kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

সিয়েরা লিওন

মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা যে দেশে

আবরার আবদুল্লাহ   

১০ এপ্রিল, ২০২১ ১১:০৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থা যে দেশে

কিপচক মসজিদ, আশগাবাদ, তুর্কমেনিস্তান।

আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন : পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম দেশ সিয়েরা লিওনের সাংবিধানিক নাম সিয়েরা লিওন প্রজাতন্ত্র, যার উত্তরে রয়েছে গিনি, দক্ষিণ-পূর্বে লাইবেরিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর। দেশটির মোট আয়তন ৭১ হাজার ৭৪০ বর্গকিলোমিটার। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান-২০১১ অনুসারে সিয়েরা লিওনের জনসংখ্যা প্রায় ছয় মিলিয়ন। ফ্রিটাউন দেশটির রাজধানী, বৃহত্তম শহর ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি শহর হলো বো, কেনেমা, ম্যাকেনি ও কাইদু। ২৭ এপ্রিল ১৯৬১ যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে সিয়েরা লিওন।

বাংলা অন্যতম সরকারি ভাষা : সিয়েরা লিওন জাতি ও ভাষাবৈচিত্র্যের দেশ। এখানে ১৬টি জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। তবে ‘তেমনে’ ও ‘মেন্দে’ গোত্রই সবচেয়ে প্রভাবশালী। ‘ক্রিও’ দেশটির বেশির ভাগ মানুষের কথ্য ভাষা। দাপ্তরিক ভাষা ইংরেজি। ১২ ডিসেম্বর ২০০২ ভাষা আন্দোলনের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নির্মিত ৫৪ কিলোমিটার সড়ক উদ্বোধনকালে সিয়েরা লিওনের প্রেসিডেন্ট আহমেদ তেজান কাব্বা বাংলাকে অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশি সেনারা দেশটির শান্তি-স্থিতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

খনিজ সম্পদের মধ্যেও দারিদ্রতা : সিয়েরা লিওনের অর্থনীতি খনিজ সম্পদনির্ভর। হীরা, স্বর্ণ, টাইটানিয়াম, বক্সাইট ও রুটাইল দেশটির প্রধান খনিজ সম্পদ। বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ থাকলেও সিয়েরা লিওনের ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। পিউ রিসার্চের তথ্য মতে, সিয়েরা লিওনের ৭৮ শতাংশ নাগরিক মুসলিম। তবে কোনো কোনো গণমাধ্যমে মুসলমানের হার ৬০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধর্মীয় জনগোষ্ঠী খ্রিস্টান। তাদের হার ২০ শতাংশ। অন্যরা প্রাকৃতিক বা আদিবাসী ধর্মে বিশ্বাসী। ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু হলেও সরকার ও প্রশাসনে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী অত্যন্ত প্রভাবশালী। রাষ্ট্রীয়ভাবে সিয়েরা লিওন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।

ষোড়শ শতাব্দিতে মুসলিমদের আগমন : সিয়েরা লিওনে ইসলামের আগমন খ্রিস্টীয় ১৬ শতকে প্রতিবেশী মুসলিম দেশের নাগরিক ও সমুদ্রপথে আগত মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে। আদিবাসী সংস্কৃতি, স্থানীয় মূল্যবোধ ও ইসলামী শিক্ষার প্রসার না থাকায় সিয়েরা লিওনের মুসলিমরা ইসলামচর্চায় পিছিয়ে ছিল। নামে তারা মুসলিম হলেও ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিধান সম্পর্কে খুব বেশি অবগত ছিল না। ১৮ শতকে সংঘটিত ফুতা জালুন যুদ্ধের পর সিয়েরা লিওনে ইসলামী জাগরণ ঘটে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন মুসলিমদের আরো সংহত করে।

ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার : মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মুসলিম দাতব্য সংস্থাগুলোর প্রচেষ্টায় সিয়েরা লিওনে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার বিকাশ ঘটছে। তবে এখনো বেশির ভাগ মুসলিম শিশু সনাতন পদ্ধতিতে শিক্ষাগ্রহণ করে থাকে। তবে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা শুরু হয় কোরআন পাঠ দিয়ে। অন্য বিষয়ে পাঠ করার আগে তারা কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যা পাঠ করে। প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলাম অনুসারে সিয়েরা লিওনে মুসলিম শিক্ষার্থীরা ১৮ বছর বয়সে ধর্মীয় শিক্ষা সমাপ্ত করে। তখন তাদের পাগড়ি প্রদান করা হয় এবং বিশেষ চেয়ারে বসিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করানো হয়। এরপর তারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম হিসেবে নিয়োগ পায়। বলা হয়, সিয়েরা লিওন ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। তবে মুসলিম দাতব্য সংস্থার কার্যক্রম শহরাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ আছে। গ্রাম ও বনাঞ্চলের মুসলিমরা এখনো প্রাচীন কুসংস্কার ও বিশ্বাসে আচ্ছন্ন।

মসজিদ ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার দেশ : সিয়েরা লিওনের প্রায় প্রতিটি গ্রামে ছোট-বড় মসজিদ রয়েছে। মসজিদগুলো ধর্মীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় সালিস-বিচার, বিয়ে, তালাক, জানাজা-দাফন, চিকিৎসাসেবা প্রদান, ইসলাম প্রচারের কাজগুলো মসজিদেই হয়ে থাকে। জাকাত ব্যবস্থাপনায় মসজিদগুলোর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে দেশটিতে। সব মিলিয়ে সিয়েরা লিওনকে মসজিদভিত্তিক সমাজব্যবস্থার দেশ বলা যায়।

তথ্যসূত্র : মালুমাত ও উইকিপিডিয়া



সাতদিনের সেরা