kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৮ জুন ২০১৯। ৪ আষাঢ় ১৪২৬। ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

আমাদের পাটকলগুলোর দুরবস্থা

গৌরাঙ্গ নন্দী

১০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমাদের দেশে পূর্ব পাকিস্তান পর্বে আইয়ুবি উন্নয়ন দশকের মধ্য দিয়ে পাটশিল্প বিকশিত হয়। ব্যবসাটি নিয়ন্ত্রণ করত পশ্চিম পাকিস্তানিরা। কৃষকের শ্রমে উৎপাদিত পাট দিয়ে, এ দেশের শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে উৎপাদিত পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি হতো, মুনাফা যেত পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের আশ্রিত ধনী শিল্পপতিদের কাছে। বিষয়টি স্বাধিকার আন্দোলনকে পুষ্ট করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ উনসত্তরের গণ-আন্দোলন তথা মুক্তিযুদ্ধকালে এ কারণেই দেশের সংগঠিত শ্রমিকদের বৃহত্তর অংশ তথা পাট শ্রমিকদের ভূমিকা ছিল অত্যুজ্জ্বল। উনসত্তরের ২১ ফেব্রুয়ারি খুলনায় ছাত্রদের সঙ্গে শ্রমিকদের সমন্বিত প্রতিবাদ মিছিল শাসকদের বুকে কাঁপুনি ধরিয়েছিল। ওই দিন খুলনায় প্রতিবাদী মিছিলকারীদের ওপর পুলিশের আক্রমণে হাদিস, প্রদীপ, আলতাফসহ সাত থেকে ৯ জন শহীদি মৃত্যুবরণ করেন। খালিশপুরের শিল্প শ্রমিকদের ওপর পাকিস্তানিদের রোষের প্রতিফলন দেখি মুক্তিযুদ্ধকালের ৯ মাসেও। সেই সময়ে এখানকার প্রতিটি মিল ছিল একেকটি গণহত্যাস্থল। অগুনতি শ্রমিকের আত্মদানে পাওয়া আমাদের স্বাধীন দেশের প্রায় অর্ধশতাব্দীকালের এই পাট শ্রমিকরাই এখন সবচেয়ে ব্যথিত-বেদনাহত-আর্থিক দুরবস্থার শিকার।

২.

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকরা ধর্মঘট ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। তাদের দাবি, সময়মতো মজুরি এবং মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করা। আমরা এই কাজ করতে পারিনি। অবশ্য এরও একটি সুদীর্ঘ পটভূমি আছে। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সরকার পাটকলগুলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত করেছিল। পঁচাত্তর-পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে শুরু হয় ব্যক্তি খাত বিকাশের। একপর্যায়ে পাটকলগুলোকে ব্যক্তিমালিকানায় ফিরিয়ে দেওয়া হতে থাকে। আরো পরে ব্যক্তিমালিকের উদ্যোগে পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর মধ্যে প্রধানত দুটি সংকট দেখা দেয়। এক. আন্তর্জাতিক স্তরে তন্তুজাতীয় পণ্যের রমরমায় পাটপণ্যের পিছিয়ে পড়া এবং দুই. বাজার অর্থনীতি বিকাশের স্বার্থে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) কর্তাদের পরামর্শে পাট খাতে সংস্কারের নামে একের পর এক পাটকল ব্যক্তিমালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া, বিক্রি করা, গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের নামে শ্রমিক ছাঁটাই করা এবং পাটকল বন্ধ করা। অবশ্য এই শতকের (২০০০-২০০৯) প্রথম দশকে তন্তুজাতীয় পণ্যের বিপরীতে পাটপণ্যের দিকে আবারও বিশ্ববাসী ঝুঁকতে শুরু করে। পাটের ওপর নজর পড়তে থাকে। পাটপণ্যের চাহিদা বাড়তে থাকে। সরকারও পাট ব্যবসায় নানা সুযোগ-সুবিধা দিতে থাকে। সরকারের দেওয়া সুবিধায় কাঁচা পাট ব্যবসায়ী, মিল মালিক উপকৃত হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত মিলগুলোর দুর্দশা সেই তিমিরেই থেকে যায়। যথাযথ সময়ে মিলগুলো পাট কেনার অর্থ বরাদ্দ পায় না, পাটপণ্য বিক্রি হয় না, শ্রমিকরা মজুরি পায় না। শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে এবং তা বাড়তে থাকে।

একসময় দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের সংখ্যা ছিল ৭৭। বর্তমানে তা ২২টিতে ঠেকেছে। খুলনা জোনে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ছিল ২২টি, বর্তমানে আছে আটটি। অবশ্য এরই মধ্যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি উদ্যোগে পাটকল গড়ে উঠেছে। বর্তমানে সাধারণ চিত্র হচ্ছে, সরকারি মালিকানার পাটকলগুলো লাভ করতে পারছে না। শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছে না, মাঝেমধ্যেই শ্রমিকরা ফুঁসে উঠছে, ধর্মঘট-অবরোধ পালন করছে। সরকার তাদের দাবি সামান্য হলেও মেনে নিয়ে শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা করছে। বিপরীতে বেসরকারি মালিকানাধীন পাটকলগুলো লাভ করছে বলে দাবি করা হচ্ছে। লাভও করছে, তা না হলে বেসরকারি মালিক কেন কারখানা চালু রাখবে!

সরকারি মিলে লোকসান এবং বেসরকারি মিলে লাভ কেন? এর প্রধান কারণ হচ্ছে, সরকারি মিলগুলো পুরনো, উৎপাদন করে প্রধানত বস্তা। সময়ের ব্যবধানে মিলগুলোর আধুনিকায়ন হয়নি। পণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্য আসেনি। আর আছে সময়মতো কাঁচা পাট কিনতে না পারার ব্যর্থতা। মৌসুমে যখন পাট ওঠে, দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকে তখন সরকারি মিলগুলোর হাতে পাট কেনার টাকা থাকে না। যখন টাকা হাতে আসে তখন পাটের বাজার থাকে চড়া। উপরন্তু আছে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা। পাটপণ্য বাজারজাত করতে না পারার ব্যর্থতা। সরকার পাটপণ্যের মাধ্যমে পণ্য মোড়কজাত করার বাধ্যতামূলক আইন করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। দীর্ঘদিনের শ্রমিক হওয়ায় সরকারি মিলে বেতন-ভাতাও তুলনামূলকভাবে বেশি।

অন্যদিকে ব্যক্তিমালিকের পাটকলগুলোতে প্রধানত সুতা তৈরি হয়। শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ কম। ব্যক্তিমালিক তার প্রয়োজনমতো কাঁচামাল কেনে ও তা ব্যবহার করে। বাজারের নিশ্চয়তা সাপেক্ষে সে পণ্য উৎপাদন করে। পণ্য বিপণনে বিশেষত রপ্তানি পণ্যে সরকারের প্রণোদনাও আছে। ফলে মালিক লাভ করছে। বলা হচ্ছে, বেসরকারি মালিক পারছে, সরকারি ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হচ্ছে। আর ‘মরতি মরণ শানাইদারের’ মতো শ্রমিকদের ঘরে হাহাকার বাড়ছে।

বাজার অর্থনীতির হাতে ছেড়ে দেওয়া এই ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকরা দিন দিন নিঃশেষিত হচ্ছে। আমরা যদি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাই, তাহলেও সরকারের সক্রিয়-স্বচ্ছ নীতি থাকা বাঞ্ছনীয়। তা না হলে শ্রমিকরা ক্রমাগত ঠকতে থাকবে। বর্তমানের মিলগুলোর ব্যবস্থাপনা-নীতি ও উৎপাদন কৌশলের খোলনলচে না পাল্টালে এগুলো লাভের মুখ দেখবে না। আর যদি ধরে নিই, সরকারি মিলগুলোকেও লাভ করে অর্থাৎ ব্যবসা করে টিকে থাকতে হবে, তাহলেও সেই অনুযায়ী সব কিছু ঢেলে সাজাতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা