kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা ভাবতে হবে

শহিদুল ইসলাম

১২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা ভাবতে হবে

সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ দেখেছেন হীরক তোলার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের করুণ জীবন। তারও আগে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালে ‘রক্তকরবী’ নাটকে সোনার খনির শ্রমিকদের চিত্র তুলে ধরেছেন। চন্দ্রা বিশুকে বলছে, ‘বেয়াই, ওদের সোনা তো অনেক জমল, আরো কি দরকার।’ বিশু বলে, ‘দরকার বলে পদার্থের শেষ আছে। খাওয়ার দরকার আছে, পেট ভরিয়ে তার শেষ পাওয়া যায়; নেশার দরকার নেই, তার শেষও নেই।’ রবীন্দ্রনাথের এ কথা শুধু ব্যক্তি মানুষের জন্য সত্য, তা-ই নয়, বর্তমান সভ্যতার ক্ষেত্রেও তা সত্য। মানুষই একদিন এ সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। যা জন্মে, তার মৃত্যু অবধারিত। সভ্যতার ক্ষেত্রেও এটা সত্য। সেই সুদূর অতীতে যখন বর্তমান সভ্যতার জন্ম হয় তখন তার মধ্যেই তার মৃত্যুর বীজ নিহিত ছিল। এত দিনে মৃত্যুর সেই চিহ্নগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

সবারই জীবনের এক পরিসীমা আছে। সভ্যতা, যা আমাদের সৃষ্টি, তারও একটি পরিসীমা আছে। সেই পরিসীমার আয়তন হয়তো ১০-১২ হাজার বছর। এই সময়সীমার মধ্যে আমরা অনেক ছোট-বড় সভ্যতা-সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন দেখেছি। কিন্তু আমরা এত দিন দীর্ঘজীবী এই সভ্যতার অগ্রগতিই দেখে এসেছি। এবার তার মৃত্যুর চিহ্নগুলো দেখছি। ‘সভ্যতার’ দাবিগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। গ্রেটা থানবার্গ বলেছে যে এমন একটি চেইন-রিঅ্যাকশন শুরু হতে চলেছে, যার ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, যা সভ্যতাকে ধ্বংস করবে। ঠিক তেমনি বর্তমান সভ্যতাও একমুখী প্রক্রিয়া। শুধু সামনের দিকে যেতে চায়—পেছন ফিরে তাকায় না। সোনা-হীরার পর এবার কোবাল্ট খনির কথা শুনুন। সোনা ও হীরার কোনো প্রয়োজন নেই। তাই তার জন্য ক্ষুধা কখনোই শেষ হয় না। চাই আরো চাই। কিন্তু কোবাল্টের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সুতরাং তার শেষও আছে। কোবাল্টের ব্যবহার সেই প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় দেখা যায়। সবুজ কাচ তৈরি ও গহনাগাটি তৈরিতে কোবাল্ট ব্যবহার করতেন সম্রাটরা। সেসব না হলেও চলত। কিন্তু আজ নতুন করে আমাদের বাঁচা-মরার জন্য কোবাল্টের প্রয়োজন পড়েছে। শুনুন সেই কাহিনি।

দুই.

ডিজেল ও পেট্রল চালিত যানবাহন পরিবেশ দূষিত করছে—এটা আজ প্রমাণিত সত্য। ডিজেল ও পেট্রল পুড়ে কার্বন ডাই-অক্সাইড বা CO2 গ্যাস তৈরি হয়। সেই গ্যাস বাতাসে CO2-এর পরিমাণ বেড়ে বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। বর্তমানে এই মাত্রা সীমা অতিক্রম করেছে। তাই বিজ্ঞানীরা বিকল্প শক্তির সন্ধানে ব্যস্ত। বিকল্প হিসেবে বিদ্যুত্চালিত কারের কথা বলছেন এবং পৃথিবীর বড় বড় যানবাহন তৈরির কারখানা এরই মধ্যে বৈদ্যুতিক কার নির্মাণ শুরু করেছে। জানি না, এরই মধ্যে ঢাকার রাস্তায় বিদ্যুত্চালিত কার নেমেছে কি না! আমরা ভেবে আনন্দিত ও স্বস্তি বোধ করছি, ‘যাক, বিশুদ্ধ বায়ুতে নিঃশ্বাস নেওয়া যাবে।’ কিন্তু শান্তি আসবে কোথা থেকে। সেই গাড়িগুলো চালাতে যে ব্যাটারি ব্যবহৃত হবে, তার প্রধান উপাদান কোবাল্ট। কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো কোবাল্টও পৃথিবীর কোথাও মাটির নিচে জমে আছে। কোবাল্ট-আকরিক তুলে সেখান থেকে পুড়িয়ে খাঁটি কোবাল্ট নিষ্কাশন করতে হবে। কোবাল্ট গলানো খুব কঠিন ও ব্যয়বহুল। পৃথিবীর ৬০ শতাংশ কোবাল্ট জমা আছে গণতান্ত্রিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর কাতাঙ্গা প্রদেশে। সেখানে এরই মধ্যে নজর পড়েছে নয়া সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তির যানবাহন তৈরির শিল্পের মালিকদের। পৃথিবীর মোট কোবাল্ট রিজার্ভের পরিমাণ ৭১ লাখ টন। তার মধ্যে কঙ্গোতেই আছে ৩৫ লাখ টন। ২০১৭ সালে সেখান থেকে তোলা হয় ৬৪ হাজার টন। ২০২৫ সালের মধ্যে পৃথিবীর মোট কোবাল্ট উৎপাদনের ৭৩ শতাংশ আসবে কঙ্গো থেকে। ২০১৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে তা দাঁড়াবে ৪৭ গুণ বেশি। মাতান্ডা খনি থেকে ২০১৮ সালে তোলা হয় ২৪ হাজার ৫০০ টন কোবাল্ট। এক টন কোবাল্টের দাম ২০ হাজার থেকে ২৬ হাজার ডলার। ব্যয়বহুল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করে তারা সস্তা মানবশ্রম ব্যবহার করছে। আদিমতম উপায়ে কোদাল ও শাবল দিয়ে তারা কোবাল্ট উত্তোলন করে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে উপযুক্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা না করার ফলে কোবাল্ট থেকে নির্গত ধোঁয়া সেখানকার মানুষ ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। স্থানীয় বহু পশুপাখি ও অধিবাসী বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত। অল্প বয়সেই তারা মৃত্যুবরণ করছে। কোবাল্টের গলন-তাপমাত্রা (melting point) ১,৪১৫ºC। এই তাপমাত্রা বিষাক্ত আর্সেনিক সমৃদ্ধ ধোঁয়া নির্গত হয়ে বায়ুদূষণ ত্বরান্বিত করছে এবং আর্সেনিকজনিত রোগে এলাকাবাসী আক্রান্ত। চামড়ায় ঘা হচ্ছে, চোখ সবুজ রং ধারণ করছে, মাতৃগর্ভে সন্তানরাও আর্সেনিকের কবল থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। অর্থাৎ কয়লা, পেট্রল ও ডিজেল পোড়ালে বাতাসে CO2 গ্যাসের পরিমাণ বাড়ে, আর কোবাল্ট পুড়লে বাতাসে আর্সেনিকের পরিমাণ বাড়ে। একটা স্মার্টফোনে মাত্র ১০ গ্রাম কোবাল্ট প্রয়োজন হয়; কিন্তু একটি ব্যাটারিতে প্রয়োজন হয় ১৫ কেজি। প্রতিবছর সেখানে আর্সেনিকজনিত রোগে ৮০টি শিশু মারা যাচ্ছে।

তিন.

স্কাই নিউজ কঙ্গোর কাতাঙ্গা অঞ্চলের কোবাল্ট খনিগুলো পরিদর্শনের সময় দেখতে পায় যে আট বছরের ছেলে ডরসন ও চার বছরের মেয়ে মনিকা সেখানে কাজ করছে। তারা এক অমানবিক দৃশ্য দেখতে পায়। সেই খবর ডেইলি মেইল সচিত্র প্রকাশ করে। ডরসন ও মনিকার মতো ৪০ হাজার শিশু খনিগুলোতে প্রতিদিন কাজ করে। বেতন পায় প্রতিদিন আট পেন্স মাত্র। তাদের চোখ আক্রান্ত—সবুজ, চামড়ায় ঘা ও বিষাক্ত বায়ু সেবনে তাদের ফুসফুস আক্রান্ত। ডাক্তারি পরীক্ষায় ধরা পড়েছে। ব্রিটেনবাসীদের বাঁচানোর জন্য ২০৪০ সাল থেকে যানবাহনে পেট্রল ও ডিজেল ব্যবহার বন্ধের ঘোষণার পর এটা স্পষ্ট যে প্রতিদিন কোবাল্টের চাহিদা বাড়বে; যার অর্থ কোবাল্ট খনিতে শিশুশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি। বিশুদ্ধ বায়ু ও ব্রিটেনবাসীর স্বাস্থ্যের  কথা বিবেচনা করে গত মাসে জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী মাইকেল গোভের ঘোষণা দেন, ব্রিটেনবাসীর জন্য স্বস্তিকর ও আনন্দের দিন আসছে। এ কথা ঠিক; কিন্তু তার বিনিময়ে কঙ্গোর হাজার হাজার শিশু শ্রমিককে পৃথিবীতেই ‘দোজখবাস’ করতে হবে, এ খবর ব্রিটেনবাসীর মনে কি সামান্য করুণার সৃষ্টি করবে? বিদ্যুত্চালিত গাড়ি উন্নত বিশ্বে প্রতিদিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। এক দিন হয়তো সারা পৃথিবীতে তা ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের জন্য বিশুদ্ধ বায়ু ও উন্নত জলবায়ু সরবরাহের জন্য আট বছরের ডরসন ও চার বছরের মনিকাকে যে পৃথিবীপৃষ্ঠেই ‘নরকযন্ত্রণা’ ভোগ করতে হচ্ছে, সে কথা কি আমাদের একবারও মনে হবে? পৃথিবীর বড় বড় যানবাহন তৈরির শিল্পের মালিকরা ঘোষণা দিয়েছেন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তাঁরা লাখ লাখ বিদ্যুত্চালিত গাড়ি রাস্তায় নামাবেন।

চার.

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বলছে, ‘এটা শিশুশ্রম ব্যবহারের নিকৃষ্টতম নির্দশন।’ অথচ কবে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করে জাতিসংঘ আইন পাস করেছে। এসব বিশ্ব সংস্থা বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোরই অংশবিশেষ। এই তথ্য প্রদান করেই তারা তাদের কর্তব্য শেষ করে। অবস্থা পরিবর্তনের কোনো ক্ষমতাই নেই এসব বিশ্ব সংস্থার। কঙ্গোর কোবাল্ট শেষ হলে তারপর আছে অস্ট্রেলিয়া, কিউবা, চীন, রাশিয়া, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে। সেখানেও করপোরেট পুঁজিবাদের হাত পড়বে। বিদ্যুত্চালিত কার নির্মাণের বড় কম্পানি টেসলা ২০১৮ সাল থেকে প্রতিবছর পাঁচ লাখ কার তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এর জন্য প্রয়োজন হবে সাত হাজার ৮০০ টন কোবাল্ট। ২০২৫ সালে বৈদ্যুতিক কারের সংখ্যা ৪.৪ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে বলে তারা আশা ব্যক্ত করেছে। বেশি লাভের আশায় তারা উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য ব্যয়বহুল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করে স্থানীয় অধিবাসীদের সস্তা শ্রম ব্যবহার করছে।

ডরসন, মনিকা ও ১১ বছরের রিচার্ডের খবর স্কাই নিউজে প্রচারিত হওয়ার পর সেখান থেকে উদ্ধার করে চার্চ প্রতিষ্ঠিত কোনো শিশু সদনে তাদের জায়গা দেওয়া হয়েছে। সেখানে তারা জীবনের প্রথম বিছানায় শোয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং তাদের নিয়মিত চার্চ পরিচালিত স্কুলে পাঠানো হয়। সেখানে তারা খ্রিস্টের মহান বাণী পাঠ করছে। কিন্তু তার সঙ্গী ৪০ হাজার শিশুর কথা কে ভাবছে? তারা সেই নরকেই মৃত্যুর দিন গুনছে শরীরে ঘা, সবুজ চোখ ও আক্রান্ত ফুসফুস নিয়ে।

গ্রেটা থানবার্গের একটি উক্তি দিয়ে লেখাটি শেষ করি। ‘বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা কেউ ভাবছে না।’

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পার্থ, অস্ট্রেলিয়া

মন্তব্য