kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর আজকের গার্মেন্টশিল্প

মিল্টন বিশ্বাস

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর আজকের গার্মেন্টশিল্প

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ষষ্ঠ বার্ষিকীতে এসে এ কথা নিঃসন্ধিগ্ধভাবে বলা যায় যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে ইতিবাচক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে। বিগত পাঁচ বছরে গার্মেন্ট ব্যবসায়ীরা কারখানার নিরাপত্তা ও পরিবেশ উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় ঘটেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। অন্যদিকে শেখ হাসিনা সরকারের উদ্যোগে কারাখানাগুলোর পরিবেশ ও শ্রম-অধিকার রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আসলে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর কারখানাগুলোর পরিবেশে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বেশ স্পষ্ট কর্মরত শ্রমিকের কাছেও। আগে গার্মেন্টগুলোতে দুর্যোগ মোকাবেলায় ট্রেনিং হতো না। এখন বেশ কিছু কারখানায় বছরে একাধিক ট্রেনিং হচ্ছে। আগুন লাগলে কী করতে হবে, কখনো বা অন্যান্য করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে মালিকপক্ষ। বেতন-বোনাস নিয়েও আগের মতো ‘টালবাহানা’ নেই। শ্রমিকদের কোনো সমস্যা হলে এখন ম্যানেজমেন্টের কাছে অভিযোগও করা যায়। আসলে বিদেশি ক্রেতাদের দুটি জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের চাহিদা মেনে ফায়ার সেফটি, ইলেক্ট্রিক্যাল সেফটি, বিল্ডিং সেফটি সব কিছু নতুন করে আধুনিক পদ্ধতি মেনে পোশাক কারখানা সচল রাখতে হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশের দিকেও নজর দিতে হচ্ছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর এ খাতে সব মিলে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তাতে এখন ক্রেতা ও কর্মীরা সন্তুষ্ট, মালিকপক্ষের ব্যবসাও ভালো চলছে। ২০১৮ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের আওতায় থাকা দুই হাজার ৪১৬টি কারখানার মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ কারখানাতেই নিরাপত্তা ও অন্যান্য ত্রুটি সংশোধন করা হয়েছে। তবে সারা দেশের তিন হাজার ৮০০ কারখানার মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন হয়েছে মাত্র ৬৪৪টিতে। মালিকপক্ষ বলছে, এ ইউনিয়ন না থাকলেও শ্রমিক অধিকার রক্ষায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তা ছাড়া এ দেশে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কাজ শেষ হলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে কারখানা মালিকরা তাদের ক্রেতা ধরে রাখার স্বার্থেই কারখানার কর্মপরিবেশ ও মান ঠিক রাখার দিকে গুরুত্ব দেবে।

বাংলাদেশে ৫০ লাখেরও বেশি শ্রমিক বর্তমানে পোশাকশিল্পে কাজ করছে। শেখ হাসিনার সরকার ২০১৩ সালে একজন শ্রমিকের বেতন পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা ধার্য করে এবং ২০১৮ সালে তা  ন্যূনতম করা হয় আট হাজার টাকা। বর্তমানে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত চার হাজার ৮০০ কারখানার মধ্যে চালু রয়েছে প্রায় তিন হাজার ৩০০টি। এর বাইরে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত কারখানা রয়েছে আরো প্রায় এক হাজার। পৃথিবীব্যাপী পোশাকশিল্পের দ্রুত অগ্রগতির ইতিহাসটি সত্যিই অভিনব। সত্তরের দশক থেকে ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো এশিয়া আর ল্যাটিন অ্যামেরিকার কিছু দেশ থেকে পোশাক কিনতে শুরু করে। খুব কম মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া যায় বলে দাম পড়ে কম, লাভ হয় বেশি। এমন সুযোগ তারা হাত ছাড়া করেনি। কম টাকায় পণ্য কেনার কারণে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা, পরিবেশ দূষণ রোধ—এসব ব্যাপারে তাদের মনোযোগ ছিল না। মূলত বড় আঙ্গিকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পোশাক তৈরি প্রথম শুরু হয়েছিল ব্রিটেনে, অষ্টাদশ শতাব্দীর সেই শিল্প বিপ্লবের সময়। শিল্প বিপ্লবের ওই প্রহরে ব্রিটেনের লন্ডন আর ম্যানচেস্টারে শতাধিক কারখানা ছিল। শিশুশ্রম, অনির্ধারিত কর্মঘণ্টার সুবিধা ভোগ, অল্প মজুরি, কারখানার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ—সবই ছিল সেখানে। যুক্তরাষ্ট্রেও পোশাক শ্রমিকরা স্বর্গসুখে ছিল না সব সময়। সেখানেও একসময় কারখানায় আগুন লাগলে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ভেতরে রেখেই সদর দরজায় তালা লাগাত। ১৯১১ সালে নিউ ইয়র্কের ট্রায়াঙ্গেল শার্টওয়েস্ট ফ্যাক্টরিতে পুড়ে মরেছিল ১৪৬ জন শ্রমিক। মৃতদের বেশির ভাগই ছিল নারী। মজুরি, কর্মঘণ্টা, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা—কোনো কিছুই বাংলাদেশের এখনকার কারখানাগুলোর চেয়ে ভালো ছিল না। বাংলাদেশের গার্মেন্টশিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন সময়ের সূচনা হয়। অবশ্য রানা প্লাজার দুর্যোগ মোকাবেলার কাহিনি আমাদের কারখানাগুলোর পরিবেশ পাল্টে দেয় এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সচেতন করে তোলে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিয়ে চলেছে দেশি-বিদেশিদের গভীর ষড়যন্ত্র। অন্যদের ইন্ধনে অনাকাঙ্ক্ষিত শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়; তাদের মধ্যে অবস্থান ধর্মঘট ও বিদ্বেষপ্রসূত অসহযোগিতার মনোভাব গড়ে ওঠে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকার শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা করেছে আর মালিকদের জন্য গ্যাস, বিদ্যুৎ সুলভ করে দিয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে বাঁচানোর জন্য সন্তোষজনক হারে নগদ অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এখানকার পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পণ্য পরিবহন ভাড়াবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো ছিল গুরুত্ববহ। বর্তমানে বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহের ঘাটতি উৎপাদনকে যেন ব্যাহত না করে সেই চেষ্টায় সরবরাহ ঠিক করা হয়েছে। ফলে দৈনিক উৎপাদন উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। পোশাক মালিকদের লাভের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে; শ্রমিকদের স্বার্থও রক্ষিত হচ্ছে।

রানা প্লাজার ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবেলায় তৎকালীন সরকারের তৎপরতা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান। উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। তাঁর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সাহায্যও দেওয়া হয়। নিহতদের পরিবার ও আহতদের সব ধরনের সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য, সংসদ সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং উদ্ধারকাজ তদারকি করেন। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে সারা বছর ধরে দুস্থ ও পীড়িত মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকে। বিশেষ করে দুর্যোগকালীন দানশীল ব্যক্তিবর্গ বা প্রতিষ্ঠান তহবিলে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত বা গুরুতর আহতদের প্রধানমন্ত্রীর এই ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে অনুদান প্রদান ছিল সত্যিই অভিনব। দুর্ঘটনার অব্যবহিত পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা জেলা শাখার পক্ষ থেকে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনা করা হয়েছিল। 

আগেই লিখেছি, রানা প্লাজার দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র  করে পোশাকশিল্প নিয়ে ষড়যন্ত্র চলেছে এবং চক্রান্তকারীদের কারণে পোশাকশিল্পে ধস নামার আশঙ্কা ছিল। আশঙ্কা করা হয়েছিল, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে শিল্পটি ঠিক পাটের মতো করুণ পরিণতি বরণ করবে। গত ছয় বছরে নিট, হোসিয়ারি, ওভেন গার্মেন্ট মিলে প্রায় ছয় হাজার পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু রানা প্লাজার ঘটনা থেকে শিক্ষা পেয়ে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করায় ষড়যন্ত্রকারীরা নির্লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছে। যেমন ঘটনাত্তোর শ্রমিকবান্ধব ব্যবস্থা ছিল এ রকম—রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে পাঁচটি কারখানার দুই হাজার ৭৮৫ জন শ্রমিককে বিজিএমইএ বেতনসহ সব বকেয়া পরিশোধ করে। বিজিএমই কর্তৃক ব্যয় হয় প্রায় ১৫ কোটি টাকা। তৈরি পোশাক শিল্পের নিরাপদ কর্মপরিবেশ রক্ষা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের আরো একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি ১১ সদস্যের কেবিনেট কমিটিকে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। সরকার এ সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক-১কে প্রধান করে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানায় ৪৯২ একর জমির ওপর একটি ‘গার্মেন্টশিল্প পল্লী’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। জমি অধিগ্রহণের কাজও চলছে। পোশাকশিল্পের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর সরকার সারা দেশে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের জন্য ২৩টি পরিদর্শন টিম গঠন করে। টিমগুলো নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করছে এবং ব্যত্যয়ের ক্ষেত্রে দোষী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। 

মূলত ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের পর থেকেই আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি হয়েছে, ঘুরে দাঁড়িয়েছে গার্মেন্টশিল্প। বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে বাংলাদেশের পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করার পেছনেও রানা প্লাজা দুর্ঘটনা-উত্তর শেখ হাসিনা সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য