kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

বাসে গণধর্ষণ : কবে শেষ হবে এই ঘৃণ্য অপরাধ

ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া

১৭ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাসে গণধর্ষণ : কবে শেষ হবে এই ঘৃণ্য অপরাধ

সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্স বলেছিলেন, জীবনের চারটি জিনিস ভাঙার সময় কোনো ধরনের শব্দ হয় না, কিন্তু এর পরিণাম হয় খুবই বেদনাদায়ক। তা হলো—বিশ্বাস, সম্পর্ক, প্রতিজ্ঞা ও চরিত্র। এগুলোর মূল শিকড় প্রোথিত পরিবার ও সমাজে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধে যদি পচন ধরে, তাহলে ব্যক্তির এ ধরনের মানবিকবোধগুলোর অহর্নিশ ক্ষয় হয় নীরবে, নিভৃতে। তখন এক ভয়ানক পশুবৃত্তি আর পাশবিকতা বেড়ে ওঠে ব্যক্তির মনোজগত্জুড়ে। সাম্প্রতিককালে গণপরিবহন, বিশেষত বাসে নারীদের গণধর্ষণ, অতঃপর হত্যা এ দেশে একটি ঘৃণ্য, অভিশপ্ত প্রবণতার জন্ম হয়েছে। সেই অভিশপ্ত প্রবণতার শিকার আমাদের রূপা আর শাহীনুররা। ঘটনা ঘটার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়, তার পরও কেন জানি ঘটনা যেন কিছুতেই থামছে না। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী চলতি মাসের প্রথম আট দিনে সারা দেশে ৪১টি শিশু ধর্ষণ এবং তিনটি শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। শুধু মে মাসের ১ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত দেশে ৩৭টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে তিনটি শিশু। এখন ধর্ষকরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, সঙ্গে নির্যাতিত নারী ও শিশুর জানও কবজ করে নিচ্ছে অবলীলায়। এটা কি নির্মম পাশবিকতার শেষ সীমানা নয়?

‘গণধর্ষণ’—এ অভিশপ্ত ঘটনার হাত থেকে কেউ প্রাণে বেঁচে গেলেও জীবনের সঙ্গে মৃত্যু অবধি জড়িয়ে থাকে এক দুঃসহনীয় স্মৃতি। বহমান সমাজ ‘চরিত্র’ ভুক্তভোগীর দগদগে ক্ষত নিরাময়ে নয়, বরং ক্ষত খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে প্রতিনিয়ত। এ কারণে কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। দেশে নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা এত তীব্রতর হচ্ছে মূলত সুবিচারের অভাবে। একটি দৈনিক পত্রিকার অনুসন্ধানে দেখা যায়, ধর্ষণ, যৌন পীড়নের মতো ছয়টি নির্দিষ্ট অপরাধে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সাজা হয়নি। ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিগত ১৫ বছরে দায়ের করা সাত হাজার ৮৬৪টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই ফলাফল পাওয়া গেছে। তাই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্ত তিন বছরেও শেষ হয় না। এমনকি ওই মামলার আসামিও শনাক্ত হয় না। যখন একজন দেখবে, এ ধরনের চরম মাত্রার অপরাধ করেও পার পাওয়া যাচ্ছে, তখন এ অভিশপ্ত প্রবণতা ঠেকাবে কে? বিচারহীনতার রেশ ধরেই ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রূপা খাতুনকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়। মাত্র ১৪টি কর্মদিবসের মধ্যে রূপা খাতুন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে চারজনের ফাঁসির আদেশ এবং একজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু রায়ের পর ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলাটির আপিল নিষ্পত্তি হয়নি।

চলতি মাসের ৬ তারিখে স্বর্ণলতা নামক চলন্ত বাসে সেবিকা শাহীনুর আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে সেবিকা হিসেবে কাজ করতেন শাহীনুর। তাঁর গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলায়। ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় গজারিয়া নামক স্থানে যাত্রীবাহী বাসে ধর্ষণের শিকার হন শাহীনুর। চালক নুরুজ্জামান, চালকের সহকারী লালন মিয়াসহ তিনজন ধর্ষণ করে তাঁকে। এরপর শাহীনুরকে বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়। ধর্ষণ ও হত্যাকে লুকাতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেয় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। সব শেষে আদালতের কাছে অপরাধের কথা স্বীকার করতে হয়েছে অপরাধীদের। মনের অজান্তেই আবার প্রশ্ন জাগে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হবে তো? নাকি কোনো এক ফাঁদে এটাও আটকে যাবে বিচারহীনতার সারিতে! এ প্রশ্ন উঠেছে এক যৌক্তিক কারণে। শাহীনুর যেদিন গণধর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হন, সেদিন রাতেই পুলিশ বাসের চালক, হেলপারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। আদালতের অনুমতিক্রমে তাদের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। কিন্তু পরের দিন গভীর রাতে বাজিতপুর থানায় শাহীনুরের বাবা কর্তৃক দায়েরকৃত এজহারে দেখা যায়, রিমান্ডে থাকা পাঁচজনের মধ্যে দুজনের নাম নেই। অভিযোগ আছে, বাদীকে চাপ দিয়ে এই দুজনের বদলে অন্য একজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

ইতিহাস বলে সব সমাজেই অপরাধী ছিল, আছে এবং থাকবে। একই সঙ্গে থাকবে ভালো মানুষও। সমাজ তখনই সভ্য হয়, যখন খারাপের তুলনায় ভালো মানুষের আধিক্য থাকে। কিন্তু আমাদের বহমান সমাজব্যবস্থায় কেন জানি ভালোর চেয়ে খারাপের ছায়াটাই বেশি। অপরাধীর থাকে অনেক সমর্থক। দেখা যায় পাবলিক বাসে নারীদের নির্ধারিত আসনে অনায়াসে পুরুষ মানুষ বসে যায়। কিছু বললেই চলে বাগিবতণ্ডা। এ সময় বাসে আসনরত একটি শ্রেণি বাগিবতণ্ডার মাঝখানে নারী-পুরুষের সীমারেখা টেনে দেয়। এ প্রক্রিয়ায় নারীর প্রতি এক শ্রেণির পুরুষ মানুষের নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়। এটিও পরবর্তী সময়ে সমাজে এক ধরনের সামাজিক ব্যাধি তৈরি করে। ব্র্যাক কর্তৃক পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়,  গণপরিবহনে যাতায়াতকালে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময়ে মৌখিক, শারীরিক বা অন্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়। সাম্প্রতিককালে পরিবহন খাতে যে অপরাধটি সবচেয়ে ভয়াবহতা পেয়েছে, তা হলো বাস কর্মচারীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা, যা নারীদের প্রাত্যহিক জীবন বিষিয়ে তুলছে। এ ধরনের অভিশপ্ত ঘটনাগুলোকে আবার ‘ছায়া’ দিয়ে যায় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং পরিবহন মালিকদের অর্থ-বিত্ত ও সামাজিক সংযোগের জোর। আর মাঝখানে থাকে একটি শ্রেণি, যারা এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে নেয়। গণপরিবহনে এ অভিশপ্ত প্রবণতা দূরীকরণে সবার আগে প্রয়োজন এই ত্রিচক্র, যথা শ্রমিক ইউনিয়ন, পরিবহন মালিক ও মাঝখানের অশুভ শক্তির ‘ছায়া’কে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। প্রাথমিক পর্যায়ে এ অপরাধ দমনে গণপরিবহনে সিসিটিভি লাগানোসহ বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প সরকারের হাতে নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি গণপরিবহনে কারো কোনো বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে হেল্পলাইন ১০৯ নম্বরে ফোন দেওয়া বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশের বেকার যুবকরা যদি বর্তমান সময়ে সব শ্রেণির মানুষের কাছে যাতায়াতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা উবার, পাঠাও চালনার পাশাপাশি গণপরিবহনেও হাল ধরে, তাহলে বাসে গণধর্ষণ এই অভিশপ্ত প্রবণতা কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে। 

লেখক : প্রশিক্ষক ও সমাজকর্মী

[email protected]

মন্তব্য