kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ১০ আমল

মাওলানা নোমান বিন শামস   

১৭ এপ্রিল, ২০২১ ১১:২১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ১০ আমল

আল্লাহর ক্ষমার মুহূর্তগুলো আমাদের জীবনে বারবার ঘুরেফিরে আসে। রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত অনেক মূল্যবান। মুমিনের জন্য এটি কল্যাণ ও বরকতের বসন্তকাল। তাই একজন মুমিন রমজানের পুরো সময় কাজে লাগাতে পারে। রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি আমল নিন্মে উল্লেখ করা হলো -

এক. তাহাজ্জুদ ও দোয়া : সাহরির আগে যথেষ্ট সময় নিয়ে ঘুম থেকে জাগ্রত হলে বিভিন্ন ইবাদত করা যায়। এ সময় তাহাজ্জুদ ও দোয়ার আমল করা সহজ। আল্লাহ তাআলা মুমিনের গুণাবলি উল্লেখ করে বলেন, ‘তাঁরা শয্যা ত্যাগ করে তাদের রবকে আশা ও ভয় নিয়ে ডাকে এবং আমি তাদের যা দিই তা থেকে তারা ব্যয় করে।’ (সুরা সিজদাহ, আয়াত : ১৬)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজানের প্রথম রাতে শয়তান ও অবাধ্য জিনদেরকে বন্দী করা হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়। এর কোনো দরজা খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাগুলো খোলা হয়। তা আর বন্ধ করা হয় না। একজন ঘোষণা দেন, হে ভালো কাজকারী অগ্রসর হও। হে মন্দ কাজকারী বিরত থাকো। আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতে জাহান্নাম থেকে অসংখ্য মানুষকে মুক্তি দেন।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : হাদিস নং : ৬৮২)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজান মাসের পর সর্বোত্তম মাস মহররম এবং ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ তাহাজ্জুদ।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১১৬৩)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজানে ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রাতে নামাজ আদায় করবে, তাঁর আগের সব গুনাহ মাফ করা হবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩৭)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। এক. ন্যায়পরায়ন শাসক। দুই. রোজাদার যখন ইফতার করে। তিন. নির্যাতিত ব্যক্তির দোয়া। আল্লাহ তাআলা তাদের দোয়া মেঘমালার ওপর তুলে নেন। এর জন্য আকাশের দরজাগুলো খোলা হয়। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেন, আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করব, যদিও সামান্য পরে হয়।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৫২৫)

দুই. সাহরি গ্রহণে বরকত : সাহরি খাওয়া সুন্নত। রাসুল (সা.) রোজাদারকে সাহরি খেতে বলেছেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সাহরি খাও। কেননা, সাহরিতে বরকত আছে। (সহিহ মুসলিম : ১০৯৫)

সুবহে সাদিকের কাছাকাছি সময়ে সাহরি খাওয়া মুস্তাহাব। তবে এত দেরি করা যাবে না যে সুবহে সাদেক হওয়ার আশঙ্কা হয়।

তিন. জামাতে নামাজ আদায়ে বহু গুণ সওয়াব : আজানের আগে থেকে মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়। বাসায় অজু করে মসজিদে যাবে। মসজিদে প্রথমে ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নত। মুয়াজ্জিন আজান দেওয়ার আগ পর্যন্ত দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত বা জিকির করার সুযোগ থাকে। আজানের সময় আজানের জবাব দেওয়া সুন্নত। মুয়াজ্জিনের বাক্যগুলোর পুনরাবৃত্তি করাই আজানের জবাব। আজান শেষ হলে আজানের দোয়া পড়া সুন্নত। এরপর ফরজ নামাজের সুন্নত আদায় করবে। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, একাকী নামাজ আদায়ের চেয়ে জামাতে নামাজ আদায়ে সাত শ গুণ বেশি সওয়াব। (বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৫)

এরপর জামাতের আগ পর্যন্ত জিকির, দুআ ও কোরআন তিলাওয়াতে মনোনিবেশ করবেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নামাজের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তি নামাজে আছেন তথা নামাজে থাকার সওয়াব পাবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪)

চার. ইশরাকের নামাজ আদায় : রমজানে সূর্যোদয়ের অনেক আগেই ফজরের জামাত হয়। তাই জামাতের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত দীর্ঘ সময় থাকে। এ সময় না ঘুমিয়ে কোরআন তিলাওয়াত করা যায়। তা ছাড়া দিনের শুরুর ভাগে নিরিবিলি পরিবেশে মন প্রশান্ত থাকে। সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর ইশরাকের নামাজ পড়া সুন্নত। রাসুল (সা.) দিনের শুরুর অংশের জন্য দোয়া করেছেন। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমার উম্মতকে দিনের শুরুতে বরকত দান করুন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং : ১৩২০)

পাঁচ. ইফতার করালে রোজার সওয়াব : রোজাদারের ইফতারের ব্যবস্থা করা অনেক বড় পুণ্যের কাজ। রমজান মাসের কারণে এর সওয়াব অনেক বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তাআলা জান্নাতিদের গুণাবলি বর্ণনা করেন, ‘খাবারের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তাঁরা অভাবী, এতিম ও বন্দিকে আহার করায়।’ (সুরা দাহর, আয়াত : ৮)

জায়েদ বিন খালেদ আল জুহানি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে সেও অনুরূপ সওয়াব পাবে। রোজাদারের সওয়াব থেকে কোনো অংশ কমানো হবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ৮০৭)

ছয়. দানের বহু গুণ প্রতিদান : দান করা সব সময় পুণ্যের কাজ। আর রমজানে দানের সওয়াব অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। রাসুল (সা.) সর্বদা বেশি দান করতেন। আর রমজানে দানের পরিমাণ আরো বেড়ে যেত। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। আর রমজান মাসে তা আরো বেড়ে যেত। এ সময় জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।

রমজানের প্রতি রাতে জিবরাইল (আ.) মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে কোরআন পাঠ করতেন। এ সময় রাসুল (সা.) প্রবহমান বাতাসের চেয়েও বেশি দান করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬, মুসলিম, হাদিস নং : ২৩০৮)

সাত. কোরআন তেলাওয়াতে সুপারিশ লাভ : রমজান মাস কোরআন তিলাওয়াতের সময়। এ মাসে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রোজা ও কোরআন মানুষের জন্য কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘হে আমার রব, আমি তাকে খাবার ও প্রবৃত্তি পূরণে বাধা দিয়েছি। তাঁর ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কোরআন বলবে, আমি তাঁকে রাতের বেলা ঘুমাতে বাধা দিয়েছি। অতএব তাঁর ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। অতঃপর উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং : ৬৫৮৯)

আট. ওমরা আদায়ে হজের সওয়াব : রমজান মাসে ওমরাহ আদায়ে অনেক সওয়াব। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এক আনসারি নারীকে বলেন, আমার সঙ্গে তুমি হজ পালন করছ না কেন? ওই নারী বলেন, আমাদের উটে করে আমার স্বামী ও ছেলে চলে গেছে। আরেক উটে আমরা যাব। রাসুল (সা.) বলেন, রমজান মাসে তুমি ওমরাহ পালন করবে। কারণ রমজানে ওমরাহ পালন হজের সমতুল্য।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৬৯০, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১২৫৬)

নয়. পাপ ও পরনিন্দা পরিহার : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি (রোজা অবস্থায়) মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ পরিহার করবে না, তার পানাহার পরিহার করা আল্লাহর প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৮০৪)

শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করা : রমজানের ১০ দিন ইতিকাফের অনেক সওয়াব আছে। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) আজীবন প্রতি রমজান মাসের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। তাঁরপর তাঁর স্ত্রীরা ইতিকাফ থাকা শুরু করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ২০২৫, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১১৭১)

 



সাতদিনের সেরা