kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

কতটা পথ এগিয়েছে নারী?

ড. এ কে এম নুরুজ্জামান

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কতটা পথ এগিয়েছে নারী?

নারীকে ‘মা’ হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিনিয়ত আমরা শ্রদ্ধায় অবনত হই। শৈশবকালে আমাদের জীবনাচরণ ‘মা’ ছাড়া অচল। বাস্তবতা হলো, পরবর্তী সময়ে ‘মা’ আস্তে আস্তে আমাদের থেকে দূরে চলে যান বা আমরা দূরে ঠেলে দিই। পরিবারের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় এবং সম্পদের অভিগম্যতায় অন্যদের প্রবেশ ঘটে। আমি যে ব্যক্তি আজকে দুই কলম লিখছি, সেই মানুষটি তৈরির অন্যতম কারিগর ‘মা’। সেই মায়ের আইনগতভাবে আমার সম্পদের ওপর তেমন আর কোনো অধিকার থাকে না। আমাদের এ দেশের বেশির ভাগ নারী শৈশবে বাবার, যৌবনে স্বামীর এবং পরিণত বয়সে সন্তানের ছত্রচ্ছায়ায় জীবনপাত করে। তারা শুধু দিয়েই যায়। বাংলা ভাষায় আমরা একটি শব্দ প্রায়ই ব্যবহার করি—‘মেয়েমানুষ’; মূলত নারীকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য। পুরুষ হলে পারত, নারী বলে পারছে না—এ মনোভাব সমাজে এখনো অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অবস্থা এ পর্যায়ে গেছে এখন সরকারকে মা-বাবার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার জন্য আইন করতে হয়েছে।

আমাদের বেড়ে ওঠা ও শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিকভাবে আমাদের পরিবারে, তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে, যেখানে আমরা বসবাস করি। এসব প্রতিষ্ঠানের আন্ত মিথস্ক্রিয়ার ফলে আমাদের ভেতর তৈরি হয় মূল্যবোধ, নারী ও পুরুষের সম্পর্কের প্রেক্ষাপট। এ সম্পর্কের আগা-গোড়ায় মূলত পুরুষরাই প্রাধান্য পায়। ফলে এ মূল্যবোধ বেড়ে ওঠে একপক্ষীয়তায়, বহুমাত্রিকতায় নয়। তা এখন পরিবর্তনের দাবি রাখে। এ জন্য দরকার যথাযথ আইন প্রণয়ন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সর্বোপরি সব স্তরে সব সময় সর্বস্থানে নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। অনেকের মতো আমিও মনে করি নারী-পুরুষের অসমতার বিষয়টি মূলত দৃষ্টিভঙ্গি বা মানসিকতার দ্বন্দ্ব। নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতিসংঘ কর্তৃক চিহ্নিত তিনটি সংকটের সঙ্গে মানসিকতার সংকটটি যোগ করে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রায়ই নারীদের উন্নয়নে চারটি সংকটের কথা উল্লেখ করেন। এক. শিক্ষা, দুই. কর্মসংস্থান, তিন. নির্যাতন ও চার. মানসিকতা। এটির মূল অনেক গভীরে প্রোথিত। মানব মূল্যবোধের বিষয়গুলো একান্ত উপলব্ধি, প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত জালিকার মতো একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। নারীর ক্ষমতায়ন তাই শুধু একক বিষয় নয়, এটি একটি সমন্বিত প্রয়াস। ধারাবাহিকভাবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন বলতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বোঝায় না, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকেও বুঝিয়ে থাকে।

Global Gender Gap Report-2018 অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের ওপরে। এ সাফল্যের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের অনেক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেকটাই নারীবান্ধব। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি ধারা ২৮ (১)-(৩)-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুসারে ২০২১ সালের মধ্যে এ দেশ মধ্যম আয়ের একটি দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, যাকে আমরা বলে থাকি রূপকল্প-২০২১। এরই এক অন্যতম নির্দেশক ও চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশ সরকার জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণের মর্মে আইন, নীতিমালা, নির্দেশনা প্রস্তুত ও প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। নারীদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণে নীতিগতভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সম্মেলনে সরকারি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্ল্যাটফর্ম অব অ্যাকশনের আওতায় আয়োজিত নারীবিষয়ক সম্মেলন ‘সিডও’, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তি ও জনজীবনে নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বাংলাদেশ সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এরই আলোকে অভীষ্ট-৫-এ উল্লিখিত নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে সরকার ‘নারী ও উন্নয়ন’-এর পরিবর্তে ‘উন্নয়নে নারী’ ধারণাটি গ্রহণ করেছে। শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার কথা ভেবে মাতৃত্বকালীন ছুটি চার মাস থেকে বৃদ্ধি করে ছয় মাসে উন্নীত করা হয়েছে। পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধনে আগে শুধু বাবার নাম থাকত, বর্তমানে মায়ের নাম লেখার প্রচলন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ থেকে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০’ সরকার প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করছে। ওই আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা বিধিমালা-২০১৩’ গৃহীত হয়েছে। সরকার কর্তৃক ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২’ এবং ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২’ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সেন্সেটিভ বিষয়ে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য গ্রহণ করা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। যেমন : বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রসূতি ও দুগ্ধবতী মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জন্য রয়েছে ভিজিএফ কার্ড। এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ শতাংশ এসএমই তহবিল ও ১০ শতাংশ শিল্প প্লটের কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছে। নারীদের পুনরর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে ১৫ শতাংশ সংরক্ষিত তহবিল রয়েছে। নারীদের জন্য ক্ষুদ্র ও মধ্যম উদ্যোক্তা ঋণ হিসেবে ব্যক্তিগত জামিনের মাধ্যমে ২.৫ মিলিয়ন টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ রাখা হয়েছে। অধিকন্তু সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তাদের সুবিধা সংরক্ষণের জন্য এককভাবে নিবেদিত ডেস্ক চালু করেছে। বর্তমানে ৩০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত রয়েছে। বাংলাদেশে দরিদ্রদের জন্য এনজিও কর্তৃক পরিচালিত ঋণ কার্যক্রমে ২০১৬-১৭ সালের হিসাব অনুসারে ঋণগ্রহীতার মোট সংখ্যা ছিল ৩৪ মিলিয়ন, যার মধ্যে ৩১ মিলিয়নই নারী ঋণগ্রহীতা। নারীর সামাজিক ক্ষমতায়নে গ্রামীণ, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার সুবিধার্থে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে স্থাপন করা হয়েছে নারীবান্ধব মডেল হাসপাতাল; যেখানে অনেকটা বিনা মূল্যেই পাওয়া যায় বিভিন্ন সেবা যেমন : প্রসবপূর্ব তিনটি চেকআপ, প্রসবকালীন সেবা ও প্রসব-উত্তরকালীন সেবা। নগর হাসপাতালগুলোতে অতি দরিদ্রদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে। ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের সাতটি বিভাগে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসা ও আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। বিগত দুই দশকে মাতৃমৃত্যু হ্রাস পেয়েছে ৬৬ শতাংশ, যা প্রতিবছরে গড়ে প্রায় ৫.৫ শতাংশ। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত পাঁচটি নারী আসন থেকে বর্তমানে ৫০-এ উন্নীত করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়ন কাউন্সিল, উপজেলা ও পৌরসভায় জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সদস্য বা কাউন্সিলরদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এক-তৃতীয়াংশ করা হয়েছে। সরকারি চাকরির জন্য মোট আসন সংখ্যার বিপরীতে নারী কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, উপনেতা সবাই নারী। জাতীয় সংসদে নির্বাচিত নারী সদস্যদের মধ্য থেকে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান ও পূর্ববর্তী ক্যাবিনেটে শিক্ষা, শ্রম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পরিবেশ, কৃষি, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বদান করছেন নারী মন্ত্রীরা। সারা দেশ থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ১২ হাজারের বেশি নারী জনসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পিকেএসএফ এরই মধ্যে প্রতিবন্ধী নারী, হাওর ও নদীভাঙন এলাকার নারী, বেদে-দলিত, নারী ভিক্ষুকসহ দারিদ্র্যরেখার সর্বনিম্ন স্তরে থাকা অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ১৬টি উপশ্রেণিতে ভাগ করে  জীবনচক্রভিত্তিক বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করার মাধ্যমে পিছিয়েপড়া-পিছিয়ে রাখা কিংবা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর বিশেষত নারীর মানবমর্যাদা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

নারীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এত সব ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও এখনো সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে নারীরা নানাবিধ সহিংসতার শিকার। ঘরের বাইরে নারী উত্ত্যক্তকরণের জন্য অনেক সম্ভাবনাময় বালিকার বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সামাজিক ও পারিবারিক চাপে এখনো ১৮ বছরের নিচের মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে। যৌতুকের শিকার হচ্ছে অনেক নারী। নারীর গৃহশ্রম জাতীয় আয়ের পরিমাপে বিবেচনা করা হচ্ছে না। পুরুষের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পরিবারে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নারীর কাজ বলে নারীকে কর্মভারে জর্জরিত করা এবং গৃহশ্রমের অসম বিভাজন তৈরি করার বিষয়টি বিদ্যমান রয়েছে। এমনকি নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে কিংবা অন্যান্য মিডিয়ায় নারীদের বৈষম্যমূলকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আজও ব্যথিত চিত্তে বলতে হয় নারী তুমি আর কতটা পথ মাড়িয়ে গেলে তুমি তোমার অধিকারের পরিপূর্ণতা পাবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের আজও জানা নেই। তবুও বলি ‘সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো, নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো।’

লেখক : উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মী

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা