kalerkantho

মঙ্গলবার। ৫ মাঘ ১৪২৭। ১৯ জানুয়ারি ২০২১। ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ইরিত্রিয়া

মদিনার আগে মুসলিমরা যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন

আবরার আবদুল্লাহ   

২ ডিসেম্বর, ২০২০ ১২:৪৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মদিনার আগে মুসলিমরা যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন

খুলাফা আল রাশেদিন মসজিদ, আসমারা, ইরিত্রিয়া

ইরিত্রিয়ায় ইসলামের আগমন : পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইসলামের নাম জড়িয়ে আছে সুপ্রাচীন কাল থেকে। মক্কায় ইসলামের আবির্ভাবের পর তা মদিনায় পৌঁছানোর আগেই পৌঁছে যায় ইরিত্রিয়ায়। ঐতিহাসিকদের দাবি, মক্কার মুশরিকদের অত্যাচার থেকে আত্মরক্ষার জন্য সাহাবিরা আফ্রিকার যে ভূমিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, ইসলামের ইতিহাসে যা আবিসিনিয়া নামে খ্যাত তা ছিল আধুনিক ইরিত্রিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল। নবুয়তের পঞ্চম ও দশম বছর দুই দফায় সাহাবিরা হাবশায় হিজরত করেন।

ইরিত্রিয়ায় ৬১৪ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের আগমন হয়। যখন সাহাবিরা মক্কার মুশরিকদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে হাবশা বা আবিসিনিয়া হিজরত করেন। ইরিত্রিয়ার ‘আসব’ শহরে তৎকালীন বাদশা নাজ্জাসির তৈরি অবকাঠামোর প্রমাণ পেয়েছেন ঐতিহাসিকরা। মাসওয়া অঞ্চলের অধিবাসীদের দাবি সাহাবিদের নৌকা সেখানে ভিড়েছিল। কেননা সেখানে ‘আমাতরিয়া’ নামক একটি গ্রাম আছে, যা সাহাবিদের ‘আমা তারা’ বাক্য থেকে নেওয়া হয়েছে।

মুসলিম জনসংখ্যা : বিশ্ব ইতিহাসের প্রাচীন ভূমি ইরিত্রিয়ায় মুসলিমদের দীর্ঘ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। বর্তমানে দেশটির মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। পিউ রিসার্চের বর্ণনা মতে, মুসলিমদের সংখ্যা ৩৬.৬ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের মতে তা ৪৮ শতাংশ এবং এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় মুসলিমদের হার ৫০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। জনসংখ্যা গবেষকদের দাবি ইরিত্রিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ছে।

ইরিত্রিয়ার পরিচিতি : ইরিত্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘স্টেট অব ইরিত্রিয়া’। রাজধানী আসমারা। এর দক্ষিণে আছে ইথিওপিয়া, পশ্চিমে সুদান, দক্ষিণ-পূর্বে জিবুতি, পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে লোহিত সাগর। ইরিত্রিয়ায় মোট আয়তন এক লাখ ১৭ হাজার ছয় শ বর্গকিলোমিটার। এখানে বসবাস করে অসংখ্য ছোট ও বড় উপজাতি। প্রাণী ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দেশ ইরিত্রিয়া খনিজ সম্পদেও সমৃদ্ধ। খনিজ সম্পদের মধ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য, দস্তা, তামা, পটাশ, গ্রানাইট, মার্বেল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ইরিত্রিয়া বিশ্বের দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্যতম। দেশটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৫ থেকে ৮.২ শতাংশ। তবে দেশটির কর্মক্ষম মানুষের ৭০ শতাংশ এখনো কৃষিখাতে নিয়োজিত। 

প্রাচীন প্রত্নতত্ত্বের সন্ধান :  ইরিত্রিয়া মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ভূমি। দেশটির দক্ষিণ মাসওয়ার জুলা উপকূলে এক লাখ ২৫ হাজার বছর আগের প্রাচীন নগরের সন্ধান পাওয়া গেছে। কুহাইতো নামক প্রাচীন নগরটি প্রস্তর যুগের বলে ধারণা করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব সময়ে ইরিত্রিয়া মিসরের ‘ল্যান্ড অব পান্ট’ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে তা দামত, আকসুম ও মেডরি ভারি সাম্রাজ্যের শাসনাধীন হয়। ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে ইরিত্রিয়া ইথিওপিয়ার আউসসা সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এ সময় আধুনিক ইরিত্রিয়া মাসওয়াসহ কিছু অঞ্চল উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসনাধীনও হয়। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ইরিত্রিয়া ইতালিয়ান উপনিবেশ এবং ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৪ মে ১৯৯১ ইথিওপিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।

মুসলিম শাসন : ৮৩ হিজরিতে ইথিওপিয়ান জলদস্যুরা আরব উপদ্বীপে হামলা করলে উমাইয়া শাসকরা দাহলাক দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নেন। পরবর্তী সময়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ পর্যন্ত প্রসারিত হয়। পরে আরব ও মুসলিম অঞ্চলের সঙ্গে ইরিত্রিয়ার ব্যাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চল মুসলিমদের শাসনাধীন হওয়ায় ইরিত্রিয়ায় ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে। মিসর, সুদান ও আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন মুসলিম গোত্র বিভিন্ন সময় ইরিত্রিয়ায় বসতি স্থাপন করে। ইরিত্রিয়ায় ইসলাম প্রচারে বিশেষ ভূমিকা রাখেন শায়খ আহমদ বানাফৌতি (১০১০ হি.) এবং তাঁর অধীন শায়খ হামিদ, যিনি শায়খুল আসাদ নামে খ্যাত। তবে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বিদেশি শক্তির আগ্রাসন এবং অনুপ্রবেশের সময় মুসলিম গোত্রগুলোকে ইরিত্রিয়া থেকে উচ্ছেদ করা হয়। ইরিত্রিয়ান মুসলিম নেতা আবদুল কাদের মুহাম্মদ সালিহ ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।

বর্তমান মুসলিমদের অবস্থা : বর্তমানে ইরিত্রিয়ায় মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ছে। তবে অমুসলিম শাসিত এ দেশে মুসলিমদের সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর দাবি মুসলমানের সংখ্যা ৩৬ থেকে ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে আরব গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধে তা ৬৮ থেকে ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে। তবে ইসলাম ইরিত্রিয়ার রাষ্ট্র স্বীকৃত পাঁচটি ধর্মের অন্যতম এবং মুসলিমদের ভাষা আরবিও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত। ইরিত্রিয়ান মুসলিমদের শিক্ষার হার অত্যন্ত কম এবং তাদের বেশির ভাগ দরিদ্র। তবে দিন দিন মুসলিমদের শিক্ষাসচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা