kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ময়লা, লেখা ও ছেঁড়া নোট নিয়ে কিছু নৈতিক প্রশ্ন

মোয়াজ্জেম হোসেন খান

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ময়লা, লেখা ও ছেঁড়া নোট নিয়ে কিছু নৈতিক প্রশ্ন

ইদানীং একটি কথা বেশ শোনা যাচ্ছে : ‘বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে বা অর্জন করেছে। ২০২১ সাল নাগাদ তা টেকসইভাবে অর্জিত হবে। ২০৪১ সাল নাগাদ আমাদের দেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে।’ শুনতে ভালোই লাগছে। কেউ কেউ এমন প্রত্যাশা করছেন যে ২০৩০ সাল নাগাদই নাকি আমাদের দেশ উন্নত দেশ হবে। অবশ্যই আমরাও এ ব্যাপারে আশাবাদী হতে চাই। তবে একটি জায়গায় আমার একটু খটকা লাগছে। আর তা হচ্ছে এই যে সব কিছুই কিন্তু করা হচ্ছে শুধু মাথাপিছু আয়কে বিবেচনায় নিয়ে। এটা ঠিক হচ্ছে না। কারণ বর্তমানে উন্নয়ন পরিমাপের সর্বজনগ্রাহ্য সূচক হচ্ছে মানব উন্নয়ন সূচক বা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স। কাজেই একটা দেশ উন্নত কি উন্নয়নশীল তা পরিমাপ করতে হলে মানব উন্নয়ন সূচকের ভিত্তিতেই করতে হবে। মাথাপিছু আয় দ্বারা নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেরই মাথাপিছু আয় উন্নত অনেক দেশের তুলনায় বেশি অথবা সমান। তাই বলে কি তারা সবাই উন্নত দেশ? মোটেও না। সাধারণ মানব উন্নয়ন সূচকে তারা অনেক পিছিয়ে আছে, এমনকি আমাদের দেশের চেয়েও পিছিয়ে আছে। এ সূচকে প্রথম দিকে রয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, বিশেষ করে ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড। আর নিচের দিকে রয়েছে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। মাঝামাঝির চেয়ে একটু নিচে আছি আমরা। এদিক থেকে আমাদের দেশ বর্তমানে ১৩০-এর কোঠায় অবস্থান করছে।

আসলে একটি দেশের অগ্রগতি হচ্ছে কি না, এগোচ্ছে কি না তা একমাত্র মানব উন্নয়ন সূচক দ্বারাই ভালো পরিমাপ করা যায় বা বোঝা যায়। দেশের গোটা আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ দিয়ে যা পাওয়া যায় তাতে কখনোই প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে না। কারণ এ প্রক্রিয়ায় সরল অঙ্ক কষে বড় বড় ধনীর আয় দরিদ্র মানুষের মাথায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। এটা এক ধরনের প্রবঞ্চনা। একমাত্র সমতাধর্মী বণ্টনকৃত আয়ের দেশ তথা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে মাথাপিছু আয় দেশের প্রকৃত উন্নয়নের নির্দেশক হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে। আর কে না জানে যে এসব দেশে অবশ্যই মানব উন্নয়ন সূচককে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।

মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতি ঘটলে একটি দেশের সব ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটে, বিশেষ করে সংস্কৃতিগত রূপান্তর নিশ্চিত হয়। সংস্কৃতি বলতে শুধু গান, বাদ্য, সিনেমা, নাটক বা শিল্পকলার বিকাশকেই বোঝায় না। নাগরিকদের আচার-আচরণের সংস্কৃতি, কাজের সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার সংস্কৃতি ইত্যাদিরও বিকাশ তথা রূপান্তর ঘটতে হবে অবশ্যই। এ প্রসঙ্গে আমাদের দেশের বাজারে প্রচলিত ময়লা, ছেঁড়া ও লেখাযুক্ত কাগজের টাকার নোট সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। প্রথমেই বলতে চাই, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের কর্মচারী এবং কর্মকর্তাদের আচরণ ও কর্ম সম্পর্কে : ১. তাঁরা টাকার বান্ডেলের প্রথম ও শেষ নোটটির (নতুন) ওপর নিজের দস্তখত বা সই করেন তারিখসহ, ২. ভারী গজদন্ত শামিল স্ট্যাপলার মারেন টাকার বান্ডেলগুলোতে। প্রশ্ন হচ্ছে; তাঁরা কি এ কাজগুলো করতে পারেন? কে তাঁদের এ অধিকার দিয়েছে? লিগ্যাল টেন্ডারে (কাগজের) একমাত্র গভর্নরের স্বাক্ষর থাকবে। তাহলে গভর্নরের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও কেন সই বা স্বাক্ষর দিচ্ছেন? ঘটনা এ রকম দাঁড়াচ্ছে যে তাঁরাও সবাই একেকজন গভর্নর বনে যাচ্ছেন। এটা  সম্পূর্ণই বেআইনি কর্মকাণ্ড বা আচরণ। অনৈতিক তো বটেই। দ্বিতীয়ত, টাকাকে ভারী স্ট্যাপলার দিয়ে খুন করার মতো অধিকার তাঁদের কে দিয়েছে?  এটা অনেকটাই স্বেচ্ছাচারী আচরণ। কোনো অজুহাত এ ক্ষেত্রে কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আপনি আচরী ধর্ম অন্যকে শিখান। আর মনীষী শেকসপিয়ার সম্ভবত এ জন্যই তৎকালীন (মধ্যযুগীয়) রাজা-রানি ও বাদশাহদের স্বেচ্ছাচারী আচরণকে কটাক্ষ করে লিখেছিলেন : ‘দেশের রাজা যদি অন্যায়ভাবে ডিম অমলেট করে, তাহলে প্রজারা করবে মুরগি রোস্ট।’ অর্থাৎ মাথা যদি অসদাচরণ করে, দুর্নীতি করে, অন্যায় করে, তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের অনুসরণে অনুরূপ কাজ করবে আজান দিয়ে অবলীলায়। আমাদের দেশে নোটের ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটিই ঘটছে। যেহেতু ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা করছেন, সেহেতু সাধারণ মানুষও মনে করছে বা ধরে  নিচ্ছে যে এ কাজটি করাই যায়, করায় কোনো আইনগত বাধা নেই বা শাস্তির ভয়ও নেই। মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী যে গর্হিত কাজটি করছেন সেই কাজটিই দেশের সাধারণ মানুষ করছে হাজার গুণ, লক্ষ গুণ বেশি হারে। শুধু তা-ই নয়। তারা (সাধারণ মানুষ) টাকার ওপর স্বাক্ষর ও তারিখ দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না। তারা এর ওপর মোবাইল নম্বর লিখছে, প্রেমিক-প্রেমিকার নাম পর্যন্ত লিখছে, বিশেষ করে যুবসমাজ। এটা যে একটি গর্হিত এবং অনৈতিক কাজ এ বোধ জ্ঞানটুকু পর্যন্ত তারা হারিয়ে ফেলছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে টাকার গুরুত্ব অপরিসীম। পানি বা জলের অপর নাম যেমন জীবন। ঠিক তেমনি টাকার অপর নাম জীবন বললে অত্যুক্তি হবে না। টাকা ছাড়া আমাদের জীবনের চাকা এক মুহূর্তের জন্যও ঘুরবে না। আর সেই টাকাই আমরা অবলীলায় অবজ্ঞা করে যাচ্ছি, তাচ্ছিল্য করছি, অপমান করছি। কাজটি যে কতটা অনৈতিক সে কথা আমরা ভুলেও ভাবছি না। ভাবার প্রয়োজনও বোধ করছি না।

টাকাকে খুন করে (স্ট্যাপলার করে) টাকার আয়ু কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এতে অল্প সময়ে আবার টাকা ছাপানোর প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। আর টাকা ছাপাতে খরচ আছে। বিষেজ্ঞরা বলছেন যে পাঁচ টাকার নোট ছাপাতে নোটপ্রতি সাত-আট টাকা, ১০ টাকার নোট ছাপাতে ১২-১৩ টাকা নাকি খরচ হচ্ছে। বড় মানের নোট ছাপাতে অপেক্ষাকৃত কম খরচ হচ্ছে। মোট কথা হচ্ছে : টাকা ছাপার খরচ আছে এবং বিদ্যমান প্রযুক্তির যুগে তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈ কমছে না। কারণ নকল রোধে বহু নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করতে হচ্ছে টাকায়। অতএব আসুন আমরা আমাদের জীবন টাকাকে আর অপমান না করি, তাকে যত্ন করি, লেখামুক্ত, দাগমুক্ত ও পরিষ্কার রাখি। টাকাকে পরিষ্কার জায়গায় বহন করি, সংরক্ষণ করি। সতর্ক হই! দেশাত্মবোধের পরিচয় দিই।

এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি এখন টাকার বা নোটের অবিভাবক তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের করণীয় সম্পর্কে কিছু বলতে চাই :

১। বাংলাদেশ ব্যাংককে অবিলম্বে টাকাকে খুন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অর্থাৎ টাকা স্ট্যাপলার করা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। ‘টাকা খুন করা, টাকার ওপরে দাগ দেওয়া, লেখা ইত্যাদি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ’: এই মর্মে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দেশনামা জারি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তা সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের কাছে প্রেরণ করবে। কোনো রকম ব্যত্যয় ঘটলে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

২। অহরহ অজুহাত দাঁড় করানো হয় যে স্ট্যাপলার করলে টাকা চুরি হবে না। এ রকম খোঁড়া অজুহাত কোনোক্রমেই গ্র্রহণযোগ্য নয়। কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে এ রকম অজুহাত দেওয়ার সাহস কেউ দেখাতে পারত না। এখন টাকা গোনার অত্যাধুনিক মেশিন আছে। অতএব বান্ডেলে টাকা কম হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কম হলে যেখানে কম হলো সেখানে বা সেই স্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এর জন্য দায়ী থাকবেন। আমি ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ সফর করেছি। কোথাও এ রকম খোঁড়া অজুহাত শুনিনি এবং টাকার বান্ডেল স্ট্যাপলার করতেও দেখিনি। বরং দেখেছি যে খুন করা (ফুটো করা), দাগ বা লেখাযুক্ত এবং ছেঁড়া টাকা বা নোট সেখানে অচল। কেউ-ই নেয় না। এমন কি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই ছেঁড়া বা লেখাযুক্ত কোনো নোট দেখিনি। একসময় ছিল যখন ভারতে দুই রুপির ও পাঁচ রুপির নোট খুব ছেঁড়া ও ময়লাযুক্ত ছিল। তারা এ সমস্যার সমাধান করেছে এভাবে : এ নোটগুলো তুলে নিয়ে ধাতব (মেটালিক) মুদ্রার প্রচলন ঘটিয়েছে। অবশ্য পাঁচ রুপির নোট এখনো আছে। দুই রুপির একেবারেই নেই। ছোট মানের টাকার হাতবদল বেশি হয়, বড় মানের অপেক্ষাকৃত কম। আমাদেরও : ১, ২, ৫, ১০ ও ২০ টাকা মানের নোটের বদলে ধাতব মুদ্রার প্রচলন করতে হবে। এতে করে ওইসব নোট ছাপানোর খরচ কমবে এবং আয়ু দীর্ঘস্থায়ী হবে।

৩। একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে (তিন-ছয় মাস) বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করবে এই মর্মে : ‘যেকোনো লেনদেনে ছেঁড়া, ময়লাযুক্ত, ফুটোযুক্ত (স্ট্যাপলার করার ফলে সৃষ্ট) এবং লেখা দাগযুক্ত টাকা বা নোট নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। তিন মাস বা ছয় মাস (সার্কুলারে যেটা থাকবে) পরে এ ধরনের নোট কেউ লেনদেনে গ্রহণ করবে না। এর ব্যত্যয় ঘটালে শাস্তির বিধান করতে হবে।

আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমরা পুরোপুরি উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হব হয়তো। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হবে আমাদের মাতৃভূমি। অতএব আমাদের আচার-আচরণ ও সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আবশ্যক। শুরু হোক সেটা ছেঁড়া, ময়লা, ফুটো, দাগ ও লেখামুক্ত নোট দিয়ে।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা