kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

যানজটের দুর্ভোগ থেকে নগরবাসীর মুক্তি কিভাবে

হীরেন পণ্ডিত

১৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যানজটের দুর্ভোগ থেকে নগরবাসীর মুক্তি কিভাবে

রাজধানীর অসহনীয় যানজট এবং জনদুর্ভোগের চিত্র এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই যানজটে নাকাল হতে হচ্ছে সবাইকে। যানজট নিরসনে সর্বত্র আলাপ-আলোচনা হয়; কিন্তু কার্যত কিছুই হয় না। করণীয় নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে কোনো ক্ষেত্রেই আমরা কার্যকর সুফল পাইনি। দুটি ‘অফিস আওয়ার’ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০০৯ সালে। তখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আলাদা সময়সূচিতে অফিস পরিচালনার জন্য বলা হয়েছিল। এতে একই সময়ে গাড়ির চাপ অনেকটাই কমে আসত। কিন্তু সেই নির্দেশনা কাগুজে বুলির মতো কথার কথাই রয়ে গেছে। কেউ একে পালন করা বা পাত্তা দেওয়ার মতো কোনো প্রয়োজনই বোধ করেনি। সরকারের একটি আদেশ যে সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না সে ব্যাপারেও কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। যানজটে নাকাল হচ্ছে রাজধানীবাসী। সময় নষ্ট হচ্ছে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। অথচ কেন জানি যানজট কমছে না, ২০০৯ সালের আদেশটি কেন মানা হচ্ছে না—এ বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কোনো রকম মাথাব্যথা আছে বলেও মনে হয় না।

যানজট নিরসনে ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফা সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছে; কিন্তু এর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। যানজট নিরসনে সরকারি নির্দেশনা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সব কিছুই চলছে ফ্রিস্টাইলে। একই এলাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে শ্রেণি কার্যক্রম নির্ধারণের সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষিত থাকছে। দেখা গেছে, কিছু এলাকায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো একই সময়ে শুরু হচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আসা গাড়ি, রিকশা ও বিভিন্ন যানবাহন প্রায় একই সময়ে একই এলাকায় প্রবেশ করছে। এতে অসহনীয় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় এ ধরনের দৃশ্য নিত্যদিনের। তা ছাড়া বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা ও স্কুলের পরীক্ষার সময় এ ভোগান্তি আরো বৃদ্ধি পায়। যানজটের এ রেশ প্রধান সড়ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

যানজটের এই অসহনীয় দুর্ভোগ কমাতে শুধু যত্রতত্র উড়াল সেতু আর মেগা প্রজেক্টের আয়োজন করলেই হবে না। সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে সঠিক ও যথার্থ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে। পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না সে ব্যাপারেও খোঁজখবর রাখতে হবে। ২০০৯ সালের যে অফিস আওয়ার নির্ধারিত হয়েছিল, তা মানা হলে ট্রাফিক ব্যবস্থা কী হতো, সেটি জানার উপায় নেই। কারণ কেউই এই নির্দেশ মানেনি। কেন সেটি এত বছরেও মানা হলো না, আমরা মনে করি এখনই সেটি খুঁজে বের করা দরকার। একই সঙ্গে যানজট নিরসনে আরো কয়েকটি নির্দেশনা এভাবে মাঠপর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। যানজট এখন দেশের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। তাই এই সমস্যা নিরসনে সরকারকে অবশ্যই আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। যানজটকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার সব রকম পথ উন্মুক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো রকম হেলাফেলার সুযোগ নেই।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সফলতা দাবি করলেও যানজট থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্তি দিতে পারেনি। কোনো নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করলে যানজট যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলবে এমন কোনো আশ্বাস বাণীও শোনাতে পারছে না নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। বিভিন্ন সময়ে ট্রাফিক বিভাগ এ সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেছে, যানজট নিরসনই এখন নগর পুলিশের চ্যালেঞ্জ। এই যানজট এক দিন, দুই দিনে সৃষ্টি হয়নি। এই যানজট সৃষ্টি হয়েছে বহু বছর ধরে। ঢাকার যানজট নিরসনে সরকার বা ট্রাফিক পুলিশ বহু উদ্যোগ নিলেও কোনো উদ্যোগই কাজে আসেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও যানজট রয়েছে। কিন্তু রাজধানী ঢাকার মতো এত ভয়ংকর নয়। রাজধানীর যানজট সমস্যা সমাধান তো হচ্ছেই না, উল্টো দিন দিন বাড়ছে। বলা যায়, দিন দিন যানজট পরিস্থিতির উত্তরোত্তর অবনতি ঘটছে।

একটি আধুনিক নগরীতে মোট আয়তনের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ রাস্তা বা সড়ক থাকা প্রয়োজন। অথচ ঢাকা শহরে প্রয়োজনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সড়ক রয়েছে। ঢাকা শহরের মোট আয়তন এক হাজার ৩৫৩ বর্গকিলোমিটার। আর ঢাকার বর্তমান রাস্তার আয়তন দুই হাজার ২০০ কিলোমিটার, যার মধ্যে ২১০ কিলোমিটার প্রধান সড়ক। ট্রাফিক বিভাগের হিসাব মতে, সেই সড়কের কম করে হলেও ৩০ শতাংশ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং বিভিন্ন দখলদারের হাতে। যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ অটোমেটিক সিস্টেম বের করলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। উল্টো যানজট বেড়েছিল। বর্তমানে হাতের ইশারায়ই ট্রাফিক সিগন্যালগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।

জনসংখ্যার তুলনায় রাস্তার স্বল্পতা এবং স্বল্পগতির অযান্ত্রিক যানবাহনের আধিক্যকে এ সমস্যার জন্যও দায়ী করা যায়। এ ছাড়া ট্রাফিক আইন না মানা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব, ফুটপাত দখল, প্রাইভেট কারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যানজটের কারণ হিসেবে ভাঙাচোরা রাস্তা এবং কারণে-অকারণে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকেও দায়ী করা হয়। যেখানে-সেখানে পার্কিং ও ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর মতো সমস্যা তো রয়েছেই।

যানজট রাজধানীর নগরজীবনকে শুধু বিপর্যস্ত করে তুলছে তা নয়, ঢাকাকে বসবাসের অযোগ্য হিসেবেও পরিচিতি এনে দিয়েছে। রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশকে একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। সবাইকে রাস্তায় চলাচলে ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করতে হবে। ফুটপাত থেকে দোকানপাট উঠিয়ে দিতে হবে। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং বন্ধ করতে হবে। স্বল্পগতির রিকশা ও প্রাইভেট কারের আধিক্য কমাতে হবে। অটো সিগন্যালিং সিস্টেম গোটা রাজধানীতে চালু করতে হবে। পুরো রাজধানীকেই একটি অভিন্ন সিস্টেমে আনতে হবে। কোথাও অটো সিগন্যালিং আবার কোথাও লাঠি-বাঁশি দিয়ে করলে চলবে না। রাজধানীর সব জায়গায়ই অটো সিগন্যালিং ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোটাতে চলবে, কোনোটাতে চলবে না—এমন সিস্টেম বাদ দিতে হবে।

ঢাকা শহরে যানজটে মানুষ যখন অতিষ্ঠ, কাজে যাওয়ার পথে কিংবা সারা দিনের কাজ শেষে ঘরে ফেরার পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জীবন থেকে চলে যায় প্রতিদিন, তখন উল্টো পথে যে গাড়িগুলো যায়, সেগুলোতে থাকেন ভিআইপিরা। এই ভিআইপিদের কারণে উল্টো পথে চলাচল বিঘ্নিত হয়, যানজট আরো বাড়ে। তাঁদের জায়গা দিতে গিয়ে মানুষের যন্ত্রণা আরো বৃদ্ধি পায়।

ঢাকা শহর এখন গাড়ির শহর। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর প্রায় ৪০ শতাংশ সড়ক দখল করে রাখে ব্যক্তিগত গাড়ি, চলাচল করে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে বড়জোর ১ শতাংশ ভিআইপি। এর বাইরে ৪২ শতাংশ মানুষ চলে বাসে, ৪০ শতাংশ মানুষ রিকশায়। বাসের অবস্থা আমরা সবাই জানি। ঢাকা মহানগরীতে নতুন ভবন, নতুন গাড়ি, নতুন বিলবোর্ড—সবই আছে; কিন্তু বেশির ভাগ মানুষের জন্য যে বাস, সেখানে প্রাচীন, বাতিল, ভাঙাচোরারই আধিক্য। ঢাকা শহরের আয়তন অনুযায়ী সড়ক যা থাকার কথা, তার অর্ধেকও নেই। যে বাসগুলোর ঢাকায় চলা বেআইনি, ফিটনেস ছাড়া সেসব বাস কিভাবে চলতে পারে, তা বোধগম্য নয়। মাঝেমধ্যে ধরপাকড়ে শুধু টাকা-পয়সার লেনদেন বাড়ে। শুধু বাসের ক্ষেত্রে নয়, লঞ্চের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। পরিবহনের ক্ষেত্রে নৈরাজ্যের জন্য প্রতিদিন রেকর্ড সংখ্যায় হতাহত হয় মানুষ। বর্তমানে হরহামেশাই দুর্ঘটনা ঘটছে ঢাকা শহরেও। আমরা এগুলো থেকে পরিত্রাণ চাই। অফিসে যাওয়ার সময়, বাসায় ফেরার সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আর রাস্তায় কাটাতে চাই না। এর জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং রাজধানীবাসীকে যানজটের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক

[email protected]

 

 

মন্তব্য