kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের (রহ.)

একজন নিভৃতচারী আলেমের জীবনালেখ্য

অনলাইন ডেস্ক   

৯ মে, ২০২১ ২০:১৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



একজন নিভৃতচারী আলেমের জীবনালেখ্য

ড. ইউসুফ আল কারাজাভি জেনারেল লাইব্রেরি।

মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের (রহ.)। একজন নিভৃতচারী ও নিষ্ঠাবান আলেম এবং জ্ঞানানুরাগী ও আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর। মহান এ আলেমের জীবনের সিংহভাগ কেটেছে কোরআন-হাদিস, ফিকাহ ও আরবি ভাষার সেবায়।

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া দারুল মা‘আরিফ আল-ইসলামিয়া চট্টগ্রামে দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় তিনি অধ্যাপনা করেছেন। এ সময়ে বহু দেশবরেণ্য আলেম, গবেষক, শিক্ষক ও চিন্তাবিদ গড়ে তুলেছেন।

ইসলামী জ্ঞান-জগতের নানা শাখা-প্রশাখায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। কোরআন-হাদিস, ফিকাহ, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, কবিতা, ইতিহাস, রাজনীতি ও ভূগোলসহ নানা বিষয়ে অত্যন্ত সহজবোধ্য আলোচনা করতেন। অপরিসীম স্নেহ ও আন্তরিকতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের তিনি জ্ঞান জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবক— সব বয়সী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হাসিমাখা বদনে ও আনন্দচিত্তে পাঠদানে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। আদর-সোহাগ ও স্নেহমাখা অনুশাসন আপন করে নিতেন সবাইকে। জ্ঞান জগতে অতলান্তিক গভীরতার এ মহান ডুবুরি ও বিদগ্ধ আলেম গত বছরের ২৬ রমজান মহান রবের সান্নিধ্যে পাড়ি জমান।

মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের (রহ.)-এর মৃত্যুর বর্ষপূর্তিতে তাঁর গুণগ্রাহী ছাত্র *মাওলানা মাহমুদ মুজিব তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন। মরহুম উসতাজের ছাত্র ও অনুরক্তদের জন্য দৈনিক কালের কণ্ঠে তা প্রকাশ করা হলো। [—মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ; সহসম্পাদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ।]

জন্ম ও শিক্ষা : মাওলানা আবু তাহের (রহ.) ১৯৬০ সালে কক্সবাজার জেলার মহেশখালি উপজেলার অন্তর্গত কালাগাজির পাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ফয়জুর রহমান ও মাতা রোকেয়া বেগম। শৈশবে নিজ গ্রামের নুরিয়া মোজাহেরুল উলুম মাদরাসায় প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীতে মহেশখালির জামিয়া আরবিয়া গোরকঘাটা ও আশরাফুল উলুম ঝাপুয়া মাদরাসায় কৃতিত্বের সাথে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতপর চট্টগ্রামের দোহাজারী আজিজিয়া কাসেমুল উলুম মাদরাসায় দুই বছর পড়েন। ১৯৮০ সালে ১৩৯৯-১৪০০ হিজরি শিক্ষাবর্ষে তিনি জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন।

আদর্শ শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি : শিক্ষাজীবন শেষে তিনি দ্বিনি শিক্ষার ব্যাপক প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। শিক্ষকতা জীবনে ক্রমশ তাঁর যোগ্যতা ও জ্ঞানের গভীরতার সুনাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। যেখানেই যতদিন শিক্ষকতা করেছেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-ছাত্র, অভিভাবক সবার কাছেই তিনি অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক হিসেবে ছিলেন।

কর্মজীবন : ১৯৮০ সালে কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত খুরুশকুল মাদরাসায় অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা হয়। এ মাদরাসায় তিনি দীর্ঘ ৮ বছর শিক্ষকতা করেন। ১৯৮৮  সালে দেশবরেণ্য আলেমে আল্লামা মুহাম্মদ  সুলতান যওক নদভীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়ায় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠার সাথে ১৯৮৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি দারুল মা’আরিফে কর্মরত ছিলেন। পঠনপাঠনের পাশাপাশি দক্ষতার সাথে প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। দীর্ঘ তিন দশকের অধ্যাপনাকালে তিনি গ্রন্থাগার, পাঠাগার, শিক্ষা পরিচালনা বিভাগ (তালিমাত), ছাত্রাবাস (দারুল ইক্বামা), সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেছেন। 

সাদাসিধে জীবন : মাওলানা আবু তাহের সবার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। গভীর জ্ঞানের অধিকারী এ মহান শিক্ষক ব্যক্তিজীবনে ছিলেন একদম অকৃত্রিম ও নিষ্কলুষ জীবনের অধিকারী। আচার-ব্যবহারে সততা ও ভদ্রতায় ভাস্বর ছিলেন তিনি। অত্যন্ত শান্ত ও স্থির প্রকৃতির ছিলেন তিনি। সর্বদা সত্য,সততা ও সুন্দরের চর্চা করতেন। ব্যক্তিত্বের দিক থেকে ছিলেন গাম্ভীর্যপূর্ণ অথচ সারল্যভরা সহজ মানুষ। 

লেখালেখি চর্চা : শিক্ষাজীবন থেকেই লেখালেখির প্রতি অনুরাগী ছিলেন তিনি। শিক্ষকতার জীবনে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। পটিয়া মাদরাসায় পড়ার সময় শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুদের স্মরণে আরবি ও উর্দু ভাষায় অনেক কবিতা লিখেছেন বলে জানা যায়। তা ‘শাজুরুন ওয়া তামারুন’ নামে পান্ডুলিপি হিসেবে সংরক্ষিত আছে। তাছাড়া জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক আল হক’ পত্রিকায় ‘দেশে দেশে ইসলাম’ শিরোনামে প্রায় ষাটটি দেশের ইসলাম আগমনের ইতিহাস লিখেছেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন আরবি ও বাংলা মাসিক ম্যাগাজিনগুলো নিয়মিত পড়তেন ও লিখতেন।

সম্পাদনা : লেখালেখির পাশাপাশি সম্পাদনায়ও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সাংস্কৃতিক ফোরাম আন-নাদি আস-সাকাফি আল-ইসলামীর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত দেয়ালিকার প্রায় সবগুলোর সম্পাদনায় মাওলানা আবু তাহের (রহ.)-এর অসামান্য অবদান চির স্মরণীয়। আরবি ও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দেয়ালিকার লেখগুলো তাঁর দক্ষ হাতে সম্পাদনা করা হতো। 

প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ : দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আলেমদের কাছে তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন, হাজি মোহাম্মদ ইউনুস (রহ.), খতিবে আজম আল্লামা সিদ্দিক আহমদ (রহ.), আল্লামা আলি আহমদ বোয়ালভি (রহ.), আল্লামা মুফতি আব্দুর রহমান (রহ.) ও আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী হাফিজাহুল্লাহ প্রমুখ।

উল্লেখযোগ্য ছাত্রবৃন্দ : মাওলানা আবু তাহের (রহ.) দীর্ঘ চার দশক যাবত দুই মাদরাসায় অধ্যাপনা করেন।এ দীর্ঘ সময়ে তাঁর কাছে অসংখ্য ছাত্র সরাসরি শিক্ষা লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামিল মাদানি, মাওলানা এনামুল হক সিরাজ মাদানি, ড. মাওলানা সাদিক হোসাইন, মাওলানা শফিউল্লাহ কুতুবি, মাওলানা আহমদুর রহমান নদভি,  মাওলানা বদরুদ্দিন মাদানি, ড. মাওলানা নূরুল আমিন নুরি,মাওলানা মোহাম্মদ শোয়াইব মক্কি, মাওলানা আফীফ ফুরকান মাদানি এবং মাওলানা মিজানুর রহমান মাদানি প্রমুখ।

ইন্তেকাল : অসংখ্য শিক্ষকের শিক্ষক, মানুষ গড়ার ক্লান্তিহীন এই কারিগর গত বছর ২০ মে (২৬ শে রমজান ১৪৪১ হিজরি) বুধবার সকাল ১১ টায় মহান রবের সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, চার ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য ছাত্র, শিষ্য ও শুভানুধ্যায়ীদের রেখে গেছেন। একই দিন আসরের পর জামেয়া দারুল মাআরিফ প্রাঙ্গণে জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। অতঃপর জামেয়ার মাকবারায় তাঁকে দাফন করা হয়। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে সউচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন! 

*লেখক : শিক্ষক, জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া, চট্টগ্রাম।



সাতদিনের সেরা