kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

গবেষণা ছাড়া উচ্চশিক্ষা অর্থহীন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

১৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



গবেষণা ছাড়া উচ্চশিক্ষা অর্থহীন

উন্নত দেশগুলোতে গবেষণা উচ্চশিক্ষার আবশ্যকীয় অংশ। তাদের কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণার সঙ্গে শুরু থেকে পরিচিত করানো হয়ে থাকে। গবেষণাপদ্ধতি একটি কোর্স হিসেবে তা তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা থাকে। পাশাপাশি বিষয়টি কে কিভাবে গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ধারণ করবে, সেটিও প্রায়োগিকভাবে রাখার ব্যবস্থা থাকে। শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট গবেষণার সঙ্গে নিজেরা শুধু পরিচিত হয় না, নিজেদের যুক্ত করতে বাধ্য হয়। আমার মনে আছে, আমি যখন মস্কোর গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলাম তখনই ‘কোর্স পেপার’ নামে একটি আবশ্যকীয় বিষয় ছিল, যা নিয়ে কাজ করার জন্য আমাদের বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হলো। উল্লেখ করা হলো যে আমরা যে যে বিষয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে। আমরা যথারীতি সব শিক্ষার্থী নিজের পছন্দ অনুযায়ী বিষয় নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কাজ শুরু করি। প্রতিবছরই এ ধরনের একটি করে ‘কোর্স পেপার’ বাধ্যতামূলক ছিল। এটি করতে গিয়ে আমরা গবেষণার প্রাথমিক ধারণা যেমনিভাবে লাভ করি, একই সঙ্গে ২০ থেকে ২৫ পৃষ্ঠার একেকটি গবেষণাপত্র লেখার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি। সর্বশেষ মাস্টার ডিগ্রি অর্জনের জন্য একটি থিসিস চূড়ান্ত গবেষণাপত্র হিসেবে ছয় মাস সময় নিয়ে নির্ধারিত বোর্ডে উপস্থাপন করেই শুধু ডিগ্রি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। অনেক দেশে এটিকে কেউ টার্ম পেপার, কেউ রিসার্চ পেপার ইত্যাদি নামে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারণ করে থাকে।

মূলত গবেষণার সঙ্গে প্রথম বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত প্রতিবছরই একটি করে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করার মাধ্যমে শিক্ষার্থী কিভাবে যেকোনো বিষয়কে তথ্য-উপাত্ত, তত্ত্বীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, নিজের লেখার দক্ষতা, চিন্তায় যৌক্তিকতা ও বিষয়ের গভীরতা ইত্যাদি অর্জন করতে হয়, তা এ ধরনের নিয়মিত গবেষণাপত্র লেখা ও উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব হয়। বস্তুত যেকোনো বিষয়ে উচ্চশিক্ষায় পড়তে গিয়ে সেই বিষয়ের কোনো না কোনো অংশ নিয়ে শিক্ষার্থী যদি লেখা, চিন্তা-ভাবনা করা, তত্ত্বীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে পদ্ধতিগতভাবে উপস্থাপন করতে না শেখে, তাহলে উচ্চশিক্ষায় চার-পাঁচ বছর সে যেসব বই-পুস্তক পড়েছে, সেগুলো তাদের শিক্ষক কিংবা বিশেষজ্ঞরা কিভাবে রচনা করেছেন, সেটি জানা মোটেও সম্ভব হয় না। মূলত উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীর চিন্তার ফ্যাকাল্টির বিকাশ সাধনে এর কোনো বিকল্প নেই। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীরা শুধু তার বিষয়ে ১৫ থেকে ২০টি পত্র বা ১২০ ক্রেডিটের পরীক্ষা দিয়ে পাস করে যাবে, এটি কোনো অবস্থাতেই এখন আর উচ্চশিক্ষার বিষয় হতে পারে না, বরং উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নকালে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মৌলিক চিন্তা, জ্ঞান ও দক্ষতা ইত্যাদি সৃষ্টি করতে হলে হাতে-কলমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে গবেষণাপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হতেই হবে। তাহলেই শুধু উচ্চশিক্ষা শেষে সে একজন বিষয়-বিশেষজ্ঞ হওয়ার সুযোগ লাভ করবে।

উচ্চশিক্ষা এমন শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রাথমিকভাবে গড়ে তোলার সুযোগ করে দেওয়া হয়। কেউ যদি আরো বেশি আগ্রহী হয়, তাহলেই সে শুধু এমফিল-পিএইচডির মতো উচ্চতর গবেষণায় নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, উচ্চশিক্ষার প্রথম বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত সময়ে যদি টার্ম পেপার, কোর্স পেপার, রিসার্চ পেপার ইত্যাদি মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীকে লেখালেখি করার পদ্ধতিগুলো শিখিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে তার পক্ষে মৌলিক চিন্তার গবেষণাপত্র রচনার শৈলী আত্মস্থ করা মোটেও অসম্ভব বিষয় নয়। একজন সংগীতশিল্পীকে যেমন শাস্ত্রীয় গানের রাগ, তাল, লয়, সুর ইত্যাদি সঠিকভাবে শেখা ও চর্চা করতে হয়, ঠিক একইভাবে একজন উচ্চশিক্ষার সনদ লাভকারী শিক্ষার্থীকে বিশেষজ্ঞ হতে হলে তাকেও বিষয়ের গবেষণার পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। এটি হলো তার বিষয়ের বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রত্যক্ষ প্রণোদনা, যা তাকেও গবেষক হিসেবে গড়ে তোলার রীতিনীতি সম্পর্কে সচেতন করে, দক্ষ করে তোলে। এমন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত বিশেষজ্ঞরাই দেশের আর্থ-সামাজিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইত্যাদির নানা ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী শক্তির সঞ্চয় করতে পারে।

বস্তুত গবেষণা হচ্ছে উচ্চশিক্ষায় বিশুদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী হওয়ার উপায়। এমনিতে অনেকেই লেখালেখি করতে পারে; কিন্তু প্রতিটি বিষয়ের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই শুধু সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রাখার মতো দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। আমাদের সমাজব্যবস্থা, মানুষ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন, মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি নিয়ে উচ্চশিক্ষায় অনেক বিষয় রয়েছে। সেখান থেকে যদি গবেষক সৃষ্টি করা না হয়, তাহলে এসব বিষয়ে গবেষণা করবে কে? গবেষণা না হলে সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে, তা আমরা জানব কিভাবে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমস্যাকে চিহ্নিত করা, সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও উন্নতি করতে হলে আমাদের ব্যাপকসংখ্যক বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত গবেষকের দরকার। কিন্তু আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণার বাধ্যবাধকতাটি সর্বত্র সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। সে কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সনদ লাভ করেও বিষয়-বিশেষজ্ঞ হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের অনেকেই গবেষণার লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত না। ফলে যেকোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা, সমস্যার কার্যকরণ খুঁজে বের করা, এর সমাধানের উপায় তুলে ধরা ইত্যাদির ক্ষেত্রে বেশ ঘাটতি লক্ষ করা যায়। এটি আমাদের উচ্চশিক্ষার মস্ত বড় দুর্বলতা।

আমাদের উচ্চশিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও মাস্টার্স পর্যায়ে শিক্ষাদানের জন্য দেশের প্রায় ৮০০ কলেজ, ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ১০০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এক হাজার ২৮৫টি আলিয়া মাদরাসা এবং ৫০০টি কওমি মাদরাসা রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন বিষয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক ও মাস্টার্স পর্যায়ে পড়াশোনা করছে, ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, কিছুসংখ্যক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং অল্প কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস পেপার বলে একটি ব্যবস্থা রয়েছে। সেটিও সর্বত্র খুব সিরিয়াসলি বাধ্যতামূলকভাবে হয় না। কলেজগুলোতে গবেষণার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, থিসিস পেপারের কোনো প্রচলন নেই। কলেজে কর্মরত শিক্ষকদেরই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ ঘটে না। মাদরাসাগুলোর কোনোটিতেই গবেষণার কোনো প্রচলন নেই। ফলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সনদ নিয়ে বের হয়, তারা লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মোটেও সুযোগ পায় না। রিসার্চ পেপারের পদ্ধতিগত পড়াশোনা, সেটি তাদের কল্পনার বাইরেই থাকে। এ কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের লেখালেখি করার খুব একটা দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না। সাংবাদিকতায় যারা হয়তো যুক্ত হয় তারা কিছুটা সাধারণ লেখালেখি করে থাকে। কিন্তু মৌলিক লেখালেখি করার জন্য যে ধরনের প্রশিক্ষণ থাকা দরকার, তা উচ্চশিক্ষার সনদপ্রাপ্ত আমাদের শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগেরই নেই। পাবলিক ও স্বল্পসংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা কিছু গবেষণা করার সুযোগ পায়, তাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ দেশে বা বিদেশে গিয়ে উচ্চতর গবেষণা করার শিক্ষা লাভ করে থাকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ পর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত বেশির ভাগ শিক্ষকই কোনো ধরনের গবেষণার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই উচ্চতর শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষকের দায়িত্ব পালনে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এটি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এখন কল্পনা করা যায় না। অথচ আমরা দেশে উচ্চশিক্ষার নামে অপরিকল্পিতভাবে কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করছি, তাঁদের বেশির ভাগই সনদধারী, মৌলিক চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের খুব একটা অধিকারী হয় না। সে কারণেই আমাদের লাখ লাখ ‘উচ্চশিক্ষিত’ তরুণ-তরুণী তাদের সনদ নিয়ে তেমন কিছু করতে পারে না। দেশ তাদের পেছনে প্রচুর অর্থ খরচ করে; কিন্তু সে অর্থের অনেকটাই অপচয় হয়ে যায়। অথচ আমরা যদি আমাদের উচ্চশিক্ষার কারিকুলামকে তত্ত্বীয় ও প্রায়োগিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার জন্য আবশ্যকীয় করে গড়ে তুলতাম, তাহলে তাদের বেশির ভাগই আমাদের দেশ ও জাতির সর্বক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে অবদান রাখার সুযোগ পেত। উচ্চশিক্ষাকে সেভাবেই দেখতে হবে। বর্তমান উচ্চশিক্ষা গবেষণাহীনভাবে রেখে দেওয়ায় এটি অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্যোগ নিতে হবে।

 

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা