kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

এই সময়

বিরোধী জোটে ভাঙনের সুর

তারেক শামসুর রেহমান

২০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



বিরোধী জোটে ভাঙনের সুর

বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে ভাঙনের খবর এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিএনপির নির্বাচিত ছয়জন সংসদ সদস্যের মধ্যে পাঁচজনের সংসদ অধিবেশনে যোগদান ২০ দলীয় রাজনীতিকে একটি বড় ধরনের ‘ধাক্কা’ দিয়েছে। আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বাধীন বিজেপি ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে। যদিও পরে তিনি বলেছেন, বিএনপি যদি এককভাবে তাঁকে ডাকে তাহলে তিনি যেতে পারেন। তবে জোটে ফিরে যাবেন কি না সে ব্যাপারে তিনি কিছু বলেননি। আরেকটি ছোট দল লেবার পার্টি হুমকি দিয়েছে বিএনপিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছেড়ে দিতে! এলডিপি কিংবা কল্যাণ পার্টির মতো ছোট ছোট দলের নেতারাও বিএনপির সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্তে তাঁদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এলডিপি খুব কড়া ভাষায় বিএনপির এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেও এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি অবশ্য বলেছেন, তিনি কিংবা তাঁর দল ২০ দলীয় জোট ছাড়ছেন না। এমনকি বিএনপি জোটকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন তিনি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও তেমন কোনো সুখবর নেই। নির্বাচনের আগে আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে এই ফ্রন্ট যখন গঠিত হয়েছিল, তখন ফ্রন্ট সম্পর্কে একটি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই ‘আগ্রহে’ এখন ভাটা পড়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্যফ্রন্ট সম্পর্কে এখন কোনো কৌতূহল আছে বলে মনে হচ্ছে না। ড. কামাল হোসেনের ভূমিকাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এখন অকার্যকর হয়ে গেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে গণফোরামের দুজন সংসদ সদস্যের সংসদ অধিবেশনে যোগদান, দল থেকে ‘বহিষ্কার’, আবার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না করেই একজনকে পাশে বসিয়ে (মোকাব্বির খান) বিশেষ কাউন্সিল করা, এমনি করে রাজনৈতিক দৈন্যতা কোন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তবে বিএনপির কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা ‘প্রশ্ন’ থাকলেও, বিএনপির ‘ঐক্যে’ এখনো তেমন ভাঙন দেখা যায়নি। কর্মীদের মধ্যে হতাশা আছে, এটি সত্য। কিন্তু জিয়া পরিবার ও খালেদা জিয়াই যে বিএনপির মূল ‘কেন্দ্র’, সেটি আবারও প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল (১৯৭৩ সালে প্রথম)। এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি পেয়েছিল ২০৭ আসন (প্রাপ্ত ভোটের শতকরা ৪১.১৭ শতাংশ)। আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯ আসন, ২৪.৫৬ শতাংশ ভোট। জিয়ার মৃত্যু ও এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যাতে বিএনপি অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি পায় ১৫৩ আসন, আর আওয়ামী লীগ ৭৬ আসন। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই বয়কট করে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপি পায় ১৪০ আসন (৩০.৮১ শতাংশ ভোট), আর আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন (৩০.০৮ শতাংশ ভোট)। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে, যে সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১৩ দিন। ১৯৯৬ সালেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬ আসন (৩৭.৪৪ শতাংশ ভোট), আর বিএনপি পেয়েছিল ১১৬ আসন (৩৩.৬১ শতাংশ ভোট)। পরবর্তী সময়ে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০০১), নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও (২০০৮) ওই দুটি বড় দলের অবস্থান ছিল এ রকম : বিএনপি তথা চারদলীয় জোট ১৯৩ আসন (৪০.৯৭ শতাংশ) ও আওয়ামী লীগ ৬২ (৪০.১৩ শতাংশ)। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ২৬২ (আওয়ামী লীগ ২৩০) আসন (৫৬.৯ শতাংশ ভোট), আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ৩৩ আসন (৩৮.০৬ শতাংশ)। কিন্তু এর পরপরই দৃশ্যপট বদলে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ঘোষিত হয়।

দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যে নির্বাচন বিএনপি তথা চারদলীয় জোট বয়কট করেছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে অংশ নেয়। সংসদীয় রাজনীতির এই পরিসংখ্যান আমাদের বলে দেয় বড় দুটি দলের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক থাকা জরুরি। তাতে করে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই আস্থার সম্পর্ক ভবিষ্যতে কতটুকু গড়ে উঠবে, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, রাজনৈতিক নেতারা নিশ্চয়ই এটি উপলব্ধি করবেন। জাতীয় নেতাদের প্রতি সম্মান দেখানো, কোনো ধরনের বিরূপ মন্তব্য না করা, বিএনপিকে সংসদে কথা বলার সুযোগ দেওয়া—এসবই নির্ভর করে একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে। এখন উচ্চ আদালতের জামিন মঞ্জুর সাপেক্ষে এবং চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী খালেদা জিয়া যদি বিদেশে যান (?), তাহলে দলটি নেতৃত্বহীন অবস্থায় কিভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও একটি প্রশ্ন। বিএনপি এখনই অনেকটা নেতৃত্বহীন। দলটির স্থায়ী পরিষদের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। তরুণ নেতৃত্ব বিএনপির ভেতরে জন্ম হচ্ছে না। এমনি এক পরিস্থিতিতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করারও কেউ নেই। তাই বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন এখন। এই যোগদান রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন যদি ডেকে নাও আনে, বাস্তবতা হচ্ছে এই যোগদান ‘বিরোধী’ শিবিরে একটি বড় ‘সংকট’ তৈরি করেছে। মৌমাছিরা যেমনি একটি রানি মৌমাছিকে কেন্দ্র করে একটি ‘চাক’ তৈরি করে, ঠিক তেমনি ছোট ছোট দলগুলো বিএনপিকে কেন্দ্র করে একটি রাজনৈতিক ‘চাক’ তৈরি করেছিল। ওই ছোট দলগুলোর অনেকটিরই কোনো গণভিত্তি নেই। সংগঠনের অস্তিত্বও নেই। একজন আন্দালিব রহমান পার্থ একাই ‘একটি দল’। দলটির নিবন্ধন আছে বটে, কিন্তু এর গণভিত্তি কই? কোন কোন জেলায় কয়টি সাংগঠনিক কমিটি আছে? ব্যক্তি পরিচয়ে কোনো দল কখনো টিকে থাকতে পারে না। রাজনৈতিক ‘কমিটমেন্ট’, তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সুস্পষ্ট রাজনীতি না থাকলে যেকোনো দল ‘কাগুজে সংগঠন’ হিসেবে পরিচিতি পেতে বাধ্য। বিজেপি (পার্থর নেতৃত্বাধীন দল) এর ব্যতিক্রম নয়। বিজেপি এত দিন ‘বড় মর্যাদা’ পেয়েছে বিএনপির সঙ্গে ২০ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করার কারণেই। পারিবারিকভাবে তিনি বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর ছোট ভাইয়েরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সুতরাং পার্থর ‘ইউটার্ন’-এ আমি অবাক হইনি। এখন ২০ দলীয় জোটে যেসব দল আছে, তাদের পক্ষে বিএনপিকে বাদ দিয়ে অন্য জোট গঠন করাও তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। ফলে চূড়ান্ত বিচারে তারা বিএনপির নেতৃত্বেই আস্থাশীল থাকবে। বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়া ও সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ২০ দলীয় জোটের কেউ কেউ ‘আত্মহত্যা’ বললেও আন্দালিব রহমান পার্থর মতো অন্য কেউই ‘সাহস’ করে জোট ছাড়ার কথা বলেননি। অলি আহমদ নিজেই বলেছেন তিনি ২০ দলীয় জোটে থাকছেন। তবে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছেন কাদের সিদ্দিকী। ব্যক্তিনির্ভর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী ঐক্যফ্রন্টে অনেক অসংগতি রয়েছে এটি দাবি করে আগামী ৮ জুনের মধ্যে সেসব অসংগতি দূর করার জন্য ড. কামাল হোসেনকে একটি ‘আলটিমেটাম’ দিয়েছেন। না হলে তিনি ও তাঁর দল ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ করবে। এটি ঠিক ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। ফ্রন্টের রাজনীতি স্পষ্ট নয়। ড. কামাল হোসেনকে সামনে রেখে কিছু দলছুট নেতা, যাঁদের আবার নিবন্ধনও নেই, তাঁরা ‘একটা বড় কিছু’ প্রত্যাশা করেছিলেন। তাতে তাঁরা সফল হননি। দেখা গেল ফ্রন্টের সিদ্ধান্ত কেউ কেউ মানছে না। সুলতান মনসুর তো ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়ে প্রকাশ্যেই বলেছেন, গণফোরামের রাজনৈতিক মতাদর্শ তিনি ধারণ করেন না। ঐক্যফ্রন্টে রয়েছে হতাশা। তাঁদের অনেকের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আর এখন যদি কাদের সিদ্দিকী বেরিয়ে যান, তাহলে ঐক্যফ্রন্ট যে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। যদিও এটি সত্য, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কার্যক্রম বেশি মাত্রায় টাঙ্গাইলকেন্দ্রিক।

ব্যক্তি কাদের সিদ্দিকী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাই দলের মূল শক্তি। দলে দ্বিতীয় কোনো নেতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। ফলে একজন ব্যক্তি কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে যে দল গড়ে উঠছে, তার ভবিষ্যৎ কী? ঐক্যফ্রন্ট ত্যাগ করলেও জাতীয় পর্যায়ে দলটির আবেদন কী? দলটি শেষ পর্যন্ত একটি কাগুজে সংগঠনে পরিণত হলে রাজনৈতিক দল হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

এটি ঠিক বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদান রাজনীতির ময়দানে এক ধরনের ‘রাজনৈতিক সুনামির’ সৃষ্টি করেছে। ফ্রন্ট অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। ২০ দলীয় জোটে ভাঙন আসতে পারে। তাতে করে কি রাজনীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে? আওয়ামী লীগ তথা সরকারের অবস্থান এখন অনেক শক্তিশালী। ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই সংসদের মেয়াদ। বিএনপি তার পাঁচজন সংসদ সদস্যকে নিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য আনতে পারবে না। ঐক্যফ্রন্টের আবেদনও ফুরিয়ে গেছে। ফলে আওয়ামী লীগের অবস্থা এখন ‘ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার’ মতো। সংসদের ভেতর ও বাইরে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ আর থাকল না। সংসদে জাতীয় পার্টি বিরোধীদলীয় আসনে আছে। কিন্তু বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। উপরন্তু এরশাদের অসুস্থতা, ভাই জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় জাতীয় পার্টির ভেতরে বড় ধরনের ‘সংকটের’ সৃষ্টি করেছে। এতে রওশনপন্থীরা নাখোশ। এর প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় পার্টি যদি ভবিষ্যতে ভেঙে যায়, আমি অবাক হব না। সব মিলিয়ে বিরোধীদলীয় রাজনীতি এক রকম নেই বললেই চলে। সংসদে ও সংসদের বাইরে বিরোধীদলীয় রাজনীতি চোখে পড়ে না। সরকারের এটিই প্লাস পয়েন্ট।

 

লেখক : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

মন্তব্য