kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

একটি নৈশভোজ, কিছু পশ্চিমা মুখ, আয়া সোফিয়া জাদুঘর হয়ে গেল!

অনলাইন ডেস্ক   

৮ আগস্ট, ২০২০ ১৫:১৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



একটি নৈশভোজ, কিছু পশ্চিমা মুখ, আয়া সোফিয়া জাদুঘর হয়ে গেল!

সম্প্রতি ব্রিটেনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম‘ মিডলইস্ট আই’-এ আয়া সোফিয়া মসজিদ থেকে জাদুঘরে রূপান্তরের ইতিবৃত্তি উল্লেখ করে তুরস্কের সাংবাদিক ইলদিরায় উগুরের (Yildiray Ogur) একটি লেখা প্রকাশ পায়। এতে তিনি আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গসহ ওই সময়ের গোয়েন্দাদের সম্পৃক্ত থাকার সম্ভাব্যতার বিষয়টি তুলে ধরেন।

সোফিয়াকে জাদুঘর করার ভাবনা নিয়ে সর্বপ্রথম বৈঠক হয় ১৯২৯ সালে ১২ জুন। ইস্তাম্বুলের ইসতেকলাল রোডের টোকাটলিয়ান হোটেলে আমেরিকার চার জন বিখ্যাত ধনী লোক মিলিত হন। ‘দি বাইজান্টাইন ইনস্টিটিউট অব আমেরিকা’এর পক্ষ থেকে সে দিন একটি নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এসবের মূলে ছিলেন বাইজান্টাইন শিল্পের অনুরাগী, আমেরিকান শিক্ষাবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদ টোমাস হোয়াইটমার (Thomas Whittemore)।

সম্পর্ক বিস্তার : হোয়াইটমোরের সঙ্গে আমেরিকার ধনী ব্যক্তিবর্গ থেকে রাশিয়ার প্রিন্সদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হেনরি মেটিস ও সাহিত্য সমালোচক গেটরু স্টেইনের সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। বড় ক্যাপ পরা ও ক্যাপের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা জন্য সবার কাছে পরিচিত ছিলেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে তিনি সমকামী ও নিরামিষভোজী ছিলেন।

গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে পৃথিবীর সব দেশে চলছিল নানা রকম সংকট। এ সময় আমেরিকার ধনী ব্যক্তিদের ইস্তাম্বুলে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের শিল্পকলা সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল হোয়াইটমোর। মিডলইস্ট আইয়ের বর্ণনা মতে, তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল, দুবছর পর তিনি আঙ্কারা কর্তপক্ষের কাছ থেকে আয়া সোফিয়ায় আবৃত থাকা বাইজান্টাইন চিত্রকলা উম্মুক্ত করার অনুমোদন লাভ করেন।

নতুন তুরস্কের সঙ্গে আমেরিকার পথচলা : ১৯৩১ সালের ৭ জুন আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্ক ও তুরস্কের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী জেনারেল ইসমাত আনানুর সম্মতিতে তুরস্কের মন্ত্রীসভা সেখানে কাজের অনুমোদন প্রদান করেন। বাইজান্টাইন আর্কাইভের বর্ণনা মতে, অনুমোদন লাভের ক্ষেত্রে আঙ্কারায় নিযুক্ত আমেরিকার দূত জোসেফ গ্রেও (Joseph Grew) জোরালো ভূমিকা পালন করেন। গ্রেও ও আতাতুর্কের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া ছিল। ১৯২৭ সালে আমেরিকার জনগনের সঙ্গে ‘নতুন তুরস্ক’কে পরিচয় করিয়ে দিতে ব্যাপক কাজ করে। এ সময় তোলা উভয়ের একটি বিখ্যাত ছবিও আছে।

এছাড়াও ওই সময় তুরস্কের পুরোনো শত্রু গ্রিসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইলেফথেরিয়াস ক্রিয়াকুউ ভেনিজেলোস তুরস্কের খুবই ঘনিষ্ঠ হয়। ভেনিজেলোস আঙ্কারা পরিদর্শনের পর ১৯৩০ সালে আঙ্কারা ও এথেন্স একটি শান্তি ও সহযোগিতামূলক চুক্তি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ভেনিজেলোস আতাতুর্ককে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিল। তখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরির জন্য তুরস্ক ‘লিগ অব ন্যাশন’-এ যুক্ত হতে যাচ্ছিল।

আয়া সোফিয়ায় বাইজান্টাইন চিত্রকলা উম্মুক্তের অনুমোদন দেওয়ায় পুরো ইউরোপ তুরস্ককে অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় সাধুবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু এত কিছু হওয়ার পরও তুরস্কের জনগন এ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। বরং তুরস্কের স্থানীয় পত্রিকাগুলো প্রজ্ঞাপন জারির দুই মাস পর আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন থেকে জানতে পারে।

ভেতরের মোজাইক পাথর উম্মুক্তকরণ : একই দিন তুরস্কের সংবাদপত্রে দুজন আমেরিকান বিমানচালকের ইস্তাম্বুল আগমনের সংবাদ প্রকাশ পায়। সেদিন কামাল আতাতুর্কের পক্ষ থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে একটি চিঠি প্রেরণ করা হয়। তাতে স্থানীয় দায়িত্বশীলের পক্ষ থেকে বলা হয়, আয়া সোফিয়ার মোজাইকের কারুকার্যের দরুন মসজিদের বৈশিষ্ট নষ্ট হবে না।

প্রথম বছর হোয়াইটমোর ও তাঁর সহযোগিরা কেবল হলরুমের মোজাইক পাথরের কারুকর্য উম্মুক্ত করে। কিন্তু তখনও সেখানে নামাজ চলতে থাকে। অতঃপর প্রশ্ন আসল, কীভাবে তারা মসজিদের পাশে মোজাইকের কারুকার্য উম্মুক্ত করল?

অতঃপর তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের পক্ষ থেকে তাঁর কন্যা জেহরা হোয়াইটমোরকে আঙ্কারায় ঐতিহাসিক সম্মেলনের আমন্ত্রণ জানায়। ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। তাদের শান্ত করতে বাইজেন্টাইন ইনস্টিটিউটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা হালিল ইথিম (Halil Ethem) হোয়াইটমোরের সঙ্গে সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে বলেন, মসজিদের কোনো ক্ষতি হবে না। তাছাড়া ইসলামে মূলত কারুকার্য নিষিদ্ধ নয়।

জাদুঘর করার নির্দেশনা : ১৯৩৪ সালের ২৫ আগস্ট তুরস্কে সরকারিভাবে আয়া সোফিয়াকে জাদুঘরে রূপান্তর বিষয়ে একটি চিঠি লেখা হয়। তুরস্কের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আবিদিন উজমেনের (Abidin Ozmen) পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর তা লিখা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ মৌখিক নির্দেশনার অংশ হিসেবে আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর হিসেবে রূপান্তরের পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী তখনই একটি কমিশন গঠন করে এবং দুই দিনের মধ্যে তা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেয়।

১৯৪৯ সালে অবসর গ্রহণের পর উজমেন ওই নির্দেশনার আসল কথা প্রকাশ করে। আয়া সোফিয়ার মহাব্যবস্থাপক মুজাফফার রামাজানগুলের সঙ্গে সাক্ষাতকালে ওই নির্দেশনাটি দিয়ে অফিসিয়াল ভাষায় বলা হয়, ‘আতাতুর্কের বিশেষ নির্দেশনা হলো, আয়া সোফিয়া কেবল একটি ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ‍গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকার বিষয়টি পরিবর্তন করা হয়েছে। এটিকে এখন জাদুঘর বানিয়ে সব ধর্মের মানুষের জন্যে উম্মুক্ত করা জরুরি।’

আয়া সোফিয়ার আকস্মিক পরিবর্তন সবাইকে বর্জ্রপাতের মতো আঘাত করে। এমন সিদ্ধান্তে সবাই হতবাক হয়ে পড়ে। এমনকি প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের তথ্য মতে, তৎকালীন তুরস্ক জাদুঘরের পরিচালক নিজেও এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তাই সবার কাছ থেকেই এ বিষয়ে প্রতিবাদ আসা শুরু হয়।

এমনকি কামাল আতাতুর্কের সমর্থক পত্রিকা ‘দৈনিক জুমহুরিয়াত’ (Cumhuriyet) এর প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত প্রবন্ধে বলা  হয়, ‘আমরা পত্রিকা পড়ে জানতে পারি, আয়া সোফিয়া জাদুঘর হয়েছে। এমন সংবাদ শুনে আমরা খুবই হতবাক। নিজেদেরই আমরা প্রশ্ন করি, কোন জাদুঘর এটি? অথচ আয়া সোফিয়া নিজেই এতদিন সবচেয়ে সুন্দর ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে বিদ্যমান ছিল। একটি ঐতিহাসিক স্থাপনাকে জাদুঘর করার যৌক্তিকতা আমাদের জানা নেই।’

পরিবর্তনের মূল কারণ কী : অতঃপর ১৯৩৪ সালের ২৪ নভেম্বর তুরস্কের মন্ত্রীসভা আয়া সোফিয়া পরিবর্তনের আইন প্রকাশ করে। নতুন এ আইন দ্বারা পশ্চিমাবিশ্ব বিশেষত আমেরিকা সবচেয়ে বেশি খুশী হয়।

বিশেষ কোন কারণে আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর হয়? এ বিষয়ে নানা জনের নানা মত আছে। অনেকের মতে, এ পরিবর্তনের মাধ্যমে পশ্চিমাবিশ্বের জন্য বিশেষত যুক্তরাষ্টের জন্য বিশেষ বার্তা ছিল। তা হলো তুরস্কের নতুন শাসক ধর্মনিরপেক্ষ ও শান্তিপ্রিয়। আবার অনেকের মতে, এটি বলকান চুক্তির এটি শর্ত ছিল যা একই বছর রোমানিয়ার সঙ্গে যুগোস্লাভিয়া ও রোমানিয়ার মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল।

১৯৪০ সালে শেষ পর্যন্ত হোয়াইটমোর বিভিন্ন চার্চের মোজাইকের কারুকার্য উম্মুক্তের কাজ অব্যাহত রাখে। তার বিশেষ তৎপরতায় আয়া সোফিয়ার সব কারুকার্য উম্মুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এলেন ড্যুালাসের সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাওয়ার পথে মারা যায়। মৃত্যুকালে তাঁর হাতে আয়া সোফিয়ার কারুকার্যের একটি এ্যালবাম ছিল। তাই অনেকে মনে করে, সে নিজেও সিআইএ –এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ ছিল।

চার দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসা একটি মসজিদকে হঠাৎকরে জাদুঘর করা মুসলিম অধ্যুষিত একটি সমাজের জন্য খুবই বেদনাদায়ক ছিল। তাছাড়া কারো প্রতিবাদ ছাড়াই এমন পরিবর্তন মুসলিমদের অন্তরে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

১৯৩৪ সালের বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি দীর্ঘ ৮৬ বছর পর এখনও সবার মনে আছে। তদুপরি তুরস্কের সরকার এ বিষয়ে দুই দশক ধরে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। বরং আগে এ বিষয়ে সাধারণ লোকের সচেতন হওয়াকে জরুরি মনে করে। তাই দীর্ঘকাল এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তবে জনসাধরণ নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে সচেষ্ট ছিল।

সূত্র : মিডলইস্ট আই ও আল জাজিরা ডটনেট (আরবি)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা