kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

সমীক্ষায় এগিয়ে বিজেপি বিস্ময়ের অপেক্ষায় ভারত

বাহার উদ্দিন

২৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সমীক্ষায় এগিয়ে বিজেপি বিস্ময়ের অপেক্ষায় ভারত

আমি আগেই একাধিকবার বলেছি, ভারতের সপ্তদশ লোকসভা ভোটের ফল সব দলের হিসাবের বাইরে। বেরিয়ে অন্য রকম বিস্ময় তৈরি করবে। এ রকম ইঙ্গিত এখনই মিলতে শুরু করল। সাত দফার ভোটপর্ব শেষ হয় ১৯ মে, বিকেল ৫টায়। সঙ্গে সঙ্গে, ঠিক সন্ধ্যা ৬টা থেকে বুথফেরত সমীক্ষার আভাস বলতে লাগল বিভিন্ন সংস্থা। প্রায় সবাই সরাসরি জানিয়ে দিল, ২৭২-এরও বেশি আসন নিয়ে ফিরে আসছে বিজেপি। শরিক দলগুলোর শক্তিসহ ৩০০ থেকে ৩৬৫ পেরিয়ে যাবে। ইউপিএ অথবা আঞ্চলিক দলগুলো পড়ে থাকল অনেক অনেক পেছনে। বাংলায় মমতার প্রবল জনপ্রিয়তাকেও দাঁড় করিয়ে দিল প্রশ্নের সম্মুখে। কেউ বলল, ৪২ আসনের মধ্যে ২৪টি বিজেপি দখল করবে। কেউ কেউ ভিন্ন হিসাব পেশ করে জানাতে লাগল, এখানে বিজেপি অন্তত ১৬টি লোকসভা কেন্দ্রে জিতছেই। বাংলারই অন্য একটি সংস্থার সমীক্ষা ১১ আসনে মমতার দল হারছে। একটিমাত্র সংস্থা শুধু বলল, তৃণমূলের জয় বাড়বে। ৩৬ থেকে ৩৮ হতে পারে। বিজেপি পাবে বড়জোর পাঁচটি। কংগ্রেস একটি, বাম শিবির শূন্য।

ভোটের আগে, ভোট পর্বে বিজেপির বিস্ময়কর জয়ের ইঙ্গিত কেউ দেয়নি। বিজেপিও বলেনি। হ্যাঁ, তাদের দিনরাতের পরিশ্রম উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। দেশজুড়ে চষে বেড়িয়েছেন নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহ। লড়াকু মমতার সঙ্গে টক্কর দিতে বাংলায় তাঁরা ৫০টির বেশি সভা করেছেন। আর মমতা? ৪২ আসনে একাই বারবার। গরম, রটনা, উসকানিকে তোয়াক্কা করেননি। বাংলার ঐতিহ্যের অঙ্গীকারকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে জনসমুদ্রের সামনে তাঁর ভাষণ, প্রধানমন্ত্রীকে দুঃসাহসী আক্রমণ, আক্রমণের অনাকাঙ্ক্ষিত ভাষা প্রয়োগে কখনো কখনো বেসামাল—বিজেপি বাংলায় ঢুকতে চাইছে, গ্রামে-গঞ্জে প্ররোচনা তৈরি করছে, মেরুকরণের নামে বিভাজনের ছক কষছে, বিজেপিকে কোথাও কোথাও মদদ জোগাচ্ছে স্থানীয় বিরোধীরা। এ রকম সব ব্যাপারেই সতর্ক, তীক্ষ নজর রেখেছেন মমতা। বলেছেন, বিজেপি ‘শূন্য’ পাবে। ২২-এর ৪২ আমরাই দখল করব। তাঁর সব আত্মবিশ্বাস, বিশ্বাসের বাস্তবতাকে গুঁড়িয়ে দিল কয়েকটির এগজিট পোল। মমতা বলেছেন, এসব গসিপ, ভিত্তিহীন। সর্বভারতীয় স্তরের বিরোধী ঐক্য কিংবা ফেডারেল জোটও আগাম ইঙ্গিত উড়িয়ে দিয়েছে। কে যেন বলেছে, এগজিট পোল এগজেট পোল নয়। আশার ওপর ভরসা করেই মহাজোটের বৈঠক ডেকেছেন ইউপিএর চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী। নিজেদের মধ্যে কথা বলেছেন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শারদ পাওয়ার আর অন্ধ্রের মুখমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু। চুপচাপ বসে নেই উত্তর প্রদেশের দুই সাবেক সরকারপ্রধান অখিলেশ যাদব আর মায়াবতী। অখিলেশ মমতাকে ফোন করে বলেছেন, উত্তর প্রদেশে অন্তত ৫০ আসন মহাজোট পাচ্ছেই। চন্দ্রবাবু নাইডু ২০ মে, ছুটে এলেন কলকাতায়। মমতার সঙ্গে কথা বললেন বহুক্ষণ। এগজিট পোলের সমীক্ষায় বিজেপি প্রথমে ঢাকঢোল বাজাতে থাকে। ভিড় বাড়ল দলের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক অফিসগুলোতে। সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়ে গেল। কোনো কোনো সংস্থা স্বরাষ্ট্রে অমিত শাহ, বিদেশ মন্ত্রকে নির্মলা সীতারামন, অর্থ মন্ত্রকে পীযূষ গোয়েল, প্রতিরক্ষায় রাজনাথ সিং, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন মন্ত্রকে অসমের বিতর্কিত হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে বসিয়ে দিয়ে মনগড়া হিসাব কষল। বিজেপি এসব জল্পনাকে আমল দেয়নি। বুথফেরত সমীক্ষা নিয়ে তাদের অনেকেই সংশয়াচ্ছন্ন। যেমন নীতিন গড়কড়ি। বলেছেন প্রকাশ্যে, বুথফেরত সমীক্ষা চূড়ান্ত অঙ্ক নয়। নেহাত একটি ইঙ্গিত মিলতে পারে। না-ও পারে। দিল্লিতে রাজনাথ সিং আর সুষমা কথা বলেছেন। সমীক্ষার আভাস নিয়ে একটি বাক্যও বলেননি। সোম-মঙ্গল দিনভর চুপ রইলেন অমিত শাহ আর প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিদায়ি মন্ত্রিসভার সদস্যদের নৈশভোজে ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে কী কথা হবে, জানা যায়নি। অমিত শাহর ঘনিষ্ঠজন বলেছেন, ২৩ মে ফল বেরোবে। পরেই তিনি মুখ খুলবেন। বিজেপির অন্দর মহলের অনেকেই সন্দিহান। তাদের অনুমান, বাস্তব পরিস্থিতি আলাদা। ৩০০ আসন পেরিয়ে যাওয়া কঠিন। দরকার পড়লে নতুন সঙ্গী খুঁজতে হবে। অতএব উচ্ছ্বাসে রাশ টানা দরকার। যদি সরকার গঠনে সংখ্যাগত সংকট দেখা দেয়, পেয়ে যাব।

গত কয়েক বছরজুড়ে ভারতীয় গণতন্ত্রে এ ঝোঁক আকছার দেখা গেছে। সরকার গড়ার সম্ভাবনা যার বেশি, অর্থবলও বেশি, তার দিকেই ছোট ছোট দল সুকৌশলে ছুটতে থাকে। অভিযোগ, কেনাবেচার ঘোড়ারা মুখ উঁচিয়ে রয়। প্রাদেশিক নির্বাচনে আমরা লক্ষ করেছি, এ খেলায় গেরুয়া শিবির ওস্তাদ। আগে কংগ্রেসও ঘোড়া কেনায় বহু কেরামতি দেখিয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে মহাজোট, ফেডারেল জোটও এবার অদৃশ্য তৎপরতায় মেতে উঠবে। অতি সম্প্রতি হঠাৎ একটি পরিবর্তন লক্ষ করলাম, যেসব সমীক্ষা এনডিএকে ৩০০ আসন পার করিয়ে দিয়ে ফিসফাস আর প্রকাশ্য আবেগ উসকে দেয়, তাদের অনেকেই আসনবিন্যাসের কসরত প্রদর্শন বন্ধ করে দিয়েছে। কেন এই আচমকা সংযম? তাহলে তাদের হিসাবে কি গরমিল ধরা পড়ছে?

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বুথফেরত সমীক্ষা কতটা বিজ্ঞানসম্মত? কতটা বাস্তব? অতীতের অভিজ্ঞতার রায় কী? এই যেমন ১৯ মে সন্ধ্যায় ৪৯ আসনের ভোট শেষ হলো। শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে চ্যানেল থেকে চ্যানেলে ফলের আগাম ইঙ্গিত ঝলসে উঠল। দেশজুড়ে ৪৯ আসনের ভোটারের মতামত এত দ্রুত জানা কি সম্ভব? এত উন্নত প্রযুক্তি আর ভোটারের মতামত জানার দক্ষতা কি আমরা আয়ত্ত করতে পেরেছি? সম্ভবত না। আমার মতো যারা দিনের পর দিন রাস্তায়, ট্রেনে, অটোয় ঘুরে ঘুরে ভোটের হাওয়ার খোঁজে নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ালাম, আর কী দেখলাম, প্রতিটি দলের সভায় জনতরঙ্গ উপচে পড়ছে। প্রশ্ন করলে উত্তর এক!...বলা কঠিন  মোদি হয়তো ফিরে আসবেন। কিন্তু একাধিপত্য থাকবে না। নতুন সঙ্গী খুঁজতে হবে। উত্তর দুই : বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ। প্রতিটি রাজ্যে আঞ্চলিক রাজনীতির শক্তি বেড়েছে। এঁদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া অসম্ভব। উত্তর তিন : সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেস রুখে দাঁড়িয়েছে। ভরসা রাহুল আর প্রিয়াঙ্কা। তবে কংগ্রেসের ভুল, আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধেনি। বেশির ভাগ এলাকায় একাই লড়ছে। উত্তর চার : গদি বাঁচাতে বিজেপি মরিয়া। প্রচারে অর্থবলে অতুলনীয়। উত্তর পাঁচ : বিজেপির মেরুকরণের কৌশল অব্যাহত। মোদি কাশ্মীরে সেনাহত্যা, সন্ত্রাস আর পাকিস্তানে জঙ্গিদের ঘাঁটিতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইককে যেভাবে প্রচারে কাজে লাগালেন, তাতে সাধারণ ভারতবাসী তাঁর নেতৃত্বে মজবুত সরকারের অবলম্বন খুঁজে পেয়েছে। উত্তর ছয় : অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, উন্নয়ন, বেকার বৃদ্ধি, কৃষকের আত্মহত্যা, ডিমনিটাইজনের পরিণতি সরকারকে ভোগাবে।

অবাক হয়ে দেখলাম, সাধারণ ভোটারের অনুকূল বা বিরুদ্ধে মমতা গুরুত্ব পাননি। সমীক্ষার রায় বড্ড বেশি একতরফা। এসব সমীক্ষা কতটা ধোপে টেকে? অতীতের অভিজ্ঞতা কী বলে? কখনো মেলে। কখনো বেশির ভাগই অবাস্তব, কষ্টকল্পনা। দেশে-বিদেশের কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করছি। এখানে আমাদের নিরপেক্ষতা কোনো দিকেই ঝোঁকেনি। ঝুঁকবে না। গুরুত্ব দেব ইতিহাসকে। সত্যের অভিজ্ঞ মহিলাকে।

২০০৫ সালে এনডিটিভি, এসি নিয়েলসন ও অন্য কয়েকটি সংস্থা তাদের সমীক্ষায় অটলবিহারি বাজপেয়ির নেতৃত্বাধীন এনডিএকে বিপুল ভোটে এগিয়ে রাখল। ফল বের হওয়ার পর দেখা গেল বাজপেয়ির শাসকগোষ্ঠী হেরে গেছে। ক্ষমতায় ফিরল কংগ্রেসের ইউপিএ। ২০০৯ সালের নির্বাচনে, সিএনএন, আইবিএন এগিয়ে রাখল কংগ্রেসকে। ফল বের হলে দেখা গেল, কংগ্রেস ফিরে আসছে। বিরোধী আসনে বসতে হচ্ছে বিজেপির শরিকগোষ্ঠীকে। ২০১৪ সালে মোদির হাওয়ার ঝড় দেখে, সবাই বলল বিজেপি আসছে। কংগ্রেস বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ফলাফলে তা-ই ঘটল। ২০০৪ ও ২০০৯ সালে বুথফেরত সমীক্ষা প্রকৃত সত্যকে ছুঁতে পারেনি। বুঝতে পারেনি কংগ্রেসের স্বাচ্ছন্দ্য। ২০১৬ সালে, বাংলার বিধানসভা ভোটে প্রায় সমীক্ষাই তৃণমূল কংগ্রেসের বিপর্যয়ের ছবি দেখাল। ফল হলো উল্টো। একাই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেন মমতা।

এবারের সমীক্ষায় এমন কিছু বিচ্যুতিও চোখে পড়ল। এই যেমন, উত্তর প্রদেশে একটি আসনেও আপ প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করেনি। কিন্তু একটি সমীক্ষা ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে দিল, গোবলয়ের সবচেয়ে বড় রাজ্যে আপ পাচ্ছে ২.০৩ ভোট।

এ তো হলো দেশের গল্প। গত কয়েক বছরে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেনের ব্রেক্সিট নির্বাচনের প্রাক ও বুথফেরত সমীক্ষার পরিণতি কী? ভুল। আর ভুল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের, হিলারি ক্লিনটনের জয়-পরাজয় নিয়ে বিস্তর অঙ্ক কষে বহু সংগঠন। ফলাফলের রায় হলো অন্য রকম, জিতলেন ট্রাম্প। ব্রেক্সিট নির্বাচনে সমীক্ষার আগাম বার্তাকে নস্যাৎ করে জয়ী হলো ব্রিটেনের ভাবাবেগ। অস্ট্রেলিয়ায়ও ঘোল খেল পোল। এটাই সমীক্ষা বিপর্যয়ের নিকটতম উদাহরণ। ৫৬টি ছোট-বড় এগজিট পোল বলল, প্রধানমন্ত্রী মরিসনের বিদায় আসন্ন। গত সপ্তাহে ফল বের হলে দেখা গেল, ব্যাপক ভোটে ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন মরিসন। ২০০৪ সালের আরেকটি অভিজ্ঞতা। আমেরিকায় বুথফেরত সমীক্ষায় বলল, জিতছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির জন কেরি। জিতলেন, রিপাবলিকানদের জর্জ ডাব্লিউ বুশ। এসব দৃষ্টান্ত আর অভিজ্ঞতা ছুঁয়েই আমাদের সিদ্ধান্ত, প্রাক-সমীক্ষা অথবা বুথফেরত সমীক্ষার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মিলে গেলে সমীক্ষার সমর্থকরা হৈহৈ করে নাচতে থাকবে। বিরুদ্ধপক্ষ বলতে থাকে, বাজ পড়ে বক মরল। ফকিরের কেরামতি বাড়ল। এখানেই আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস, বেশির ভাগ সমীক্ষা ভুল হয়। কখনো কখনো মিলে যায় অনুমান আর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ। ভারতের সপ্তদশ নির্বাচনের ফলাফলেও ঝুলে রইল এই ঝোঁক। অনেক কিছুই সম্ভব। ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে বিস্ময়ের রহস্য। রহস্যের কৌশলে নেচে উঠবে বাস্তবের বিশ্বাস। অবিশ্বাস।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক

সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা