায় না। আল্লাহ তোমাকে দিয়ে বিশেষ কিছু করাবেন।’ চিকিৎসকের কথা বিচক্ষণ কূটনীতিকের মনে রেখাপাত করে। 

১৯৩১ সালের ৬ জুলাই জার্মানির অ্যাশচাফেনবার্গের একটি ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। 

১৯৬১ সালে হফম্যান জার্মানির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ শুরু করেন। আলজেরিয়ার পারমাণবিক প্রতিরক্ষা বিভাগের গবেষণা সহকারি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে ব্রাসেলসে ন্যাটোর তথ্য বিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে আলজেরিয়ায় এবং ১৯৯০ সালে মরক্কোতে জার্মানির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে একজন তুর্কি নারীকে বিয়ে করে তুরস্কে থিতু হন। 

১৯৮০ সালে মুরাদ হফম্যান ইসলাম গ্রহণ করলে চারিদিকে তোলপাড় শুরু হয়। জার্মান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় তাকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। মরক্কোর মুসলিমদের সুন্দর আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৮২ সালে তিনি ওমরাহ এবং ১৯৯২ সালে হজ পালন করেন। 

হফম্যান বর্ণনা করেন, ‘জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পরীক্ষার সময় সবাইকে পাঁচ মিনিট করে দৈবক্রমে নির্বাচিত একটি বিষয়ে বক্তব্য দিতে হত। প্রত্যেককে ১০মিনিট সময় দেওয়া হত। অবাক করা ব্যাপার হলো, আলজেরিয়া ইস্যু আমার বক্তব্যের বিষয় নির্ধারিত হয়।  

আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, এ বিষয়ে আমার জানাশোনাও অনেক ছিল। পরীক্ষার পর আমি কিছুদিন সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় অবস্থান করি। তখন প্রশিক্ষণ পরিচালক আমাকে আলজেরিয়া পাঠানোর কথা জানালেন। সেখানে দুই বছর দায়িত্ব পালন করি। তখন ফরাসি ঔপনিবেশিক সৈন্যদল ও আলজেরিয়ান ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছিল। এ সময় সিক্রেট আর্মি অর্গানাইজেশন নামে ফ্রান্সের তৃতীয় আরেকটি চরম উগ্রবাদী দল আবির্ভূত হয়। এরপর থেকে আলজেরিয়ার পথে-ঘাটে প্রতিদিন অসংখ্য মরদেহ পড়ে থাকত। তাদের অপরাধ ছিল, তারা হয়ত মুসলিম নতুবা আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্পৃক্ত। 

এসব মর্মান্তিক ঘটনা আমার ইসলামের প্রতি আগ্রহী হওয়ার পেছনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। রমজান মাসে আলজেরিয়ার মুসলিমদের বিজয়ের প্রতি দৃঢ়তা ও আস্থা চোখে পড়ার মতো ছিল। তাদের মানবিকতাবোধ ও অন্যের সংকটে এগিয়ে আসার প্রেরণা ছিল কল্পনাতীত। সেই রাতে আমার সন্তান সম্ভবা স্ত্রী রক্তপাত শুরু হয়। এদিকে পুরো শহরে রাতব্যাপী কারফিউ চলছিল। সকাল ছয়টার আগে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। কাউকে দেখলে কিছু না বলেই হত্যা করা হবে এমন ধরনের পরিবেশ চারিদিকে বিরাজ করছিল। ভবনের চার তলা থেকে উঁকি দিচ্ছিলাম, কোনো অ্যাম্বুলেন্স আসছে কিনা। সকাল ছয়টার বেজে অনেক পরে আমরা অ্যাম্বুলেন্স পাই। চলার পথে অজ্ঞান হওয়ার আগে স্ত্রী আমাকে জানাল, তার রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ। চালক আমাদের কথাআকআ শুনে বলল, তারও একই রক্তের গ্রুপ, সে আমাদের রক্ত দিতে প্রস্তুত। এমন যুদ্ধের পরিস্থিতিতে একজন অজ্ঞাত বিদেশি নারীর জীবন রক্ষায় রক্ত দিতে এগিয়ে এসেছিলেন সেই মুসলিম চালক। 

আলজেরিয়ার মুসলিমদের জীবনযাত্রা আমার মধ্যে তুমুল প্রভাব ফেলে। আমি মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র কোরআনের ফরাসি অনুবাদ পাঠ শুরু করি। এরপর তা আজীবন পড়েছি। সেই কঠিন সময়েও আমি সেখানকার মক্তবগুলোতে শিশুদের কোরআন মুখস্ত করতে দেখেছি। মূলত তখনই প্রথম তাদের কোরআন পাঠ দেখে আমি বিস্ময়াভূত হই। এরপর বুঝতে পারি যে কোরআন তেলাওয়াত আল্লাহর অন্যতম নির্দেশনা। কোনো পরিস্থিতিতে তা বন্ধ হওয়ার মতো নয়। 

১৯৮০ সালে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের আগে হফম্যান একজন মুসলিমের মতো চিন্তা ও চেতনা লালন শুরু করেন। মুসলিম হওয়ার পর আমার আমলের মধ্যে খুব বেশি উন্নতি করতে পারিনি। অথচ মুসলিম হিসেবে ইসলামী চিন্তা-বিশ্বাসের পাশাপাশি কর্ম ও আচার-ব্যবহারের দিক থেকেও মুসলিম হওয়া জরুরি। 

ইসলাম গ্রহণের আগে হফম্যান ভেবেছিলেন মদ ও শূকরের গোশত খাওয়া ছাড়া তিনি একদিনও বাঁচবেন না। তিনি বলেন, ‌‌‘আমার ভাবনায় ছিল না, এক ফোঁটা মদ পান না করেও আমি ঘুমাত পারব। তাছাড়া আগ থেকেই আমার ঘুমের সমস্যা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল পুরোপুরি বিপরীত। এসব খাবার বাদ দিয়ে আমার শরীর আগের চেয়ে আরো শান্ত ও স্থির হয়। এক পর্যায়ে আমার কাছে এসবের দুর্গন্ধ চরম বিরক্তিকর হওয়া শুরু হয়।’

তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থ : এক. ইসলাম, দ্য অল্টারনেটিভ; দুই. জার্নি টু ইসলাম; তিন. ইসলাম ২০০০; চার. ইসলাম অ্যান্ড কুরআন : এন ইনট্রডাকশন; পাঁচ. রিলিজিয়ান অন দ্য রাইজসহ ইত্যাদি গ্রন্থ তিনি রচনা করেন।

২০২০ সালে ১৩ জানুয়ারি সোমবার ৮৯ বছর বয়সে মুরাদ উইলফ্রেড হফম্যান মৃত্যু বরণ করেন।



সাতদিনের সেরা