kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

খাদ্যে ভেজাল দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে

ড. মো. আনিসুজ্জামান

২৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



খাদ্যে ভেজাল দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে

প্রাণিজগতের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তার সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে মানুষ। আগুন আবিষ্কারের পর মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার পরিধির আরো বিস্তৃতি ঘটে। যেসব খাবারে জীবাণু থাকে, সেসব খাবারও মানুষ খায় আগুনে সিদ্ধ করে। একই খাবার বিভিন্নভাবে গ্রহণের কৌশল উদ্ভাবন করেছে মানুষ। এক আলু কতভাবে খাওয়া হচ্ছে। পৃথিবীর অনেক দেশে আলু প্রধান খাদ্য। আমরা এখনো আলুকে সবজি হিসেবে খাচ্ছি। ফ্র্যাঞ্জফ্রাইয়ের চাহিদা শহরভিত্তিক ইউরোপ-আমেরিকা সংস্কৃতি প্রভাবিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটু বেশি। শাক, সবজি, উদ্ভিদ, ফল, মূল, মাছ, মাংস কোনো কিছুই মানুষের খাদ্যতালিকার বাইরে নেই। অন্য প্রাণীদের মধ্যে মাংসাশী প্রাণী শুধু মাংসই খায়। তৃণভোজীরা অন্য কোনো খাবার খায় না। একমাত্র মানুষ সর্বভুক। মানুষ শুধু খায় না, ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে। উন্নত বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা উৎকৃষ্ট। তৃতীয় বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর খাদ্য নিরাপত্তার বেহাল দশা। পোস্ট হিউম্যানের যুগে তৃতীয় বিশ্বের বহু মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। দুর্ভিক্ষে, খাদ্যাভাবে বহু মানুষ পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। পুষ্টিহীন শিশুর নিথর দেহ এখনো রাস্তায় দেখা যায়।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মানুষ অন্য প্রাণীর ওপর কর্তৃত্ব করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। পৃথিবীতে মানব প্রজাতির সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার পেছনে রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। উন্নত বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা বেষ্টনী অনেক বড়। সে কারণে তারা দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর সহজে কর্তৃত্ব করে। খাদ্য অবরোধ সৃষ্টি করার প্রক্রিয়া নতুন নয়। খাদ্য নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। বাংলাদেশে ১৯৭৪-৭৫ সালে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ছিল না। ফলে সরকারের অবস্থান দুর্বল হয়। বিরোধী শক্তি সরকারের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর আঘাত হানে। তারা সফল হয় এবং দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল।

বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু নিরাপত্তার আড়ালে চলছে মানবঘাতী প্রক্রিয়া। ভেজাল খাদ্যের খবর মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনি প্রক্রিয়ায় জরিমানা করে। কিন্তু খাদ্যে ভেজালের পরিমাণ কমে না। শহরের অভিজাত রেস্টুরেন্ট থেকে গ্রামের মুদি দোকান পর্যন্ত ভেজালমুক্ত নয়। খাবার হোটেলের রান্নাঘরে ঢুকলে দেখা যায় আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা কোন পর্যায়ে! ভেজাল খাদ্য, বিষাক্ত খাদ্য বাজারজাত করার জন্য বাংলাদেশে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। একজন চিকিৎসক একবার একান্তে বলেছিলেন, উন্নত বিশ্বে হলে অনেক ব্যবসায়ীর নাম  পাথরে খোদাই করে লিখে দেওয়া হতো আর যা করেই খাও এই ব্যবসার জন্য তোমরা অযোগ্য। বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর জন্য কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কখনো অযোগ্য ঘোষণা করা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ১০ টাকায় চা, শিঙাড়া পাওয়া গেলেও তা মানসম্মত কি না কখনো পরীক্ষা করা হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদুল্লাহ ও মমতাজউদ্দিন কলাভবনের পেছনের খাবার দোকানের চেহারা দেখলে খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন করা অবান্তর হয়ে দাঁড়ায়।

কৃষক ধানের মূল্য পাচ্ছে না। শ্রমিকের অভাবে ধান কাটা এবং মাড়াইয়ে সমস্যা হচ্ছে। এবার হাইব্রিড, তেজগুল এবং ছক্কা ধানের উৎপাদন শেরপুর অঞ্চলে বেশি হয়েছে। কিন্তু বাজারে এই ধানের চাল পাওয়া যায় না। ঢাকা শহরে ছক্কা ধানের চাল এক কেজিও নেই। মিনিকেট ধান কোন অঞ্চলে উৎপাদিত হয় জানি না। কিন্তু বাজারে সব দোকানেই মিনিকেট চাল পাওয়া যায়। যতটুকু জানি মিনিকেট নামে কোনো ধান নেই। ধান না থাকলে চাল আসে কোথা থেকে? দেশি প্রজাতির মাছ এখন স্বপ্নের বিষয়। স্বপ্নের মাছও মাঝেমধ্যে পচা থাকে। জরিমানাও হয়েছে। কিন্তু মাছ বিক্রির জন্য স্বপ্নকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়নি। আগে দুধে পানি মেশানো হতো। এখন দুধে পানি থাকে, দুধ থাকে না। আমার এক বন্ধু রসিকতা করে বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর মহিষ আর মহিষ থাকে না। সব গরু হয়ে যায়। ঢাকা শহরে মহিষের মাংস পাওয়া যায় না। অথচ উত্তরবঙ্গ থেকে প্রতিদিন মহিষের ট্রাক ঢাকার দিকে যায়। নামিদামি ব্র্যান্ডের ক্রিম তৈরি হয় পুরান ঢাকায়। বাংলাদেশে ভেজাল নেই কোথায়? কাপড় কিনবেন পাকা রং দেখে, একবার ওয়াশেই শখের কাপড় অন্য রং ধারণ করে। বাসে ভ্রমণ করবেন, ফিটনেসবিহীন গাড়িতে হিনো সাইনবোর্ড ঝোলানো থাকে। সিটিং সার্ভিস গাড়ির ডেসবোর্ড পর্যন্ত থাকে না। সার্টিফিকেট নেই ডাক্তারি করছেন, প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন। তিন-চারজন শিক্ষক দিয়ে চলছে ইন্টারমিডিয়েট থেকে সম্মান এবং এমএ শ্রেণির পাঠদান। ভেজাল নেই কোথায়? কন্ট্রাক্টর রাস্তা নির্মাণের আগেই ভেঙে যাবে। সেতু নির্মাণ করা হবে রাস্তা থাকবে না। স্কুল থাকবে ছাত্র থাকবে না। কলেজ থাকবে, শিক্ষক-ছাত্র সবই থাকবে, ক্লাস হবে না। হাসপাতাল থাকবে, চিকিৎসক, নার্স ডিউটিতে অনুপস্থিত। ভেজালের দুনিয়ায় বসবাস।

রাজনীতি, সংস্কৃতি সবই ডিফিকাল্ট। ছাত্রত্বহীন ছাত্ররাজনীতি। মূল দলের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলে ছাত্রসংগঠনগুলো। শিক্ষার্থীদের ভালো-মন্দ দেখার চেয়ে মূল দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা ছাত্রসংগঠনগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য। পকেটমার থেকে জমিজমা, বাড়ি দখল চলছে। ব্যাংকে আমানতকারীরা নিরাপদ নয়। কখন কোন ব্যাংক রুগ্ণ হয় বলা যায় না। থিসিস জালিয়াতি, প্রবন্ধ-নিবন্ধ নকলপ্রবণতা থেমে নেই। ভুল তথ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে নীতি-আদর্শের কথা বলতে কারো কোনো অনুশোচনা নেই। দু-একটি ভেজাল পণ্য হলে বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সবই যদি ভেজাল হয়, কম্বল আর থাকে না।

মানুষ বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে কোন প্রক্রিয়ায় ভেজাল পণ্য বাজারে বিক্রি করে সহজে মুনাফা করা যায় তার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেছে। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় এসেছে। কিন্তু আমরা কী খাচ্ছি? আমাদের খাদ্যে পুষ্টিমান কতটুকু? খাদ্য নিরাপত্তায় ভেজালমুক্ত বিশুদ্ধ খাদ্য কতটুকু? ব্রয়লার মুরগিতে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম থাকে। মাছের খাদ্য নিরাপদ নয়। শাক, সবজি, ফলমূল মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকমুক্ত নয়। ওয়াসার পানির বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওয়াসার পানি নিয়মিত পান করলে যে কেউ জন্ডিস, ডায়রিয়া থেকে শুরু করে নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হতে বাধ্য। শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে বোতলজাত পানি খাওয়া সম্ভব নয়। শ্রমজীবী মানুষ পানিবাহিত রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। ৫২টি পণ্যের মধ্যে আয়োডিনযুক্ত মোল্লা সল্ট রয়েছে। বিজ্ঞাপনে দেখেছি মোল্লা সল্ট খাওয়ার পর শিশুর বুদ্ধি বৃদ্ধি পায়। এসিআইয়ের আয়োডিনযুক্ত লবণ আমার ঘরে এখনো এক কেজি আছে। বুদ্ধি বৃদ্ধি করার জন্য খাদ্যতালিকায় রেখেছিলাম। এখন দেখছি ভেজাল? এই ভেজালের মহাসাগরে দু-এক ফোঁটা জল অপসারণ করে বিশুদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তার দেয়াল নির্মাণ করা সম্ভব নয়। শুধু দোকান থেকে দু-তিন কেজি পচা মাছ, মাংস উদ্ধার করেও বিশুদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। পবিত্র রমজান মাসে ভেজাল খাদ্য বন্ধ হয়নি। সারা দিন রোজা রেখে দিনের শেষে ইফতারির সঙ্গে একটু খেজুর, সেখানেও ভেজাল। হাজার মণ পচা খেজুর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে। আরো কত হাজার মণ পচা খেজুর বাজারে আছে কে জানে?

রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অচলাবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের অসততা—এসব মনুষ্য সৃষ্ট দুর্নীতি, দুর্যোগ দূর করা সম্ভব। সরকারের সততা এবং সদিচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নির্ভর করে। কিন্তু খাদ্যে ভেজাল, সব দূষণ-দুর্নীতি এমনকি জঙ্গিদের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।

মানুষকে ধীরে ধীরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় খাদ্যে ভেজাল দিয়ে। তা ছাড়া প্রতিদিন ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে মানুষের কর্মক্ষমতা লোপ পায়। সৃজনশীল চিন্তাশক্তি কমে যায়। চিন্তায়, কর্মে পরনির্ভরশীল হয়ে যায় কোনো জাতি। এমন মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং নিরাপত্তাবোধ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব দেখা দেয়। এমনকি বিশুদ্ধ খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে কোনো জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তি ঘটতে পারে। এটা শুনতে হাস্যকর হলেও ইতিহাসে এর প্রমাণ অনেক আছে। ক্রমাগত ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে এই অঞ্চলের মানুষের কর্মক্ষমতা এবং জীবনীশক্তি কমে গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। ফলে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার কথা বক্তৃতায় শ্রুতিমধুর শোনা গেলেও বাস্তবে এই অঞ্চলের মানুষ মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে বিদেশে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। গ্রামের মানুষের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শেষ ভরসা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য