kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

চলে গেলেন পবিত্র কোরআন ও হাদিস গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদক

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ   

১৫ জুলাই, ২০২১ ১৭:৫২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চলে গেলেন পবিত্র কোরআন ও হাদিস গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদক

ডা. ‍মুহাম্মদ মুহসিন অনূদিত পবিত্র কোরআন ও সহিহ আল বুখারির অনুবাদ গ্রন্থ।

ইংরেজি ভাষায় পবিত্র কোরআনের অনুবাদক ও হাদিসের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ সহিহ আল বুখারির প্রথম ইংরেজি অনুবাদক ডা. ‍মুহাম্মদ মুহসিন খান মারা গেছেন। গতকাল বুধবার (১৪ জুলাই) রাতে তিনি মদিনায় মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৯৭ বছর। মসজিদে নববিতে আজ তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। 

ডা. মুহাম্মদ মুহসিন খান পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত অসামান্য জ্ঞানের অধিকারী একজন ইসলামী ব্যক্তিত্ব। ১৯২৭ সালে/১৩৪৫ হিজরিতে তিনি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কাসুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা পেতে আফগানিস্তানের কান্দাহার থেকে পাকিস্তানে পাড়ি জমিয়েছিল। 

ডা. মুহসিন লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন ও সার্জারি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫০ সালে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব ওয়ালস থেকে হৃদরোগ বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি গ্রহণ করেন। 

এরপর সৌদির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় তায়েফের মিলিটারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। সেখানকার আল সাদাদ হাসাপাতালের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি মদিনার কিং হাসাপাতালের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ১৯৬১ সালে মদিনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর সেখানের হাসাপাতালের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

সৌদি সরকারে তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত পবিত্র কোরআনের ইংরেজি অনুবাদের সময় ড. তকি উদ্দিন হিলালি ও ডা. মুহাম্মদ মুহসিন একসঙ্গে কাজ করেছেন। এ ছাড়াও ডা. মুহসিন ইসলামের দ্বিতীয় গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ সহিহ আল বুখারির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। 

ডা. মুহসিনের পবিত্র কোরআন ও হাদিসের অনুবাদকর্মে যোগদানের আমেরিকার বিশিষ্ট ইসলামী শিক্ষাবিদ ড. ইয়াসির কাদি  একটি বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, 'মদিনায় আসার পর একদিন ডা. মুহাম্মদ মুহসিন স্বপ্নযোগে স্পষ্টভাবে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-কে দেখতে পান। এরপর তৎকালীন সৌদির গ্র্যান্ড মুফতি ও মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর শায়খ বিন বাজ (রহ.)-কে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেন। বিন বাজ (রহ.) তাঁকে স্বপ্নের ব্যাখ্যায় জানান যে তিনি কোনো এক পন্থায় মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহের সেবা করবেন।'

ডা. মুহসিন খান বর্ণনা করেছেন, 'শায়খের কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। কারণ আমি ইসলামী বিষয়ের কোনো বিশেষজ্ঞ নই। তাছাড়া মেডিসিন নিয়ে সারা জীবন পড়াশোনা করেছি। আমি জানতাম না, আমি কীভাবে সুন্নাহ তথা হাদিস শাস্ত্রের খেদমত করব। এরপর আমার মনে হলো, আমি ইংরেজি ভাষায় খুবই পারদর্শী। অথচ আজ অবধি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ ইংরেজি ভাষায় অনুদিত হয়নি।' এরপর থেকে তিনি নিজের সাধ্যমতো ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের কাজ শুরু করেন। 

ডা. মুহসিন একজন পেশাদার চিকিৎসক ছিলেন। আলেম না হওয়ায় তাঁর অনুবাদকর্মের সহযোগী হিসেবে শায়খ ড. তাকি উদ্দিন হেলালি ছিলেন। ড. তাকি উদ্দিন হেলালি মরক্কো বংশোদ্ভূত গভীর পাণ্ডিত্ব্যের অধিকারী একজন আলেম ছিলেন। ইউরোপে ইসলামিক স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনা করতে যাওয়া প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি। জার্মানিতে নাৎসি শাসনকালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। 

ডা. মুহসিন ও শায়খ তাকি উদ্দিন একসঙ্গে পবিত্র কোরআনের অনুবাদকর্ম সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তা কিং ফাহাদ কমপ্লেক্স থেকে প্রকাশিত হয়। প্রতিবছর পবিত্র কোরআনের এই অনুবাদ এক কোটির বেশি মুদ্রিত হয়। তাঁদের যৌথ উদ্যোগে শেষ হওয়া পবিত্র কোরআনের ইংরেজি অনুবাদ 'দ্য নোবেল কুরআন' গ্রন্থটি হিলালি-খান অনুবাদ হিসেবে বেশ পরিচিত। পরবর্তীতে ডা. মুহসিন একাই পুরো সহিহ বুখারি ও বুলুগ আল মারাম গ্রন্থের অনুবাদ শেষ করেন। 

মহান আল্লাহ ডা. মুহসিনকে তাঁর উত্তম কাজের উত্তম বিনিময় দান করুন এবং জান্নাতে সুউচ্চ মর্যাদায় সমাসীন করুন। 



সাতদিনের সেরা