kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক

মোস্তফা মোরশেদ

১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা সংক্ষেপে প্রবৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিতর্ক চলছে। একটি দেশের মোট দেশজ অথবা জাতীয় উৎপাদনের শতকরা বৃদ্ধির পরিমাণকে প্রবৃদ্ধি বলে। শুরুতেই জানতে চাই, ঋণাত্মক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আসলে কী প্রতিফলন করে? ধরুন, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা বেড়ে গেল। ফলে কর্মচারীদের আয় বাড়ল। তারা অতিরিক্ত আয় দিয়ে বাজার থেকে নতুন সামগ্রী কিনতে শুরু করল। অথবা আগে যে প্রতিষ্ঠানে গুটি কয়েক লোক (ফ্যাসিয়াল) টিস্যু ব্যবহার করত, এখন আয় বেড়ে যাওয়ার কারণে সেখানে সবার জন্য টিস্যু সরবরাহ করা শুরু হলো। ফলে বাজারে টিস্যুর চাহিদা বেড়ে গেল। টিস্যুর চাহিদা মানে টিস্যু উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতদের আয়, এর সঙ্গে সম্পর্কিত কাঁচামাল, বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা ইত্যাদি জায়গায় চাহিদা বাড়তে থাকল। এভাবেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা বিভিন্ন সেক্টরে প্রভাব ফেলে থাকে।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে অন্তত পাঁচটি বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিমাপ করার দুটি প্রধান পরিমাপক জিএনপি (মোট জাতীয় উৎপাদন) ও জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার সময় দেশের মোট অর্থনৈতিক শক্তি পরিমাপ করতে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেটস ১৯৩১ সালে জিএনপি ধারণার প্রবর্তন করেন। পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থাকে আরো এগিয়ে নিতে নতুন চলক জিডিপি ব্যবহার শুরু হয়। জিডিপি নাকি জিএনপি—কোনটি দেশের অর্থনীতিকে পরিপূর্ণ ও বাস্তবসম্মতভাবে প্রকাশ করে, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। যদিও এখন জিএনআই দিয়ে পরিমাপ করা হয়ে থাকে, যা এ বিতর্ককে অনেকাংশেই সমাধান করেছে।

উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে ১৯৭০-৮০-এর দশকে। রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মতে দুটি ভিন্ন মতবাদ ছিল। একদল মনে করত, একটা দেশের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ও অগ্রগতির জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। অন্য দলের বক্তব্য ছিল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং অর্থনৈতিক উন্নয়নই একটি দেশের মূল লক্ষ্য। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ধরা যাক, একটি দেশের জিডিপি গত অর্থবছরে ১০০ ডলার ছিল এবং পরবর্তী বছরে জনসংখ্যার কোনো পরিবর্তন ব্যতীত তা ১০০ ডলারই আছে। অর্থাৎ, প্রবৃদ্ধি এখানে শূন্য শতাংশ এবং মাথাপিছু আয়ও সমান। প্রশ্ন জাগতে পারে, এ অবস্থায় ওই অর্থনীতিতে উন্নয়ন সম্ভব কি না? তাত্ত্বিকভাবে এ অবস্থায় উন্নয়ন সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ সেই সময়ে ওই এলাকার যত লোক রেডিও শুনত কিংবা টেলিভিশনে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখত, তাদের সংখ্যা বেড়ে গেল। হয়তো যাদের রেডিও বা টেলিভিশন ছিল, তা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছে এবং নতুনদের শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখতে তারা অনুপ্রাণিত করেছে। এ অবস্থায় বলা যায়, প্রবৃদ্ধি না বাড়লেও উন্নয়ন হয়েছে, কারণ কিছু মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তবে শর্ত থাকে, যদি কেউ রেডিও কিংবা টেলিভিশন কেনার জন্য অর্থ ব্যয় করে, তবে অবশ্যই জিডিপি পরিবর্তিত (বাড়বে) হবে। বলা বাহুল্য, আজকের দিনে বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় প্রবৃদ্ধি ব্যতীত উন্নয়ন অসম্ভব। সরকার যদি সব আয় ও পেশার মানুষের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার না দেয়, তাহলে প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক যে উন্নয়ন হবে, তা মূলত Trickle-down effect-এর মাধ্যমেই প্রকাশিত হবে।

বর্তমান অর্থনৈতিক বিশ্বে অনেক কিছু এখনো অমীমাংসিত। আবার সময়ের পরিক্রমায় কিছু কিছু বিষয়ে মতৈক্য হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বনাম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিতর্ক। বস্তুত, উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক বিষয়। খুব সংক্ষেপে, মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত যেসব চলক রয়েছে, তাদের ইতিবাচক পরিবর্তনই উন্নয়ন। এ কারণেই উন্নয়ন পরিমাপের একটি দীর্ঘ তালিকা থাকতে পারে। তবে যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বিবেচনা করা হোক না কেন, তালিকার প্রথম চলক হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। সেই বাস্তবতায় সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ না থাকলেও ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল মেয়াদে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় তা সচেতনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উন্নয়ন আলোচনায় প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্ত করলে প্রাসঙ্গিকভাবে যে বিষয়টি বিতর্কের সূত্রপাত করে, তা হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি। প্রবৃদ্ধির দুটি বিপরীতধর্মী ফলাফল রয়েছে। প্রথমত, প্রবৃদ্ধি হলেই দারিদ্র্য কমে আসে এবং দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধি হলেই অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয় এবং তা বাড়তে থাকে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। বাংলাদেশে আজ প্রায় ১৩ কোটি মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায়। কিভাবে সম্ভব হয়েছে? মোবাইল সেক্টরের অনেক প্রবৃদ্ধি হওয়ার কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। এখন নিম্ন আয়ের মানুষের কাছেও মোবাইল সহজলভ্য। কিন্তু একই সঙ্গে যাদের আয়ের পরিমাণ বেশি, তারা স্মার্টফোন ব্যবহার করছে, যেখানে কার্যত অনেক সুবিধা রয়েছে। এর ফলে এক ধরনের বৈষম্য দেখা দিচ্ছে। তবে এটি সত্য যে মোবাইল ফোন সেক্টরের অনেক বেশি প্রবৃদ্ধির কারণেই প্রায় সবার হাতে হাতে এটি পৌঁছে গেছে। মোবাইল ফোন সেক্টরের প্রবৃদ্ধির কারণে এটি যেমন সহজলভ্য হয়েছে, তেমনি প্রযুক্তির ব্যবহার ও মানের ভিন্নতার দিক থেকে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে। বলতে দ্বিধা নেই, উন্নয়ন অর্থনীতি আলোচনার সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো বৈষম্য। সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীজুড়ে অনেক প্রবৃদ্ধি হলেও ধনী-গরিব বৈষম্য পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ৮ নম্বর লক্ষ্যে প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক (Inclusive) করার কথা বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পাশাপাশি সব আয়ের মানুষের জন্য সমান অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করে সবাইকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসতে হবে। কারণ অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ব্যতীত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিংবা একজন প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল অর্জন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া অপরিকল্পিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, যা বিশ্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় প্রবৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিতর্কের যে বিষয়টি বাজেট-পূর্ববর্তী সময়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হলো প্রবৃদ্ধির পরিমাণ। বরাবরই সরকারের সঙ্গে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মতপার্থক্য দেখা যায় এবং সরকারকে অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী মনে হয়। মতপার্থক্যের এ বিষয়টি কার্যত অপ্রত্যাশিত নয়। এ কথা মনে রাখতে হবে, বাজেটে ঘোষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি মূলত একটি প্রক্ষেপণ। যেখানে অনেক error term থাকে। একটি রিগ্রেশন মডেলে error term-কে যত সহনীয়ভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেখানে নির্ভরশীল চলকের ভ্যালু তত বেশি দেখাবে। ধরুন, কোনো দেশে বন্যা হলো এবং বন্যার প্রভাব হিসাব করে দেখা গেল, সরকার যেভাবে একে মূল্যায়ন করছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেভাবে করছে না। সরকার যেখানে অনেক বেশি সহনীয়, সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অনেক বেশি অনমনীয় থাকে। আর তাই প্রবৃদ্ধি পরিমাপে পার্থক্য দেখা যায়।

এ ছাড়া জিডিপি পরিমাপের পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। আমরা জানি, জিডিপি পরিমাপে তিন ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ও অপেক্ষাকৃত সঠিক পদ্ধতি হলো ব্যয়ভিত্তিক পদ্ধতি। ব্যয়ভিত্তিক পদ্ধতিতে চারটি উপাদান রয়েছে—ব্যক্তিপর্যায়ের ভোগ, ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ, সরকারের খরচ এবং আমদানি-রপ্তানির পার্থক্য। এ চারটি উপাদান কি শতাংশ হারে হবে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। প্রায় সব আয়ের অর্থনীতির জন্য সাধারণত ব্যক্তিপর্যায়ের ভোগ মোট জিডিপির ৭০-৭৫ শতাংশ, ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগ ২০-২৫ শতাংশ, সরকারের খরচ ১০-১৫ শতাংশ, রপ্তানি ১২-১৫ শতাংশ এবং আমদানি ১৫-২০ শতাংশ। প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হয়, এখানে পরিসংখ্যানগত ত্রুটিও বিবেচনা করতে হবে। এগুলো খুব অনিয়মিত ও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ নেই। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনীতি পাঠের নিয়মবহির্ভূতভাবে এগুলো দেখানো হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তিপর্যায়ের ভোগের পরিমাণ যেকোনো উচ্চতার অর্থনীতির জন্য মোট জিডিপির ৭০ শতাংশের কম হবে না।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে যা-ই বিতর্ক হোক না কেন, বর্তমান পৃথিবীর উৎপাদন পদ্ধতি এবং বিশ্বায়নের কারণে একে অস্বীকার করার উপায় নেই। বরং সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে দেশের টেকসই উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে এটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার রূপকল্প ২০৪১-এর আলোকে ‘উন্নত বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে আমাদের আশাবাদী করে তোলে।

লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

[email protected]

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা