kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

বিশেষ সাক্ষাৎকারে অলি আহমদ

দুই কোটি টাকা করে নেওয়ার তথ্য আছে

বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়ার শখ আমার নেই

এনাম আবেদীন    

২১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



দুই কোটি টাকা করে নেওয়ার তথ্য আছে

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. অলি আহমদ বলেছেন, ভোটারবিহীন নির্বাচন করেও শুধু বিরোধী দলের ব্যর্থতার কারণে সরকার টিকে আছে। তবে এই থাকা চিরস্থায়ী হবে না। তাঁর মতে, সংসদে যোগ দিয়ে বিএনপি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে। নির্বাচনে বিরোধী দলের অনেক প্রার্থী সরকারের কাছ থেকে দুই কোটি টাকা করে নিয়েছেন—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে বলেও দাবি করেন তিনি।

গত শুক্রবার পার্ক রোডে নিজ বাসায় কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন দাবি করেন এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়ার শখ আমার নেই।’ তবে ‘বীরবিক্রম’ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে জোটের রাজনীতি করায় তাঁর আপত্তি নেই।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অলি আহমদ বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কারণ এই প্রথম দেশের জনগণ তাদের ভোটাধিকার হারিয়ে ফেলেছে। ২০১৪ সালে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল বিনা ভোটে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে অভিনব কায়দায়। নির্বাচনের ১৫ দিন আগে থেকে জনগণের ওপর সরকার নির্যাতন শুরু করেছে।

বিরোধী দলের কোনো নেতাকর্মীকে দিনে ও রাতে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়নি। অনেককে নিজের শহর বা গ্রাম ছেড়েও পালাতে হয়েছে। এখনো পর্যন্ত অনেকে পলাতক আছে। অনেককে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। লাখ লাখ লোকের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা হয়েছে। এ মামলাগুলো নভেম্বর মাসের শেষের দিকে শুরু করা হয়েছিল অজ্ঞাতনামা হিসেবে। দুই থেকে চার-পাঁচটি পর্যন্ত মামলা প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকায় দায়ের করা হয়েছে। এ মামলার আওতায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি শুরু হলো। বিরোধী দলের প্রায় দেড় শ প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গাড়ি ভাঙচুর ও হত্যার চেষ্টা করে তাঁদের জীবন বিপন্ন করা হয়েছে। প্রার্থীদের পরিবারের সদস্যরাও এসব অত্যাচার থেকে রেহাই পায়নি। তাদের ড্রাইভার ও কাজের লোকদের পর্যন্ত গ্রেপ্তার করে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এভাবেই নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি তৈরি করে বাংলাদেশে এক অভিনব নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে, যার নজির পৃথিবীর সমসাময়িককালে কোথাও পাওয়া যাবে না। 

আগের রাতের এই যে নির্বাচন, এটি নতুন নয়। কারণ গত বেশ কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন নির্বাচনে এই ধারা চলছিল। দিনের বেলা নির্বাচন যেটুকু দেখানো হলো, সেটি শতকরা ৩০ বা ৩৫ শতাংশ ভোট কাস্টিংয়ে দেখানো নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আবার দিনের বেলা যাদের ভোট দিতে দেওয়া হয়েছে, তারাও সরকারদলীয় প্রার্থীদের কর্মী বা সমর্থক। বাকি লোকদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া হয়নি। সরকারদলীয়রা আগে থেকেই ভোটকেন্দ্রগুলো দখলে রেখেছিল। ফলে তারাই তাদের ইচ্ছামতো কাস্টিং দেখিয়েছে। এ ধরনের নজিরবিহীন ঘটনা এই জাতি আগে কখনো দেখেনি।

কালের কণ্ঠ : আপনি যা বলছেন তা সত্য হলে এই সরকার এখনো টিকে আছে কী করে?

অলি আহমদ : আসলে সমগ্র দেশের মানুষ কোথায় যেন আটকে গেছে বা থেমে আছে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হলে হৃদয়ের স্পন্দন যেমন থেমে যায়, এ দেশের মানুষের স্পন্দনও তেমনি হঠাৎ করেই যেন থেমে গেছে। কাউকে না কাউকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে এই স্পন্দন ফিরিয়ে আনতে হবে। আর এটা স্বাভাবিক গতিতেই আসবে। হয়তো সময় লাগবে। কারণ জনগণকে যারা নির্যাতন করে বা কষ্ট দেয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কখনো তাদের পক্ষাবলম্বন করেন না। আল্লাহ অবশ্যই সৎ ব্যক্তিদের পাশে থাকেন। হয়তো পরিণতি একটু দেরিতে হতে পারে। হয়তো আমরা এমন কোনো গুনাহ বা পাপ করেছি, যার জন্য জাতিগতভাবে আমাদের শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। তবে এ ধরনের জুলুম-নির্যাতন যে খুব দীর্ঘস্থায়ী হবে—এটা ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু সরকার তো সব কিছু ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে...

অলি আহমদ : সরকার সামাল দিতে পারেনি, এটি পুরোপুরি বিরোধী দল বা জোটের ব্যর্থতায় তারা টিকে আছে। বিরোধী দলের অনেকে সরকারের কাছ থেকে দুই কোটি টাকা করে নিয়েছে নির্বাচনে।

কালের কণ্ঠ : এরা কারা?

অলি আহমদ : আমি এখন ডিসক্লোজ করব না। তবে আমার কাছে এ বিষয়ে তথ্য রয়েছে।

কালের কণ্ঠ : এটি কি আপনার রাজনৈতিক বক্তব্য, নাকি সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে?

অলি আহমদ : এক শ পার্সেন্ট সুুনির্দিষ্ট তথ্য আছে। যার বাসায় টাকা দিয়েছে, যে নেগোসিয়েট করে দিয়েছে, সব তথ্য আমার কাছে আছে।

কালের কণ্ঠ : তারা বিএনপি, নাকি ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী?

অলি আহমদ : তারা বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

কালের কণ্ঠ : বিরোধী দল বলতে তো জাতীয় পার্টি বোঝায়।

অলি আহমদ : জাতীয় পার্টি বিরোধী দল নয়; গৃহপালিত বিরোধী দল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটই হলো বিরোধী দল। এদের অনেকেই সরকারের কাছ থেকে দুই কোটি টাকা করে নিয়েছে। তাদের মূল দায়িত্ব ছিল বিএনপিকে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে রাখা। তবে এ ধরনের নির্বাচন হবে এটি সরকারও আশা করেনি।

কালের কণ্ঠ : আপনিও তো ২০ দলে ছিলেন।

অলি আহমদ : নির্বাচনের সময় যখন আমার ছেলেকে হত্যা করার জন্য তার ওপর আঘাত করে তাকে জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়, তখন সরকারের অনেক মন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আওয়ামী লীগের মহাসচিব ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গেও আমি কথা বলেছি। তিনিও বলেছেন, এটি খুব অন্যায় কাজ হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন, আপনার এলাকায় এ রকম কাজ হবে আমি আশাও করিনি। আমার মনে হয় অনেক ঘটনা তখন আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। প্রকৃতপক্ষে প্রার্থী ছিল আওয়ামী লীগের এবং ভোটার ছিল পুলিশ। নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। যার জন্য জনগণ এখন চুপচাপ আছে। কোনো কথা বলছে না। তবে এ ধরনের সরকার পৃথিবীতে অনেকেই কায়েম করেছে, পরিচালনা করেছে। কিন্তু শেষরক্ষা তাদের হয়নি। 

কালের কণ্ঠ : দুই কোটি টাকা করে নিয়েছে—এমন অভিযোগ তোলার পর আপনি আবার সেই জোটের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিলেন কেন?

অলি আহমদ : একসঙ্গে আছি। কারণ খালেদা জিয়া এখন কারাগারে। তাঁকে মুক্ত না করে অন্য কিছু চিন্তা করাটা ঠিক নয় বলে মনে করি।

কালের কণ্ঠ : শুধু কি সেই কারণে? নাকি আলাদা অবস্থান নেওয়ার পরিস্থিতি নেই?

অলি আহমদ : বিএনপির দুর্দিনে আমি বিএনপিতে যোগদান করেছিলাম। বিএনপির সুদিনে আমি ছিলাম না। গতবার যখন তারা ক্ষমতায় ছিল, তখন আমার সঙ্গে সম্পৃক্ততা খুবই কম ছিল। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ই ৩২ জন এমপি-মন্ত্রী নিয়ে পৃথক দল গঠন করেছি। বিশ্বে এ ধরনের ঘটনা এর আগে ঘটেনি। আমি ঘটিয়েছিলাম।

কালের কণ্ঠ : খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কিছু জানা আছে আপনার?

অলি আহমদ : আমি বিশ্বাস করি না এই সরকার তাঁকে মুক্তি দেবে। তাঁর মুক্তির জন্য সংগ্রাম করতে হবে। তবে তা ধ্বংসাত্মক নয়। নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন কর্মসূচি দিতে হবে।

কালের কণ্ঠ : জামিন বা প্যারোলের বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য আছে?

অলি আহমদ : নেই। কারণ দুর্ভাগ্যবশত ২০১২ সালের পর থেকে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ কোনো কর্মকাণ্ডে ২০ দলকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। তারা প্রতিবছর কূটনীতিকদের সঙ্গে বসে। ২০ দলীয় জোটের সিনিয়র কোনো নেতাকে রাখা হয় না। অথচ যদু-মধু অনেককে দাওয়াত দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে আলোচনার সময়ও আমরা অন্ধকারে ছিলাম। আমরা শুধু হাত তুলে এবং বুঝে না-বুঝে সমর্থন দিয়েছি। কোনো বিষয়ে বিএনপি আমাদের সম্পৃক্ত করেনি। শুধু তারা যেটা চায় সেটার সঙ্গে একমত করার জন্য আমাকে ডেকে এক কাপ চা খাওয়াত। আমরাও বোকার মতো হাত তুলে সমর্থন দিয়েছি।

কালের কণ্ঠ : নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়া প্রশ্নে আপনার অবস্থান কী ছিল?

অলি আহমদ : আমি বলেছিলাম, এই সরকারের আমলে দেশে সুষ্ঠু কোনো নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের আগে ৩০০ প্রার্থীকে নিয়ে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে প্রতিবাদ করার প্রস্তাব করেছি। বলেছি, সবাই চলেন। বিশ্ববাসীকে জানাই যে বাংলাদেশে কোনো ভোট হচ্ছে না। ছয় মাস আগে থেকে বলেছিলাম, নির্বাচন হবে না। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হয়নি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমাদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার চরম আকার ধারণ করেছিল। রাজনীতিবিদরা মনে করেন, রাজনীতি একটা ব্যবসা। পুঁজি ছাড়াই এ ব্যবসা করা যায়। সরকারি দলে থাকলে চাঁদাবাজি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া যায়। যাদের ঘরে কোনো দিন সাইকেল ছিল না, তারাও এখন পাজেরো-মার্সিডিস চালায়। যারা কখনো ঢাকায় বসবাস করার কথা চিন্তাও করেনি, তাদের এখন ১০০টি ফ্ল্যাট, ১০টি বিল্ডিং। কিন্তু দুদক তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কারণ যারা দুনীতিবাজ তারা ১৫-২০ কোটি টাকা রেখে দেয় বিভিন্ন জায়গায় দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার জন্য। ১১ বছর এই সরকার ক্ষমতায় আছে। বড় কোনো দুর্নীতিবাজের শাস্তি এ কারণে হয়নি। 

কালের কণ্ঠ : নির্বাচন পলিসি মেকিংয়ে আপনারা ঠিকমতো হ্যান্ডল করতে পারেননি। এর জন্য কে দায়ী?

অলি আহমদ : বিএনপি কী কারণে হঠাৎ করে ঐক্যফ্রন্টের প্রেমে পড়ে গেল এ বিষয়টি আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। ড. কামাল সাহেব প্রত্যেকটি বৈঠক শুরু করেছেন বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে এবং বঙ্গবন্ধু জিন্দাবাদ বলে বৈঠক শেষ করেছেন। তিনি কোনো দিন খালেদা জিয়ার নাম নেননি।

কালের কণ্ঠ : ড. কামাল হোসেনকে তো বিএনপি প্রধানমন্ত্রী করার প্রস্তাব করেছিল। আপনার জানা আছে?

অলি আহমদ : আমি জানি না। বিএনপিকে বিভিন্নভাবে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে আপনারা ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন?  কিন্তু তারা বলতে পারেনি।

কালের কণ্ঠ : বিএনপির সিনিয়র দুজন নেতা ড. কামালকে এই প্রস্তাব করেছিলেন বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে।

অলি আহমদ : আমি জানি না। উনি খুব ভালো লোক সন্দেহ নেই। তবে উনি কখনো রাস্তায় নেমেছেন বা কোনো সংগ্রামে ছিলেন—এ ধরনের খবর আমার জানা নেই।

কালের কণ্ঠ : আপনি তো সংসদে যাওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের সংসদ সদস্যরা তো সংসদে গেল।

অলি আহমদ : আসলে সরকারকে বৈধতা দিয়ে বিএনপি নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরেছে। এর জন্য জাতিকে দোষারোপ করে লাভ নেই। বিএনপি সব সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছে। সংসদে গিয়ে আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত নিল। এই ছয়জনকে বহিষ্কার করে দিলে কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হতো না। বিএনপির কোনো ক্ষতি হতো না। বিএনপি প্রত্যেকটি আসনে ন্যূনতম তিনজন করে মনোনয়ন দিয়েছে। কোনো কোনো আসনে পাঁচ থেকে ছয়জন প্রার্থী ছিল। সেখানে ছয়জন গেলেও কোনো ক্ষতি হতো না। বিএনপি থেকে ১০০ জন নেতা চলে গেলেও বিএনপি শুদ্ধ হবে। অশুদ্ধ হবে না। বিএনপিকে এখন শুদ্ধ হওয়ার চিন্তা করতে হবে। কাদের দিয়ে বিএনপি পরিচালনা করলে ক্ষমতায় আসা যাবে, তাঁদের জনগণ ও স্টেকহোল্ডারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না এটি চিন্তা করতে হবে।

কালের কণ্ঠ : খালেদা জিয়া কারাগারে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না এবং তারেক রহমান লন্ডনে থেকেও পারবেন না বলে সাম্প্রতিককালে আপনার দেওয়া বক্তব্যের তাৎপর্য কী?

অলি আহমদ : আমার বক্তব্য স্পষ্ট। আমি বলেছি, খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন। অসুস্থ। কারাগারে থেকে তাঁর পক্ষে সব কিছু জানা বা প্রতিদিন কী হচ্ছে এটি সম্ভব নয়। ফলে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়া এই অবস্থায় তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, বাস্তব কারণে তারেক রহমানের পক্ষে মাঠে এসে আমাদের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমি বিএনপিকে বলেছি, হয় আপনারা কেউ দায়িত্ব নেন, আপনাদের নেতৃত্বে আমরা কাজ করব। না হলে আমার নেতৃত্বে আসেন। এখানে ভুল-বোঝাবুঝির কারণ নেই। কারো যদি গাত্রদাহ হয়, আমার কিছু করার নেই।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু আপনার বক্তব্যে অনেকের মনে করার কারণ আছে যে আপনি বিএনপির নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী।

অলি আহমদ : বিএনপিকে নেতৃত্ব দেব—এ ধরনের কোনো শখ আমার নেই। আমার পা কোনো কাদায় আটকায়নি। আমি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমার ভয়ের কোনো কারণও নেই। আমি কোনো বেঈমানিও করি না। মুনাফিকদের সঙ্গে চলতেও চাই না।

কালের কণ্ঠ : খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বাইরে বিএনপির নেতৃত্ব দিতে পারে—এমন কে আছেন?

অলি আহমদ : অন্য দল সম্পর্কে মন্তব্য করব না।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু আপনার বক্তব্যে ২০ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেওয়ার কথাই বলছেন।

অলি আহমদ : জোট সম্পর্কে বলার অধিকার আছে। কিন্তু পরিবার সম্পর্কে বলার অধিবার নেই। আবার দেশের সম্পর্কে বলার অধিকার আছে। বিএনপির নিজস্ব নেতৃত্বের বিষয়ে তাদেরই চিন্তা করতে হবে।

কালের কণ্ঠ : বিএনপিকে সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য লোক আছে কি না?

অলি আহমদ : এটাও আমি বলব না। আপনারাই যাচাই করে দেখতে পারেন কার দ্বারা কী কাজ হতে পারে।

কালের কণ্ঠ : ২০ দলীয় জোট আর কত দিন টিকে থাকতে পারে?

অলি আহমদ : ২০ দলীয় জোট তো টিকে নেই। জোট থেকে আন্দালিব পার্থর বিজেপি বের হয়ে গেছে। আরো অনেকে হুমকি দিচ্ছে বের হয়ে যাবে। নির্বাচনের আগেও দুটি দল চলে গেছে। আগামীতে আর কেউ বের হবে না—এমন নিশ্চয়তা নেই। কেউ তো কাউকে দাসখত দিয়ে আসেনি।

কালের কণ্ঠ : একজন মুক্তিযোদ্ধা নেতা হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ২০ দলীয় জোটে থাকার ঘটনাকে কিভাবে দেখেন?

অলি আহমদ : জামায়াতের কোনো দোষ নেই। তা ছাড়া সেই জামায়াত কি এখন আর আছে? আসলে বিএনপিকে যারা দুর্বল দেখতে চায়, তারাই জামায়াত নিয়ে বেশি চিন্তা করে। আওয়ামী লীগই জামায়াতকে নিয়ে বেশি প্রোপাগান্ডা করে। কারণ হলো জামায়াতকে ইস্যু করে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। আওয়ামী লীগের দোসররাই জামায়াত নিয়ে বেশি চিৎকার করে। কারণ তারা বিরোধী জোটকে দুর্বল দেখতে চায়।

কালের কণ্ঠ : তার মানে মুক্তিযোদ্ধা হলেও জামায়াত নিয়ে আপনার আপত্তি নেই?

অলি আহমদ : কোনো আপত্তি নেই। কারণ এখনকার জামায়াত ১৯৭১ সালের জামায়াত না। ১৯৭১ সালের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল না—এমন লোক এখন জামায়াত করে। তা ছাড়া এভাবে পুরো বাংলাদেশকে ভাগ করে ফেললে চলবে না। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখাই একজন নেতার কর্তব্য। জাতিকে বিভক্ত করা কোনো ভালো কাজ নয়। এখন যারা জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বলে, তারাই সবচেয়ে জামায়াত নিয়ে বেশি কাজ করেছে। ১৯৮৬ সালে এই আওয়ামী লীগই জামায়াতকে নিয়ে নির্বাচন করেছে। ১৯৯৬ সালে এই জামায়াতকে নিয়েই তারা বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মূলত জামায়াতের ছিল, যা পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ হাইজ্যাক করেছে। এখন জামায়াতের গায়ে গন্ধ আছে—এটি বললে তো হবে না। তারা এই দেশের নাগরিক। তাদের তো বিদেশে পাঠানো যাবে না। যাদের দোষ ছিল বলে বর্তমান সরকার মনে করেছে, তাদের তো ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু বিএনপি চাইছে জামায়াত জোট ছেড়ে চলে যাক।

অলি আহমদ : এমন খবর আমার জানা নেই। বিএনপি নেতারা আমাকে এ বিষয়ে কিছু বলেননি। 

কালের কণ্ঠ : তাহলে ২০ দলীয় জোটে জামায়াতের টিকে থাকার বাস্তবতা এখনো আপনি দেখছেন?

অলি আহমদ : অবশ্যই আছে। ২০১২ সাল থেকেই একসঙ্গে চলছি। তা ছাড়া আর কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, যেখানে জামায়াত পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল। ২০১৯ সালের জামায়াত রাজাকার নয়। তারা দেশপ্রেমিক লোক। তারাও এখন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে। আজকেও (শুক্রবার) আমার ইফতার পার্টিতে তারা বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলেছে।

কালের কণ্ঠ : কিন্তু তারা তো ’৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চায়নি।

অলি আহমদ : ওদের তো ক্ষমা চাওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। যাদের মাফ চাওয়ার কথা, তাদের তো সরকার ফাঁসি দিয়েছে।

কালের কণ্ঠ : জামায়াতের সঙ্গে আপনার সখ্য নিয়ে ইদানীং বাইরে নানা গুঞ্জন আছে। আপনার সঙ্গে নাকি দলটির সম্প্রতি একাধিক বৈঠক হয়েছে?

অলি আহমদ : আমি রাজনীতি করি। আমার সঙ্গে বৈঠক হতেই পারে।

কালের কণ্ঠ : তাহলে কি হিসাব কষা যায় যে আপনার দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহ এবং জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকের বিশেষ কোনো যোগসূত্র আছে?

অলি আহমদ : অসুবিধা কী! আমি তো চোর বা ডাকাত কিছু নই। আমি একজন প্রাক্তন সামরিক অফিসার এবং একজন সফল রাজনীতিবিদ। যাঁরা এই দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের চেয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার কম নয়। সুতরাং এখানে গাত্রদাহের কোনো কারণ তো দেখি না।

কালের কণ্ঠ : কালের কণ্ঠকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

অলি আহমদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা