kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

প্রথম যে ব্রিটিশ নারী হজ পালনে মক্কায় গিয়েছেন

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ   

২৭ জুলাই, ২০২১ ১৬:৫৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রথম যে ব্রিটিশ নারী হজ পালনে মক্কায় গিয়েছেন

হজ পালনকারী প্রথম ব্রিটিশ নারী জয়নব এভলিন কোবোল্ড।

মুসলিম হিসেবে বেড়ে ওঠা : জয়নব কোবোল্ড ১৯৩৩ সালে প্রথম ব্রিটিশ নারী হিসেবে হজ পালন করেছেন। ভ্রমণবৃত্তান্ত একজন লেখক হিসেবে তিনি লেডি এভলিন নামে সুবিখ্যাত। ঠিক কোন সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তা সঠিকভাবে তিনিই জানেন না। তাঁর হজভ্রমণের বিখ্যাত বই ‘দ্য পিলগ্রিমেজ টু মক্কা’ বইয়ে তিনি লিখেন, ‘আমি ঠিক সেই মুহূর্তের কথাটি জানি না যে সময় আমি ইসলামের বাস্তবতা উপলব্ধি করেছি। আমার মনে হয়, আমি সব সময় মুসলিম ছিলাম।’

অভিজাত পরিবারের সন্তান : লেডি এভেলিন মারে কোবোল্ড একজন ভ্রমণপিপাসু ও ক্রীড়াপ্রেমী অভিজাত স্কটিশ নারী। ভিক্টোরিয়া যুগে অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি। ১৮৭৬ সালে স্কটল্যান্ডের এডেনবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন লেডি গেরট্রুড কোক ও সপ্তম আর্ল অব ডানমোর চার্লস অ্যাডলফাস মারের জ্যেষ্ঠ কন্যা। তাঁর পরিব্রাজক বাবা প্রায়ই চীন ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে ঘুরতে যেতেন। তাঁর মাও ভ্রমণপিপাসু ছিলেন। 

জয়নব এভেলিন কোবোল্ড।

ভ্রমণপ্রেমী বাবা-মায়ের সন্তান : এভলিনের বাবা প্রতি বছর শীত কাটাতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতেন। মুসলিমদেশে ভ্রমণের মাধ্যমে এভলিন ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। শৈশবের বেশিরভাগ সময় তিনি আলজেরিয়ার রাজধানী আলজেয়ার্স ও মিসরের রাজধানী কায়রোতে কাটিয়েছেন। সেখানেই তিনি আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। স্থানীয় সমবয়সী মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে তিনি মসজিদে ঘুরে বেড়াতেন। তাছাড়া বিভিন্ন দেশে তাঁর অনেক ভ্রমণসঙ্গী বন্ধু ছিল, যাদের অনেকে মুসলিম ছিলেন। 

বিয়ে ও বিচ্ছেদ : ১৮৯১ সালের ২৩ এপ্রিল কায়রোর আল সেইন্টস গির্জায় জন দুপুইস কোবোল্ডের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এক দশকে তাদের তিনটি সন্তান হয়। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ তাঁর জন্য সহজতর ছিল না। বিশেষত পরিবার তাঁকে মুসলিম হিসেবে মেনে নিতে চায়নি। এমনকি স্বামীর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। ১৯২২ সালে তাদের বিয়েবিচ্ছেদ ঘটে। বিচ্ছেদের পর থেকে জয়নব লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। ১৯২৯ সালে তার স্বামী মারা যান। 

হজের ভ্রমণকালেজয়নব এভেলিন কোবোল্ড।

মুসলিম পরিচয়ের ঘোষণা : জয়নবের ভাষ্যমতে তরুণ বয়সেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। ১৯১৫ সালে প্রথম বার তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা জানান। নিজেকে মুসলিম ঘোষণা দেওয়া ঘটনা বর্ণনা করে তিনি লিখেন, ‘কয়েক বছর অতিবাহিত হয়। একবার আমি ইতালিয়ান বন্ধুদের সঙ্গে রোমে ছিলাম। তখন জয়নবের বন্ধু জানাল, আমি চাইলে পোপের সঙ্গে সাক্ষাত করতে পারব। বন্ধুর কথা শুনে আমি আনন্দে আত্মহারা। অতঃপর পোপের সঙ্গে দেখা করি। কথার মধ্যে হঠাৎ পোপ জানতে চাইলেন আমি ক্যাথলিক কিনা? তাঁর প্রশ্ন শুনে বিস্ময়াভূত হই। কয়েক মুহূর্ত পর বললাম, আমি একজন মুসলিম। অনেক বছর যাবত আমি ইসলাম নিয়ে কিছুই ভাবিনি। হঠাৎ এক আলোকরশ্মি জ্বলে ওঠে। এরপর আমি বিশ্বাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি।’ মূলত শৈশব থেকে মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর পরিচিতি থাকলেও মূলত তখন থেকে তিনি ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি হজ পালনের দৃঢ় ইচ্ছা করেন।

 

হজ ভ্রমণ নিয়ে লেখা জয়নব এভেলিনের বই। 

সৌদির সহায়তায় হজের চেষ্টা : ১৯২৯ সালে ৬২ বছর বয়সে জয়নব হজে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত হেজাজ ও নাজদের রাষ্ট্রদূত হাফিজ ওয়াহবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওয়াহবা সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজের কাছে এ বিষয়ে পত্র লিখেন। তখন ইউরোপীয়দের মক্কায় প্রবেশে অনেক বিধি-নিষেধ ছিল। কিন্তু তাঁকে উন্নত সুযোগ-সুবিধাসহ হজ পালনের অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯৩৩ সালে মিসরের সুয়েজ সিটি থেকে হজের দীর্ঘ ভ্রমণ শুরু করেন। সেখানে কলেরা ও গুটি বসন্তের টিকা গ্রহণ করেন। সেখান থেকে তাওফিক বন্দরে গিয়ে জেদ্দাগামী ফেরিতে চড়েন। ২৬ ফেব্রুয়ারি চারদিন ফেরি চড়ে তিনি জেদ্দায় গিয়ে পৌঁছেন। 

মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পৌঁছে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি লিখেন, ‘আমি মসজিদুল হারামে অবস্থান করছি। কয়েক মুহূর্ত মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। আমরা সবচেয়ে পবিত্রতম স্থান আল্লাহর ঘরের চারপাশে হাঁটছি। এমন দৃশ্যের চিত্রায়নের জন্য উপযুক্ত কলমের প্রয়োজন। সুবিশাল সৃষ্টিজগতের মধ্যে আমি অতিসামান্য এক জীব। তখন যেন আমি মহান স্রষ্টার আধ্যত্মিক প্রবল ঢেউয়ের মধ্যে দোল খাচ্ছি।’

হজের ভ্রমণ নিয়ে বই রচনা : মক্কা ভ্রমণ ও হজ পালন নিয়ে জয়নব একটি বই লিখেন। একজন ব্রিটিশ নারীর হজ পালনের স্মৃতি নিয়ে এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম বই। ১৯৩৪ সালে ‘দ্য পিলগ্রিমেজ টু মক্কা’ নামে বইটি প্রকাশিত হয়। এ বইয়ে হজের গুরুত্বপূর্ণ বিধান, নিজের মুসলিম হওয়া ও হজ পালনের কথা তুলে ধরেন। 

ভ্রমণবৃত্তান্তমূলক বই রচনা : একজন প্রাণবন্ত উন্নত রুচির ব্যক্তি ছিলেন তিনি। শৈশব থেকে প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিমোহিত ছিলেন তিনি। পাশাপাশি দুঃসাহসী ভ্রমণের প্রতি খুবই অনুরাগ ছিল তাঁর। নারী ভ্রমণসঙ্গীদের নিয়ে ইউরোপ ও মধ্যেপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ভ্রমণবৃত্তান্ত নিয়ে ‘ওয়েফার্স ইন দ্য লিবিয়ান ডেজার্ট’ একটি বই লিখেন। 

ইসলাম বাস্তবমুখী জীবনব্যবস্থা : একটি খ্রিস্টান পরিবারে বেড়ে ওঠলেও তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে ঈসা (আ.) শুধুমাত্র আল্লাহর নবী ছিলেন। তিনি লিখেন, ‘আমি ইসলাম সম্পর্কে যতই জানতে থাকি আমার মনে একথা বদ্ধমূল হয় যে ইসলাম সঠিক ও বাস্তবধর্মী একটি ধর্ম। এমনকি বিশ্বের অধিকাংশ সমস্যা-সঙ্কট সমাধানের চেষ্টায় ইসলামের ভূমিকা অনেক বেশি।’ 

মৃত্যুর পর পাহাড়ে দাফন : হজ পালনের ৩০ বছর পর ৯৬ বছর বয়সে জয়নব স্কটল্যান্ডে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর জানাজার নামাজ পড়ানোর জন্য স্কটল্যান্ডে কোনো মুসলিম ছিল না। অতঃপর ইংল্যান্ডের ওকিং মসজিদে যোগযোগ করে তাঁর জানাজার ব্যবস্থা করা হয়। তার অন্তিম ইচ্ছামতো এলাকার মক্কা অভিমুখী একটি পাহাড়ে তাকে দাফন করা হয়। পাহাড়ের দুর্ভেদ্য পথ পাড়ি দিয়ে ইমাম তাঁর জানাজা পড়ান। 

কবরের ফলকে কোরআনের আয়াত : জয়নবের আরেকটি অন্তিম ইচ্ছাও পূরণ করা হয়। তাঁর কবরে যেন পবিত্র কোরআনের আয়াতটি লেখা হয়, ‘মহান আল্লাহ আকাশমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠের জ্যোতি।’ (সুরা আন নুর, আয়াত : ৩৫)

তাঁর কবরের ফলকে এই আয়াতটি আরবিতে লেখা হয়েছিল। তবে বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, তাঁর কবর থেকে আয়াতটি কারা যেন ছুড়ি দিয়ে খুঁচিয়ে নষ্ট করে ফেলেছে।

মহান আল্লাহ তার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন এবং ভালো কাজ কবুল করুন।

সূত্র : হেরিটেজ টাইমস ও মুসলিম কনভার্টস স্টোরিজ



সাতদিনের সেরা